মৃদুলা বলল, ওপরে গিয়ে সব বলব। এখন খেয়ে নে।
.
০৪.
মিনিট পনেরো আগে ওপরে উঠে এসেছে শিঞ্জিনী। ভেবেছিল, খাওয়া-দাওয়ার পর ঘন্টা দুই পড়বে। হায়ার সেকেন্ডারির বিশাল কোর্স। তার ওপর পরীক্ষার পর পরীক্ষা। রাত্তিরে বারোটা, সাড়ে বারোটা পর্যন্ত না পড়লে থই পাওয়া যাবে না।
শুতে শুতে রোজই মাঝরাত পার হয়ে যায় শিঞ্জিনীর। এখন সবে দশটা সতেরো। কিন্তু পড়ায় একেবারেই মন বসছে না। খাটের কোনায় বসে সামনের দিকের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে সে। মৃদুলা কখন আসবে এবং কী ধরনের বিস্ফোরণ ঘটাবে, সে জন্য দমবন্ধ করে অপেক্ষা করছে।
ঝিঁঝিরা সেই বিকেল থেকেই ডেকে চলেছে। অদৃশ্য এই পোকাগুলোর এনার্জি আছে। মুহূর্তের জন্য থামে না। এখন ঝিল্লিস্বরের সঙ্গে জলার দিক থেকে ব্যাঙেদের কনসার্টও ভেসে আসছে। সূর্যাস্তের ঠিক আগে পশ্চিম আকাশে মেঘ জমেছিল। এখন দক্ষিণ দিকটাও মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে। তারা বা চাঁদ কিছুই চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে আকাশটাকে কোনাকুনি চিরে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিয়ে যায়। অনেকক্ষণ বৃষ্টিটা গড়িমসি করেছে। এবার বোধহয় মনস্থির করে ফেলেছে। যে-কোনও সময় দিগদিগন্ত ভাসিয়ে নেমে আসবে।
রাতের খাওয়া চুকলে মৃদুলার কিছু কাজ থাকে। এঁটো প্লেট এবং অন্যান্য বাসন রান্নাঘরের সিঙ্কে ঠিক করে গুছিয়ে রাখে। পরদিন মালতী এসে মাজবে।
বাসন-কোসন রাখা হলে, আঁচিয়ে, একতলার প্রতিটি ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে ওপরে উঠে আসে মৃদুলা। দোতলায় সিঁড়ির মুখে কোলাপসিবল গেট বসানো আছে। সেটা টেনে ঢাউস তালা লাগায়। এত সব করতে বেশ খানিকটা সময় লাগে। নীচের দরজায় তালা, দোতলায় তালা। নিরাপত্তার বন্দোবস্ত যতটা জোরদার করা যায় আর কী।
অন্যদিন এসব সারা হলে নিজের ঘরে চলে যায় মৃদুলা। আজ সোজা মেয়ের ঘরে এল। শিঞ্জিনী খাটের যে দিকটায় বসেছে, তার উলটো দিকে বাজুতে হেলান দিয়ে বসল।
দুবেলাই খাওয়ার পর ভাজা মৌরি খায় মৃদুলা। মৌরির স্বাদটা তার খুব ভালো লাগে। ফুরিয়ে যাবার পরও অনেকক্ষণ সেটা যেন জিভে জড়িয়ে থাকে।
চোখের কোণ দিয়ে মেয়েকে একবার লক্ষ্য করল মৃদুলা। তার ভঙ্গিটা বেশ সতর্ক। সতেরো-পেরুনো তরুণী মেয়েকে কীভাবে কথাটা বলবে, মনে মনে তার মহড়া দিয়ে নিচ্ছে যেন।
সেই বিকেল থেকে ভীষণ উতলা হয়ে আছে শিঞ্জিনী। মাকে কাছাকাছি বসে থাকতে দেখে উকণ্ঠটা হঠাৎ শতগুণ বেড়ে যায়।
মৃদুলা জানালার বাইরে তাকাল। মেঘে ফাটল ধরিয়ে বিদ্যুৎ চমকেই যাচ্ছে। দূরে কোথায় যেন বাজ পড়ল।
যেন মেয়েকে নয়, বাইরের অদৃশ্য কারও উদ্দেশে মৃদুলা বলল, খেতে বসে যে ভদ্রলোকের কথা বলছিলাম তাঁর নাম বিমলেশ বসুমল্লিক।
শিঞ্জিনী উত্তর দিল না।
মৃদুলা বলতে লাগল, ওঁরা লেদার গুডসের খুব বড় ম্যানুফ্যাকচারার। জুতো, সুটকেস, বড় বড় ব্যাগ, এমনি নানা জিনিস ওঁদের কারখানায় তৈরি হয়।
কোনওরকম আগ্রহ বোধ করল না শিঞ্জিনী। শুধু বলল, ও–
মৃদুলা বলল, ওঁদের একটা বিরাট ফ্যাক্টরি আছে পানিহাটিতে। খুব শিগগিরই বি টি রোডে নতুন আরেকটা কারখানা খুলবেন। লেদারের আরও কী কী জিনিস সেখানে তৈরি হবে।
আগের মতোই একটি মাত্র শব্দ শিঞ্জিনীর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ও-
হোল ইন্ডিয়ায় ওঁদের প্রোডাক্টের বিরাট ডিমান্ড। প্রতি সপ্তাহে মহারাষ্ট্র, গুজরাট, তামিলনাড়ু থেকে অসম, মণিপুর পর্যন্ত ট্রাক বোঝাই হয়ে ওঁদের মাল যায়। বিদেশেও ওঁদের বড় মার্কেট। প্রচুর এক্সপোর্ট করে।
ও।
উদ্দীপ্ত মুখে মৃদুলা বলে, নামকরা অ্যারিস্টোক্রাট ফ্যামিলির ছেলে। শোভাবাজারে ওঁদের প্রকাণ্ড বাড়ি। একশ বছরের পুরোনো। তবে বিমলেশ সল্ট লেকে আলাদা তিনতলা বাড়ি করেছেন। উনি সেখানেই থাকেন।
এই মধ্যরাতে আকাশ যখন মেঘাচ্ছন্ন, বৃষ্টি প্রায় পড় পড়, সারা শহর নিঝুম, সেই সময় একজন চূড়ান্ত সফল, অর্থবান মানুষের জীবনকাহিনি যেভাবে মা ফেঁদে বসেছে, সহজে তা থামবে বলে মনে হয় না। শিঞ্জিনী ক্লান্তি বোধ করছিল। মনে মনে বেশ বিরক্তও। আজ আর পড়াশোনার আশা নেই। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে পারলে কাল ভোর ভোর উঠে বই নিয়ে বসা যেত। মায়ের ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে না, সেটা আদৌ সম্ভব।
মৃদুলা থামেনি। সে আরও জানায়, মানুষ হিসেবে বিমলেশ চমৎকার। অমায়িক। সহৃদয়। এত যে পয়সা, কিন্তু তিলমাত্র অহমিকা নেই।
মায়ের মুখে কোনও অনাত্মীয় পুরুষের এমন ঢালাও স্তুতি আগে কখনও শোনেনি শিঞ্জিনী। এত উচ্ছ্বসিত হতেও দেখেনি। অবাক বিস্ময়ে সে শুধু মাকে দেখেই যাচ্ছিল। পলকহীন। বুঝতে পারছিল, আসল প্রসঙ্গে আসার আগে মৃদুলা জমি তৈরি করে নিচ্ছে।
মৃদুলা এবার জানায়, একবার বিয়ে হয়েছিল বিমলেশের, স্ত্রী জয়তী ছিল সুন্দরী, শিক্ষিতা। হিষ্ট্রির এমএ। একটা বড় কলেজে পড়াত। ম্যারেড লাইফটা ওদের বেশ সুখেরই ছিল। কিন্তু হঠাৎই জয়তীর ব্রেন ক্যানসার ধরা পড়ল। খুবই অ্যাডভান্সড স্টেজে। তখন আর কিছু করার ছিল না। মাত্র তিন মাসের ভেতর জয়তীর মৃত্যু ইল। এমন একটা শোকাবহ ঘটনার একেবারে ভেঙে পড়েছিল বিমলেশ। দুঃখটা সামলে নিতে অনেক সময় লেগেছে তার। ওরা নিঃসন্তান। একটা ছেলে বা মেয়ে হলে তবু একটা সান্ত্বনা থাকত। তাকে আঁকড়ে ধরে বাকি জীবনটা কাটিয়ে নিতে পারত। কিন্তু তার উপায় নেই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সে সম্পূর্ণ একা।
