মেজদি ইঙ্গিত বুঝেছিল। তবে আমার সঙ্গে ঘুরেফিরে বেড়ান নিয়ে মেমসাহেবের আত্মীয় মহলেও গুঞ্জন উঠেছিল। অপ্রিয় অসংযত আলোচনাও হতো মাঝে মাঝে। ও সেসব গ্রাহ্য করত না। দেখ খোকনদা, আমি কচি মেয়ে নই। একটুআধটু বুদ্ধিসুদ্ধি আমার হয়েছে। কিছু কিছু ভালমন্দও বুঝতে শিখেছি।
সব মিলিয়ে কলকাতার আকাশটা বেশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠল। মেমসাহেবও ধীরে ধীরে উপলব্ধি করল আর বেশীদিন কলকাতায় থাকলে দুজনেরই মাথাটা খারাপ হয়ে উঠবে।
ওগো, সত্যি তুমি এবার কোথাও যাবার ব্যবস্থা কর। আশপাশের কতকগুলো অপদাৰ্থ মানুষের ভালবাসার ঠেলায় প্ৰাণ বেরিয়ে যাচ্ছে।
আমাকে ছেড়ে তুমি থাকতে পারবে?
পারব। তবে যখন যেদিন দুজনে মিলবো, সেদিন তো আর কেউ বিরক্ত করতে পারবে না।
আত্মীয়বন্ধুর দল কেউ জানতে পারলেন না। ধীরে ধীরে আমি দিল্লী যাবার উদ্যোগ আয়োজন শুরু করলাম। গোপনে গোপনে কিছু কিছু কাগজপত্রের অফিসে গিয়ে আলোচনা করলাম। শেষে একদিন অকস্মাৎ এক অপ্ৰত্যাশিত মহল থেকে এক নগণ্য সাপ্তাহিকের সম্পাদক বললেন, দিল্লীতে আমার এক’জন করসপানডেন্টের দরকার। তবে এখন তো একশ টাকার বেশী দিতে পারব না।
কুচপরোয়া নেই। একশ টাকাই যথেষ্ট।
কথা দিলাম, ঠিক আছে আমি যাব।
কবে থেকে কাজ শুরু করবেন?
আপনি যেদিন বলেন।
অ্যাজ আলি অ্যাজ ইউ ক্যান গো।
মেমসাহেব পরের শনিবার ভোরবেলায় আমাকে নিয়ে কালীঘাটে গিয়ে পূজা দিল, প্ৰসাদ দিল, নির্মাল্য দিল। এই নির্মাল্যাটা সব সময় কাছে রেখো।
সন্ধ্যেবেলায় দুজনে মিলে ডায়মণ্ডহারবারের দিকে গেলাম। বেশী কথা বলতে পারলাম না কেউই।
মেমসাহেব বললো, আমার মন বলছে তোমার ভাল হবেই। আমার যদি ভালবাসার জোর থাকে, তাহলে তোমার অমঙ্গল হতে পারে না।
আমি শুধু বললাম, তোমার দেওয়া নির্মাল্য আর তোমার ভালবাসা নিয়েই তো যাচ্ছি। আমার আর কি আছে বল?
সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার নামতে শুরু করেছিল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, চল এবার যাই।
ও উঠল না। বসে রইল। ডাকল, শোন।
বল।
কাছে এস। কানে কানে বলব।
কানে কানে কি বললো জান? বললো, আমাকে একটু জড়িয়ে ধরে আদর করবে?
আবছা অন্ধকার আরো একটু গাঢ় হলো। আমি দু’হাত দিয়ে মেমসাহেবকে, টেনে নিলাম বুকের মধ্যে। সমস্ত অন্তর দিয়ে, সমস্ত মন-প্ৰাণ দিয়ে অনেক আদর করলাম।
তারপর মাথায় আঁচল দিয়ে ও আমাকে প্রণাম করল। আশীৰ্বাদ করে আমি যেন তোমাকে সুখী করতে পারি।
যুধিষ্ঠির রাজত্ব ও দ্ৰৌপদীকে পণ রেখে পাশা খেলেছিলেন। আমার রাজত্ব ছিল না। তাই নিজের জীবন আর মেমসাহেবের ভালবাসা পণ রেখে আমি কর্মজীবনের পাশা খেলতে যুধিষ্ঠিরের স্মৃতিবিজড়িত অতীতের ইন্দ্ৰপ্ৰস্থ, বর্তমানের দিল্লী এলাম।
১৩. বাঙালীর ছেলেরা ঘর ছেড়ে বেরুতে চায় না
বাঙালীর ছেলেরা ঘর ছেড়ে বেরুতে চায় না বলে একদল পেশাদার অন্ধ রাজনীতিবিদ অভিযোগ করেন। অভিযোগটি সর্বৈব মিথ্যা। মহেঞ্জোদাড়ো বা হরপ্পার যুগের কথা আমি জানি না। তবে ইংরেজ রাজত্বের প্রথম ও মধ্যযুগে লক্ষ লক্ষ বাঙালী সমগ্ৰ উত্তর ভারতে ছড়িয়েছেন। রুজি-রোজগার করতে বাঙালী কোথাও যেতে দ্বিধা করে নি। সুদূর রাওয়ালপিণ্ডি, পেশোয়ার, সিমলা পৰ্যন্ত বাঙালীরা গিয়েছেন, থেকেছেন, থিয়েটার করেছেন, কালীবাড়ী গড়েছেন।
এই যাওয়ার পিছনে একটা কারণ ছিল। প্ৰথমতঃ বাঙালীরাই আগে ইংরেজী শিক্ষা গ্ৰহণ করে সরকারী অফিসে বাবু হবার বিশেষ যোগ্যতা অর্জন করেন। সবাই যে কুইন ভিক্টোরিয়ায় অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট লেটার হাতে করে হাওড়া স্টেশন থেকে পাঞ্জাব মেলে চাপতেন, তা নয়। তবে রাওয়ালপিণ্ডি মিলিটারী একাউণ্টস অফিসে কোন না কোন মেশোমশাই পিসেমশাই-এর আমন্ত্রণে অনেকেই বাংলা ত্যাগ করেছেন।
পরে বাঙালী ছেলেছোকরার বোমা-পাটকা ছুড়ে ইংরেজদের ল্যাজে আগুন দেবার কাজে মেতে ওঠায় সরকারী চাকুরির বাজারে বাঙালীর দাম কমতে লাগল। ইতিমধ্যে ভারতবর্ষের দিকে দিকে ইংরেজী শিক্ষার প্রসার হওয়ায় সরকারী অফিসের বাবু যোগাড় করতে ইংরেজকে আর শুধু বাংলার দিকে চাইবার প্ৰয়োজন হলো না। বাঙালীর বাংলার বাইরে যাবার বাজারে ভাঁটা পড়ল।
জীবনযুদ্ধে ধীরে ধীরে বাঙালীর পরাজয় যত বেশী প্ৰকাশ হতে লাগল, মিথ্যা আত্মসন্মানবোধ বাঙালীকে তত বেশী পেয়ে বসল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চক্রান্তের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালীর এই আত্মসম্মানবোধ তাকে প্ৰায় বাংলাদেশে বন্দী করে তুললে। বাংলাদেশের নব্য যুবসমাজ চক্রান্ত ভাঙতে পারত, গড়তে পারত নিজেদের ভবিষ্যৎ, অগ্ৰাহ করতে পারত অদৃষ্টের অভিশাপ। কিন্তু দুঃখের বিষয় তা সম্ভব হলো না। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল, সুচিত্ৰা-উত্তম, সন্ধ্যা মুখুজ্যে-শ্যামল মিত্তির, বিষ্ণু দে-সুধীন দত্ত, সত্যজিৎ-তপন সিংহ থেকে শুরু করে নানাকিছুর দৌলতে বেকার বাঙালীও চরম উত্তেজনা ও কর্মচাঞ্চল্যের মধ্যে জীবন কাটায়। এই উত্তেজনা, কর্মচাঞ্চল্যের মোহ আছে সত্য কিন্তু সার্থকতা কতটা আছে তা ঠিক জানি না।
কলকাতায় রিপোর্টারী করতে গিয়ে বাংলাদেশের বহু মনীষীর উপদেশ পেয়েছি, পরামর্শ পেয়েছি কিন্তু পাইনি অনুপ্রেরণা। নিজেদের আসন অটুট রেখে, নিজেদের স্বাৰ্থ বজায় রেখে তাঁরা শুধু রিক্ত নিঃস্ব বুভুক্ষু বাঙালী ছেলেমেয়েদের হাততালি চান। সাড়ে তিন কোটি বাঙালীকে বিকলাঙ্গ করে সাড়ে তিন ডজন নেতা আনন্দে মশগুল।
