মেমসাহেব উড়িয়েই দিল আমার কথাটা। বললো, তা এত ভাববার কি আছে? কেউ একটু আগে, কেউ বা একটু পরে জীবনে দাঁড়ায়। তুমি না হয় দু’বছর পরেই জীবনে দাঁড়াবে, তাতে কি ক্ষতি হলো?
ভাবব না? হকারের মত ফিরি করে রোজগার করতে আর ভাল লাগে না। হাজার হোক বয়স তো হচ্ছে!
মেমসাহেব তাড়াতাড়ি আমাকে কাছে টেনে নেয়। দু’হাত দিয়ে আমার মুখটা তুলে ধরে বলে, ছি ছি, নিজেকে এত ছোট ভাবছ কেন?
ছোট ভাবতাম না। তবুও যদি ভদ্রলোকের মত রোজগার করতে পারতাম।
তোমার কি টাকার দরকার?
‘না, না, টাকার আবার কি দরকার!
বল না। আমি তো মরে যাইনি।
মেমসাহেব বড়ই উতলা হলো আমার কথায়। জানতে চাইল, আর কি ভাবছ?
বলব?
নিশ্চয়ই।
ভাবছি আমার এই অনিশ্চয়তার জীবনে তোমাকে কেন টেনে আনলাম। একটা আধাবেকার জার্নালিস্টের সংসারে তোমাকে এনে কেন তোমার জীবনটা নষ্ট করব, তাই ভাবছি।
মেমসাহেব রেগে ওঠে, চমৎকার। হাততালি দেব?
কেন ঠাট্টা করছ?
তোমার কথা শুনে আমি অবাক না হয়ে পারছি না। তোমার টাকা না থাকলে আমি তোমার কাছে ঠাই পাব না? তুমি আমাকে এত ছোট, এত নীচ ভাব?
পাগল কোথাকার। তোমাকে আমার সংসারে এনে যদি সুখ, শান্তি, মৰ্যাদা দিতে না পারি। তবে……
ও আর এগুতে দিল না, তুমি দুপাঁচশ’ টাকা রোজগার করলেই আমার শান্তি? টাকা হলেই বুঝি সবাই সুখী হয়?
না তা হবে কেন? তবুও ভদ্রভাবে বাঁচবার জন্য কিছু তো চাই।
আমার বা আমার সংসারের চিন্তা তোমার করতে হবে না। তুমি নিশ্চিন্ত মনে কাজ করে যাও তো।
কথায় কথায় বেলা যায়। সূৰ্যটা আস্তে আস্তে নীচে নামতে থাকে, গাছের ছায়া দীর্ঘতর হয়। বেলভিডিয়ারের সুবিস্তীর্ণ প্ৰাঙ্গণ। সূৰ্যরশ্মির বিদায়বেলায় মিষ্টি আলোয় ভরে যায়।
মেমসাহেব আমার কাঁধে মাথা রাখে। ওগো, বল তুমি এসব আজেবাজে কথা ভাববে না। আজ না হয়। ভগবান নাই দিলেন। কিন্তু একদিন তিনি নিশ্চয়ই ভরিয়ে দেবেন। তোমাকে।
তুমি বুঝি সবকিছু জান?
একশবার। ওয়েলিংটন স্কোয়ার আর মনুমেণ্টের মিটিং কভার করেই তোমার জীবন কাটাতে হবে না।
তবে কি করব?
কি না করবে। তাই বল। তুমি দেশদেশান্তরে ঘুরবে, কত বড় বড় লোকের সঙ্গে তোমার পরিচয় হবে, তুমি কত কি লিখবে…
তারপর?
মেমসাহেব আমার গাল টিপে বলে, তারপর আর বলব না। তোমার অহঙ্কার হবে।
আমার হাসি পায় মেমসাহেবের প্রলাপ শুনে। তুমি কি বোম্বে যাচ্ছ?
ও অবাক হয়ে বলে, আমি কেন বোম্বে যাব?
হিন্দী ফিল্মের স্টোরি লেখার জন্য।
অসভ্য কোথাকার।
সেদিন আমি শুধু একটা মোটামুটি ভাল চাকরির স্বপ্ন দেখতাম। আর? আর ভাবতাম। অফিস থেকে আমাকে একটা টেলিফোন দেবে। আমি অফিসের গাড়ি করে রাইটার্স বিল্ডিং, লালবাজার যাব, পলিটিক্যাল পার্টিগুলোর অফিসে ঘুরে বেড়াব। চীফ মিনিস্টারের সঙ্গে দাৰ্জিলিং যাব। রাইটার্স বিল্ডিং-এর সেক্রেটারী ডেপুটি সেক্রেটারীরা আমাকে উইস করবেন, পুলিস কমিশনার ভিড়ের মধ্যেও আমাকে চিনতে পারবেন, শ্যামপুকুর থানার ও-সি আমাকে কাটলেট খাওয়াবেন।
স্বপ্ন দেখারও একটা সীমা আছে। তাইতো আমি আর এগুতে পারতাম না। আজ সেসব দিনের কথা ভেবে হাসি পায়। কোনদিন কি তেবেছি আমি নেহেরু-শাস্ত্রী-ইন্দিরার সঙ্গে পৃথিবীর পঞ্চ মহাদেশ ঘুরে বেড়াব? কোনদিন কল্পনা করতে পেরেছি। বছর বছর বিলেত যাব? কোনদিন কি ভাবতে পেরেছি। প্ৰাইম মিনিস্টারের সঙ্গে এয়ার ফোর্সের স্পেশ্যাল প্লেনে দমদমে নামিব? রাজভবনে থাকিব? আরো অনেক কিছু ভাবিনি। ভাবিনি। ভারতবর্ষের টপ লীডরেরা আমার সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে গোপন আলোচনা করবেন, হুইস্কি খেতে খেতে অ্যাম্বাসেডরদের সঙ্গে ইণ্টারন্যাশনাল এ্যাফেয়ার্স ডিসকাস করব।
মেমসাহেব বোধহয় এসব ভাবত। কোথা থেকে, কেমন করে এসব ভাবনার সাহস সে পেত, তা আমি জানি না। তবে আমার কর্মজীবনের কৃষ্ণপক্ষেও সে-আশা হারায় নি। তাইতো যতবার আমি নিরাশায় ভেঙে পড়েছি, যতবার আমি পরাজয় মেনে নিয়ে কর্মজীবনের পথ পাণ্টাতে চেয়েছি, ও ততবার আমাকে তুলে ধরেছে। আশা দিয়েছে, ভরসা দিয়েছে, ভালবাসা দিয়েছে।
কখনও কখনও শাসনও করেছে।
সবই বুঝি মেমসাহেব। কিন্তু এই কলকাতায় পরিচিত মানুষের দ্বারে দ্বারে আর কৃপা প্ৰাথী হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারছি না।
মেমসাহেব স্পষ্ট বললো, কলকাতাতেই যে তোমার থাকতে হবে, এমন কি কথা আছে। যেখানে গিয়ে তুমি কাজ করে শান্তি পাবে, সেইখানেই যাও।
এক মুহুর্ত চুপ করে ও আবার বললো, আমি তো তোমাকে। আমার আঁচলের মধ্যে থাকতে বলি না।
মেমসাহেব জীবনে একটা লক্ষ্য স্থির করেছিল। সে-লক্ষ্য ছিল আমার কল্যাণ, আমার প্রতিষ্ঠা। আর চেয়েছিল প্রাণভরে ভালবাসতে, তালবাসা পেতে।
মধ্যবিত্ত সংসারের কুমারী যুবতীর পক্ষে এমন অদ্ভূত লক্ষ্য স্থির করে অগিয়ে যাওয়া সহজ ব্যাপার নয়। মেমসাহেবের পক্ষেও সহজ হয় নি। বাধা এসেছে, বিপত্তি এসেছে, এসেছে প্ৰলোভন। এইত সুবোধবাবু আমেরিকা ফেরার পর যখন ইঙ্গিত করলেন মেমসাহেবকে তাঁর বেশ পছন্দ, তখন বাড়ির অনেকই অনেক দূর এগিয়েছিলেন।
মেমসাহেব কি বলেছিল জান? বলেছিল। মেজদি, মা-কে। একটু বুঝিয়ে বলিস রেডিমেড জাম-কাপড় দেখতে একটু চকচক করে। কিন্তু বেশীদিন টেকে না, তার চাইতে ছিট কিনে মাপমত নিজের হাতে তৈরি করা জিনিস অনেক ভাল হয়, অনেক বেশী সুন্দর হয়।
