চাকরির উমেদারী করতে আসার সময়ই কাপুর স্ত্রী কমলাকে নিয়ে এসেছিলেন ট্যান্ডন সাহেবের কাছে।
সাব ছোটা সে এক নোকরি দে দিজিয়ে। বড়ই বিপদে পড়েছি।
চাকরি-বাকরি নেই তো বিয়ে করলে কেন?
কাপুর আর কমলা মাথা হেঁট করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
এক গাদা বাচ্চা-কাচ্চাও হয়েছে নিশ্চয়ই?
কমলা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। কাপুর চাপা গলায় জবাব দেয়, না সাহেব, এখনও বাচ্চা-কাচ্চা হয়নি।
লোদি রোডের বাংলোর বারান্দার দু-চারবার পায়চারি করে ট্যান্ডন সাহেব বললেন, চাকরি তো টেম্পোরারি।
তাতেই রাজি স্যার।
ঠোঁটটা কামড়ে এক ঝলক বিদ্যুৎ দৃষ্টি দিয়ে কমলাকে দেখে বললেন, রেশনিং-এর চাকরিতে তো কেবল বাইরে বাইরে ঘুরতে হবে। তারপর একটু চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, অবশ্য তাতে অ্যালাউন্স পাবে।…
হাঁ সাব তাতে অসুবিধা হবে না।
তোমার ফ্যামিলিকে কে দেখাশুনা করবে?
কাপুর শুধু চাকরিই পেল না, তিন মাসের মধ্যে পারচেজ ইন্সপেক্টর হল। সরকারের চাল-আটা কিনতে ঘুরে বেড়াত নানা দেশ। সরকারি অ্যালাউন্স ছাড়াও উপরি-পাওনাও আসতে লাগল দু-পকেট ভরে।
ট্যান্ডন সাহেব প্রথমে সপ্তাহে একদিন, তারপর দুদিন, তারপর রোজ সন্ধ্যায় বেঙ্গলি মার্কেটের ফ্ল্যাটে গিয়ে কমলার দেখাশুনা শুরু করলেন। আরো কতজনকে দেখাশুনা করতেন কে জানে? কেউ টু শব্দটি করতে পর্যন্ত সাহস করত না। টেম্পোরারি চাকরি। মুহূর্তের মধ্যে তাসের ঘর লুটিয়ে পড়বে।
ফুড ডিপার্টমেন্টের পুরনো কর্মচারীরা জানলেও এসব কাহিনি ক্যাপ্টেন রায় জানেন না। তবে হিজ একসেলেন্সি ট্যান্ডন কলকাতা এসে সন্ধ্যার অন্ধকারে ছোট্ট প্রাইভেট গাড়ি চড়ে বেহালায় মিসেস সরকারের কাছে রোজ ডিনার খেতে যেতেন, তা তো জানেন।
.
উর্দুতে একটা কথা আছে, আই-ই তো ঈদ, নেহি তো রোজা। জুটল তো ভুরিভোজন, নয়তো অনশন। কথাটা বার বার মনে পড়ছিল ক্যাপ্টেন রায়ের।
সেদিন সকালে লাট সাহেবের কোনো ভিজিটার্স ছিলেন না। আগের দিন রাত্রি দশটা পর্যন্ত কুমারী পদ্মাবতীর নাচ দেখে এসে কি পরের দিন সকালে কাজ করা যায়? লাটসাহেব তো আর রাইটার্স বিভিং-এর লোয়ার ডিভিশন কেরানী নন। সরকারি বা বেসরকারি ডিনার অথবা অন্য কোনো প্রোগ্রামের জন্য রাত্রি নটা সাড়ে নটা পর্যন্ত লাটসাহেব এনগেজড থাকলে পরের দিন সকালে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকে না। সরকারি প্রোগ্রাম থাকলে অবশ্য আলাদা কথা। পাঁচ হাজার টাকার চাকরির জন্য যদি ভোরে উঠে গান্ধী ঘাটে মালা দিতে হয় বা দমদম এয়ারপোর্টে অজ্ঞাত অপরিচিতিকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে অভ্যর্থনা জানাতে হয় তো সে আলাদা কথা। অন্যথায় ছাপানো এনগেজমেন্টের কাগজে চব্বিশ পয়েন্টের মোটা মোটা হরফে লেখা থাকবে নো এনগেজমেন্ট ইন দি মর্নিং।
সাধারণত রাজভবনের অফিসাররাও জরুরি কাজ না থাকলে ওই সময় লাটসাহেবকে বিরক্ত করেন না। সকালে তাই ক্যাপ্টেন রায় সোজা এসেছেন নিজের অফিসে। কিছু কাজকর্ম ছিল। কিন্তু ঠিক মন বসল না। পাশের জানালা দিয়ে চেয়ে রইলেন দূরের নীল আকাশের দিকে।
ক্যাপ্টেন একটা সিগারেট ধরালেন। আপন মনে ভাবছিলেন গত রাত্রের কথা। ক্যাপ্টেন ট্রাই দিস ফাস্ট দিস ইজ কোলেটা পোজারস্কী।
আই-ই-তো ঈদ, নেহি তো রোজা।
এলাহাবাদ ইস্টার কলেজে পড়বার সময় কথাটা শিখেছিল মাথুরের কাছ থেকে।…সতীর্থ অশোক বাজপেয়ী আবার নতুন করে ভালোবাসল চন্দ্রাবলীকে। সিভিল লাইল-এর নির্জন পথে ঘন ঘন দেখা গেল দুজনকে। ক্লাস ফাঁকি সাইকেল নিয়ে যমজবাগের দিকে উধাও হবার খবরও শোনা যেত মাঝে মাঝেই। অভয়া, গার্গী, ডলিদের নিয়ে যা হতো, চন্দ্রাবলীকে নিয়ে অশোক শুধু তার পুনরাবৃত্তি করছিল। নতুন কিছু নয়।
ছাত্রদের মধ্যে উত্তেজনা, ছাত্রীদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা গেল। রাগে দুঃখে, হিংসায় অনেক ছেলেমেয়েই অস্থির হয়ে উঠল। উত্তেজনা অস্থিরতা যখন চরমে, তখন মাথুর বলেছিল, এই তো দুনিয়া! আ-ই তো ঈদ, নেহী তো রোজা।
হাসতে হাসতে মাথুর বলেছিল, অশোকের ঈদ, আমাদের রোজা!
ইস্টার কলেজের দিনগুলো বহুদূরে চলে গেছে। বহুদিন পর এ-ডি-সি-র চাকরি করতে এসে ক্যাপ্টেন রায়ের বড় বেশি মনে পড়ছে মাথুরের কথা, আই-ই তো ঈদ…
অ্যান্ডারসন, বারোজ বা লর্ড কেসি যখন বাংলার লাট ছিলেন, তখন আই-সি-এস, আই-পি-এস ছাড়া কিছু রায়-সাহেব খান-সাহেব-রায়-বাহাদুর-খান-বাহাদুরের দল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন। দেশ স্বাধীন হবার পর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার নিয়মও পাল্টে গেল। শুধু বাংলায় নয়, সারা দেশেই। সরকারি পৃষ্ঠপোশকতার জোয়ার ভাটা হতো। কখনও কুমিল্লা, কখনও শ্রীরামপুর! কখনও বরিশাল, কখনও বাঁকুড়া! কখনও ব্রাহ্মণ, কখনও বদ্যি। মাদ্রাজে ব্রাহ্মণ-নাদার, অন্ধে, কামারেড্ডি, পাঞ্জাবে পাঠান-সর্দার-জাঠ। উত্তরপ্রদেশে ব্রাহ্মণ-কায়স্থ। ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাংলাদেশে যখন নন্-ম্যাট্রিকুলেট নেতাদের রাজত্বে ঘোর কলিকাল চলছে, তখন যে কজন ব্যর্থ কেরানী রেসের ঘোড়ার মতো একলাফে অফিসার হয়েছিলেন, রাজ্যপালের স্পেশাল সেক্রেটারি মিঃ সরকার তাদের অন্যতম। যে সরকার ধুতি-পাঞ্জাবি পরে গ্যালিফ স্ট্রিটের ট্রামে চড়ে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ফুড ডিপার্টমেন্টের তিন তলার কোণার হল ঘরের হাতল ভাঙা চেয়ারে বসতেন, তিনি হঠাৎ থ্রি পিস স্যুট করে সত্যমেব জয়তে মার্কা গাড়িতে ঘোরা-ঘুরি শুরু করলেন।
