এত সব কথা জানার পরও টু শব্দটি করে না শিঞ্জিনী। তার কাছে এগুলোর কোনও গুরুত্ব নেই। একেবারেই অর্থহীন। অনাবশ্যক। তবু শুনতে হচ্ছে। এ যে কী মানসিক যাতনা!
বিমলেশকে নিয়ে মৃদুলার উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। ভদ্রলোকের নাকি নানা মহলে দারুণ ইনফ্লুয়েন্স। পুলিশ, প্রশাসন, পলিটিক্যাল পার্টি তো আছেই। এমনকী বেশ কজন মন্ত্রীর সঙ্গেও যথেষ্ট দহরম মহরম। বিগ বিজনেস বা ইন্ডাস্ট্রি চালাতে গেলে বিভিন্ন লেভেলের ক্ষমতাবান লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলেই নয়।
ধৈর্যের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায় শিঞ্জিনী। এতক্ষণ ঠোঁট টিপে বসে ছিল। এবার তীব্র, ঝাঝালো গলায় বলে, আমাকে পড়তে দিলে না। যাকে চিনি না, জানি না, দেখিনি, তার লাইফ হিষ্ট্রি কি সারারাত শুনিয়ে যাবে?
মৃদুলা হতচকিত। মেয়ের দিক থেকে এমন বাধা আসবে, ভাবতে পারেনি। সে প্রায় বোবা হয়ে যায়।
শিঞ্জিনী থামেনি। আগের মতোই কটু স্বরে বলল, লোকটা সম্পর্কে কেন এত কথা বলছ? তার প্রচুর টাকা, বিরাট বিজনেস, অ্যারিস্টোক্রাট ফ্যামিলিতে জন্ম–এসব শুনে আমার কী লাভ?
এর মধ্যে অনেকটা সামলে নিয়েছে মৃদুলা। একটু হেসে বলল, ভদ্রলোক সম্পর্কে তোর যাতে পরিষ্কার একটা ধারণা হয়, সেই জন্যেই এত কথা বলা।
সোজাসুজি মায়ের চোখে চোখ রেখে শিঞ্জিনী জিগ্যেস করে, এই ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন কেন?
আমি তোর কথা বলেছি। তাই ওঁর ভীষণ ইচ্ছে, তোর সঙ্গে আলাপ করেন।
আমার সঙ্গে আলাপ করার কারণটা কী?
কারণ আবার কী? ওঁর ইচ্ছে হয়েছে। তাই
কী আশ্চর্য, কলকাতায় আমার বয়সি হাজার হাজার মেয়ে আছে। তাদের বাদ দিয়ে আমার সম্বন্ধে তার এত ইন্টারেস্ট কেন?
যে সুরে, যে ভঙ্গিতে শিঞ্জিনী কথা বলছে তাতে ধৈর্যচ্যুতি ঘটতেই পারে। কিন্তু নিজেকে সংযমে বেঁধে রাখে মৃদুলা। শান্ত মুখে বলে কারণ তুই আমার মেয়ে।
এবার থতমত খেয়ে যায় শিঞ্জিনী, তোমার মেয়ে বলেই আমার সঙ্গে আলাপ করতে চান! স্ট্রেঞ্জ! আর কোনও পারপাস নেই?
প্রহেলিকার আবরণে নিজেকে মুড়ে রাখে মৃদুলা। হেসে হেসে বলে, হয়তো আছে। হয়তো আমি জানি। তবে যা বলার তিনিই তোকে বলবেন।
শিঞ্জিনী বুঝতে পারে, বিমলেশ বসুমল্লিকের উদ্দেশ্যটা মায়ের কাছ থেকে কিছুতেই জানা যাবে না। তাকে খুঁচিয়ে লাভ নেই।
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
তারপর শিঞ্জনী বলে, একটা ব্যাপার আমি কিছুতেই ভেবে পাচ্ছি না।
কী?
তুমি একটা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে ছোটখাটো অফিসার। বিমলেশ বসুমল্লিকের মতো একজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের সঙ্গে তোমার কীভাবে পরিচয় হল?
ওঁদের কোম্পানির বহু জিনিস আমরা ট্রাকে করে ইন্ডিয়ার নানা সিটিতে পাঠাই। দুবার দুটো গোলমাল হয়েছিল। একবার মাল ঠিক সময়ে জায়গামতো পোঁছয়নি। আরেকবার রাস্তায় সব জিনিস লুঠ হয়ে যায়। দুবারই মিস্টার বসুমল্লিক আলোচনার জন্য আমাদের ডেকে পাঠান। কোম্পানির তরফ থেকে আমি ওঁর অফিসে গিয়ে দেখা করি। এইভাবেই আলাপ হয়েছিল।
শিঞ্জনী উত্তর দিল না।
একটু চিন্তা করে মৃদুলা জিগ্যেস করল কী বলব ভদ্রলোককে? দেখা করবি?
শিঞ্জিনী অনুমান করে নেয়, বিমলেশের সঙ্গে পরিচয় করতে যতক্ষণ না রাজি হচ্ছে, মা তাকে ছাড়বে না। নাছোড়বান্দা হয়ে পেছনে লেগে থাকবে। কদিন পর প্রি-টেস্ট। এসময় উটকো ঝঞ্ঝাট তার ভালো লাগছে না। আবার কৌতূহল যে হচ্ছিল না, তা নয়। এই লোকটার সঙ্গেই যে মাকে স্বর্ণালী কলকাতায় তিন জায়গায় দেখেছে, এ নিয়ে তার সংশয় নেই। বিমলেশ সম্পর্কে একদিকে তার বিতৃষ্ণা, অন্যদিকে আগ্রহ। কিছুক্ষণ দুইয়ের টানাপোড়েন চলল। তারপর নীরস গলায় শিঞ্জিনী বলল, ঠিক আছে, তোমার যখন এত ইচ্ছে, মিস্টার বসুমল্লিককে আমাদের বাড়ি আসতে বলো। আমার সঙ্গে পরিচয় হবে দাদুর সঙ্গেও।
মৃদুলা চমকে ওঠে, না না
কী না?
উনি এখন এ বাড়িতে আসবেন না?
শিঞ্জিনী অবাক, কেন?
মৃদুলা বলল, আগে তোর সঙ্গে কথা বলবেন। তারপর যদি মনে হয়, আমাদের বাড়িতে আসা যায়, তখন আসবেন। সমস্ত কিছু তোর ওপর নির্ভর করছে।
আমার ওপর নির্ভর করছে মানে?
সেটা ওঁর সঙ্গে দেখা হলেই বুঝতে পারবি।
আমাদের বাড়ি উনি আসবেন না। তা হলে দেখাটা হবে কী করে?
তার ব্যবস্থা আমি করব। অনেক রাত হয়ে গেছে। এবার শুয়ে পড়। বলতে বলতে উঠে পড়ল মৃদুলা।
.
০৫.
মৃদুলা চলে যাবার পর জোরালো টিউবলাইট নিভিয়ে সবুজ রঙের নাইট ল্যাম্প জ্বেলে দিল শিঞ্জিনী। তারপর দরজায় ছিটকিনি আটকে বিছানায় চলে এল। বুকে বালিশ চেপে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে সে।
কখন দুর্যোগ শুরু হয়েছিল, খেয়াল নেই। অঝোরে বৃষ্টি ঝরে যাচ্ছে। ছাঁটটা উলটো দিক থেকে আসছে বলে জানালা দিয়ে জল ঘরে ঢুকছে না। উঁচু বাড়িগুলোর বেশিরভাগ ঘরেরই আলো নিভে গেছে। দু-একটা যা-ও জ্বলছে কেমন যেন অলৌকিক মনে হয়। আকাশ ঝলসে দিয়ে কড় কড় শব্দে বাজ পড়ছে। ব্যাঙের ডাক বন্ধ। ঝিঁঝিদের অর্কেস্ট্রা থেমে গেছে। ঝড়ো হাওয়া সাঁই সাঁই ঘোড়া দাবড়ে চলেছে দিগ্বিদিকে। আর বড় বড় গাছগুলোর ঝুঁটি ধরে ঝাঁপিয়ে যাচ্ছে অবিরল। হঠাৎ যেন কলকাতায় এই অঞ্চলটাকে ভূতে পেয়েছে।
মৃদুলার কথাই ভাবছিল শিঞ্জিনী। একদিন মা-ই ছিল তার সর্বস্ব। মাকে ঘিরেই ছিল তার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে। তাকে ছাড়া মা-ও আর কিছু ভাবতে পারত না। পরস্পরকে নিয়েই তারা এতকাল বিভোর হয়ে ছিল।
