ঐ ড্রইংরুমে বসেই আরও এক রাউণ্ড চা খেতে খেতে ঠিক হল, সুবোধবাবু পরের দিন ভোরবেলার ট্রেনে রওনা হবেন।
সুবোধবাবু স্নান করে বেরুতেই ব্রেকফাস্টের ডাক পড়ল। উনি ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াতেই মিসেস ব্যানার্জী বললেন, ছোট মেয়ে মামারবাড়ি গেছে। তাই এখন আমরা মাত্র তিনটি প্রাণী এখানে আছি। আমরা দুজনে আপনার সঙ্গে গল্প করছি আর। আমার মেজ মেয়ে একলা একলা ঘরের মধ্যে
সুবোধবাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আপনাদের আপত্তি না থাকলে আমরা সবাই মিলেই তো গল্প করতে পারি।
ওঁরা স্বামী-স্ত্রী প্রায় একসঙ্গেই ডাক দিলেন, কৃষ্ণা, এদিকে আয়।
দক্ষিণ দিকের কোণার ঘর থেকে বেরিয়ে কৃষ্ণাকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসতে দেখেই সুবোধবাবু মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন।
৩. বাঙালীকে যারা ঘরকুনো বলেন
বাঙালীকে যারা ঘরকুনো বলেন, তারা সত্যি বাঙালীর ইতিহাস জানেন না। আজ নয়, বাঙালী চিরকালই ঘর ছেড়ে অজানা দেশ দেশান্তরের পথে বেরিয়ে পড়েছে। সেই অনাদি অতীতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও বাঙালী সেনারা যোগ দিয়েছিল। তবে হ্যাঁ, বাঙালী সেনারা সত্যাশ্রয়ী পাণ্ডবদের পক্ষে ছিল না। ওঁরা লড়াই করেছিলেন কুরুর পক্ষে। শুধু সে সময় নয়, বাঙালী চিরকালই রাজাদের দলে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর কিছু বাঙালী ক্ষেপে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু তাদের ঠাণ্ডা হতেও বেশি সময় লাগেনি। তারপর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সময় কিছু বাঙালী রাজার বিরুদ্ধে হাতিয়ার ধরেছিল কিন্তু তাদের সহস্রগুণ বেশি বাঙালী তখন দেবজ্ঞানে রাজসেবা করেছেন। আগস্ট বিপ্লবের সময়ও বাঙালী রাজদ্রোহীদের চাইতে অনেক অনেক বেশি সংখ্যক বাঙালী পুলিস ও গোয়েন্দা সে বিদ্রোহ দমনে সব শক্তি নিয়োগ করেছিল। অজিও আমরা অনেকেই এস. পি. ম্যাজিস্টেট, মন্ত্রী দেখলে গদগদ না হয়ে পারি না।
বাঙালীর রক্তেই বোধহয় রাজভক্তির বীজ লুকিয়ে আছে। পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভ করলেও লর্ড ক্লাইভ বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাছাড়া ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ঘর-সংসার সামলাতে কয়েকটা বছর তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। তারপর একটু ফুরসত পাবার পর লর্ড ক্লাইভ বেরিয়ে পড়লেন এবং এলাহাবাদ যাবার সময় সঙ্গে নিলেন কলকাতা শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেব মহাশয়কে। হাজার হোক একে রাজা নবকৃষ্ণ, তার উপর স্বয়ং লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে বেরিয়েছেন। সুতরাং সাঙ্গপাঙ্গ অনেক ছিল এবং তাদেরই একজনের নাম গঙ্গাধর। শ্রীমান গঙ্গাধরের হাতে তৈরি তামাক না খেলে রাজা নবকৃষ্ণের তৃপ্তি হতো না।
যমুনা যেখানে পুণ্য পবিত্র জাহ্নবীতে আত্মসমর্পণ করে আত্মহারা হয়ে লুপ্ত সরস্বতীর সঙ্গে একাকার হয়েছে, সেই ত্রিবেণী সঙ্গমের শোভা দেখবার সময় লর্ড ক্লাইভ রাজা নবকৃষ্ণের সুপারিশে গঙ্গাধরের হাতে তামাক খেয়ে এমনই মুগ্ধ হয়ে যান যে সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ সহস্র মুদ্রা ও কোম্পানিতে একটি স্থায়ী চাকরি দেন। ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রবাসী বাঙালী পরিবারের জন্ম হল।
গঙ্গাধরের আদি নিবাস ছিল হুগলী। এবং তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন। তার গলায় পৈতা থাকলেও পেটে শাস্ত্রজ্ঞান ছিল না। শুধু তাই নয়। পিতামহের শত চেষ্টাতেও তিনি শালগ্রামশিলার সেবা করতেও শিখলেন না বলে ঘর থেকে বিতাড়িত হন। শ্রীমান গঙ্গাধর মন্ত্র-তন্ত্র না জানলেও তামাক খেতে বড় ভালবাসতেন এবং সাজতেনও ভাল। ঐ বিদ্যাটুকু সম্বল করেই তিনি একদিন ঘুরতে ঘুরতে কলকাতা শহরে হাজির। বিধির বিধান কে খণ্ডাবে! একদিন আহিরীটোলার গঙ্গার ঘাটে রাজা নবকৃষ্ণের এক বিশ্বস্ত কর্মচারীর সঙ্গে এই ব্রাহ্মণ সন্তানের পরিচয় হয় ও তিনি তার দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে বড়ই বিচলিত হন। ওঁরই কৃপায় গঙ্গাধর রাজা নবকৃষ্ণের রাজবাড়িতে প্রথমে আশ্রয় লাভ ও পরে স্নেহভাজন কৃপাপাত্র হয়ে ওঠেন।
যাই হোক লর্ড ক্লাইভ ও রাজা নবকৃষ্ণের বিদায়ের পর গঙ্গাধর কিছুকাল বিলাস-ব্যসনে জীবন কাটালেও অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কোম্পানির চাকরি করেন। ইতিমধ্যে হুগলী দেবানন্দপুর-ভাস্তাড়া অঞ্চলের এক ব্রাহ্মণ সপরিবারে তীর্থ ভ্রমণে এলে অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের একান্ত অনুরোধে গঙ্গাধর তার কন্যাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর গঙ্গাধর চাকরির সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির কন্ট্রাক্টারী শুরু করেন ও প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। গঙ্গাধর মৃত্যুর সময় দুটি স্ত্রী, নটি পুত্র, পাঁচটি কন্যা, পাঁচটি নাতি-নাতনী, একটি অট্টালিকা, চার-পাঁচশ ভরি সোনা, প্রায় মনখানেক রূপা, বিশ-ত্রিশ মণ বাসন-কোসন ও প্রায় পনেরো হাজার টাকা নগদ রেখে যান। তখন বোধ হয় সত্যি রাম-রাজত্ব ছিল!
গঙ্গাধরের মৃত্যুর পরই পরিবারের মহা অশান্তি দেখা দেয় ও আস্তে আস্তে সোনার সংসার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। বছর দশেকের মধ্যে গঙ্গাধরের বংশধররা প্রায় সারা উত্তরপ্রদেশে ছড়িয়ে পড়েন। ইতিমধ্যে ইংরেজ রাজত্বের পাকা বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে। অফিস আদালতের সঙ্গে সঙ্গে লেখাপড়া শেখার বিধি-ব্যবস্থা ও ডাক্তারখানা চালু হল এবং এই সমস্ত বিভাগেই বাঙালীর প্রভাব-প্রতিপত্তি ও একাধিপত্য ছড়িয়ে পড়ল। কোর্ট-কাছারির কৃপায় বাঙালী উকিলবাবুরা তো রাজা হয়ে গেলেন। লোকে সাধে কি বলত, লড়ে টোপী-ওয়ালা, খায় ধোতিওয়ালা! এইরকম এক ভাগ্যবান উকিল ছিলেন গঙ্গাধরের পঞ্চম পুত্র শ্রীধর বাঁড়ুজ্যে। কোম্পানির অনেক ইংরেজ কর্মচারীই এই শ্রীধর ব্যানার্জীর বন্ধু ছিলেন ও কালেক্টর লঙ সাহেবের কৃপায় তার জ্যেষ্ঠপুত্র ডাকমুন্সীর চাকরি পান। এর কিছুকাল পরে ডাকবিভাগ কালেক্টরের হাত থেকে সিভিল সার্জেনের অধীনে চলে যায় এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অশ্ব ডাক চালু হয়। শ্রীধর নন্দন ডাক অশ্বের কালেক্টর হন।
