সেদিন শনিবার। পার্লামেন্ট নেই। ভেবেছিলাম একটু বেলা পর্যন্ত ঘুমোবো। কিন্তু ভোরবেলায় ঘুম ভাঙাল কাপুর সাহেবের চাকর রামলোচন সিং। গাড়ী নিয়ে ছুটে গেলাম। আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো, বাবুজী, সাহেব দাবাই পিকে গুজর গ্যায়া।
৪. প্রতি মানুষের জীবনেই কিছু না কিছু দুর্ঘটনা
প্রতি মানুষের জীবনেই কিছু না কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। আমার জীবনেও ঘটেছে। কিন্তু এর কোন কারণ নেই, কোন যুক্তি নেই। যা হলো, তা না হলেও চলতো এবং যা ঘটল না অথচ ঘটলে ভাল হতো–এমনি অনেক কিছু দিয়েই তো মানুষের জীবন। এই সব যুক্তি-তর্ক আমি জানি, আমি বুঝি কিন্তু তবু আজও অলস মধ্যাহ্নে বা গোধূলির রাঙা আলোয় মথুরা রোড দিয়ে আস্তে আস্তে বাড়ি ফেরার পথে মনটা উদাস হয়ে যায়। ডান পাটা অ্যাকসিলারেটরের পর চাপ দিলেও যেন গাড়ী ছুটতে চায় না, স্টিয়ারিংটা জোর করে চেপে ধরলেও যেন মনে হয় তাতে জোর নেই। পিছনের সমস্ত গাড়ী আমাকে ওভারটেক করে আগে যায়, আমি পিছিয়ে পড়ি।
কিন্তু আমার মন? সে ইমপালা, মার্সিডিসকে হারিয়ে দেয়। ছশো-সাতশো মাইল স্পীডের বোয়িং সেভেন-জিরো সেভেনকেও হারিয়ে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে আমার মন ছুটে চলে যায় কায়রোর নাইল নদীর পাড়ে, নাইল হিলটন হোটেলের চারতলার ঐ কোণার ঘরে।
আজও মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গলে ধড়মড় করে লাফিয়ে উঠি, মনে হয় বুঝি ডাক্তারের ঘরেই শুয়ে আছি। আজও বিদেশে গেলে হোটেলের লাউঞ্জে, এয়ারপোর্টের ট্রানজিট লাউঞ্জে বা এয়ার লাইন্সের কাউন্টারে একটা বিরাট খোপাওয়ালা একটু ময়লা, একটু বেঁটে মেয়ে দেখলে আজও চমকে উঠি।
কিন্তু কেন এমন হয়? আমি তো ডাক্তারের প্রেমে পড়িনি, সেও তো আমাকে নিয়ে ভবিষ্যৎ জীবনের কোন স্বপ্ন দেখেছিল বলে আমি বুঝতে পারিনি। তবে? এর জবাব আমি খুঁজে পাইনি। মনে মনে শুধু এই কথা ভেবে সান্ত্বনা পেয়েছি যে, মানুষের মন তো অপারেশন থিয়েটারের পেসেন্ট নয় যে ছুরি-কাঁচি দিয়ে কাটাকুটি করলেই ব্যথা লাগে আর সেলাই করে কটা ইনজেকশন দিয়ে বড়ি গিলিয়ে দিলেই সে ব্যথা সেরে যাবে।
তাই তো আজও অনেক স্মৃতির ভীড়ের মধ্যেও ডাক্তারের স্মৃতিকে মুছে ফেলতে পারিনি। ভুলতে পারিনি সেই দুটি দিনের মিষ্টি ইতিহাস। আমি স্থির জানি আজও যদি কায়রো, রোম, প্যারিস বা লণ্ডনে অপ্রত্যাশিতভাবে ডাক্তারের সঙ্গে আমার দেখা হয়, আনন্দে -আত্মতৃপ্তিতে তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, উত্তেজনায় জড়িয়ে ধরবে। হয়তো শাড়ির আঁচলটা বুকের পর থেকে খসে পড়বে, চোখের কোণে একটু দুষ্টু হাসির রেখা ফুটিয়ে বলবে, বাচ্চু! তুমি আজও আমাকে ভুলতে পারনি?
আমি শুধু বলব, ডাক্তার, তুমি যে আমাকে এমন করে ভুলে যাবে তা আমি কোন দিন ভাবতে পারিনি।
আমার কাছ থেকে একটু সরে শাড়ির আঁচলটা টেনে উঠিয়ে আবার ভাল করে জড়িয়ে নিতে নিতে ডাক্তার বলবে, তুমি যেন কোথাকার কোন্ রাজপুত্তর, পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে একদিন আমার পর্ণকুটিরে উদয় হয়ে আমাকে ধন্য করেছিলে যে তোমাকে মনে করে রাখতে হবে।
ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় জানি না, নাইল হিলটন হোটেলের ঐ দুটি দিনের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে ডাক্তারের জন্য আহত আমার মনটা পীড়িত হয়। জীবন সংগ্রামের কোন ব্যর্থতার বেদনায় কখনও মনটা বিষণ্ন হলে ডাক্তারের কথা মনে পড়ে, ঐ দুটি দিনের ইতিহাস রোমন্থন করে এখনও অনেক আনন্দ, অনেক তৃপ্তি পাই।
……মাস চারেক আগে বিদেশ যাত্রার প্রাক্কালে পালামে অনেকেই এসেছিলেন আমাকে বিদায় জানাতে। লগেজ ও টিকিট চেক করে কাস্টমস এনক্লোজারে না ঢুকে ফিরে এসেছিলাম লাউঞ্জের এক কোণায় বন্ধু বান্ধবীদের মাঝে।
কোকাকোলার বোতল নামিয়ে রেখে বেলা গুণ গুণ করে গা শুনিয়েছিল, মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে চলে, সেদিন ভরা সাঁঝে’ গৌরী-বৌদি কানে কানে ফিস ফিস করে বলেছিলেন, দেখবেন ঠাকুরপো, বেশী দুষ্টুমি করবেন না কিন্তু! আদো আদো গলায় ছল ছল চোখে বনুয়া মেমসাহেব জিজ্ঞাসা করেছিল, আমাকে মনে থাকবে? আমি ওর মাথাটায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছিলাম, যদিদং হৃদয়ং তব, তদিদং হৃদয়ং মম, সুতরাং তোমাকে ভুলব কি ভাবে বলতে পার?
প্রতিমা আমাকে একটা চিমটি কেটে বলল, কমিনিট বাদে এয়ার হোস্টেস দেখলেই তো সব গুলিয়ে যাবে আবার…
আমি বললাম, বলেন কি? এয়ার হোস্টেস তো এমনিতে উড়ে বেড়ায়; তাঁকে নিয়ে আমি আর কি উড়ব? উড়তে হলে গ্রাউণ্ড হোস্টেস নিয়েই উড়ব।
উকিলদার চিৎকার, ব্রহ্মচারীর মুচকি হাসি ও আরো অনেক কিছু উপভোগের পর দামাল দত্তের কমিক গান শুনিয়ে আমার বিদায় সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান শেষ হলো! আমি পাশপোর্ট, হেলথ সার্টিফিকেট চেক করিয়ে কাস্টমস এনক্লোজারে ঢুকলাম। তারপর আবার বেরিয়ে এসে বাইরে রেলিং-এর এপারে দাঁড়িয়ে সবাইকে বিদায় জানিয়ে আস্তে আস্তে প্লেনের দিকে এগিয়ে গেলাম। অনেক দূর পর্যন্ত গিয়েও বার বার পিছন ফিরে দেখেছি, হাত নাড়ার উত্তর দিয়েছি। প্লেনের মধ্যে ঢোকবার আগে আর একবার রুমাল নেড়ে ওদের সবার প্রতি শেষবারের মতো শুভেচ্ছা জানালাম।
ব্যস! তারপর আর প্রাণ খুলে বাংলা কথা বলিনি, প্রাণ খুলে আড্ডাও দিইনি। লণ্ডনে একদিন সন্ধ্যায় এক বাঙালী ডাক্তারের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম, কিন্তু তা নিতান্তই ক্ষণেকের জন্যে। দীর্ঘ চারমাস বিদেশ ভ্রমণকালে আরো দুচারজন বাঙালীর দেখা পেয়েছি, কিন্তু তার বেশী কিছু নয়।
