আর মুরলী সবচেয়ে খুশি।
বলে–রঘুয়া, আর-একটু বড় হলে তুই আমাদের সব চাইতে জোয়ান হয়ে উঠবি। কেউ দাঁড়াতে পারবে না তোর সঙ্গে। এসব ভালো–খুব ভালো। কিন্তু–
কিন্তু যেই রাত হয়, বনের ওপর কালো ছায়া নামে, তারপর গাছপালাগুলো অন্ধকারে ভুতুড়ে হয়ে যায়, তখন রাঘবের মনের ওপরেও ছায়া পড়তে থাকে। আরও রাত বাড়ে, ঝাঁ ঝাঁ করে ঝিঁঝির ডাক উঠে সমস্ত বনটাকে যেন করাতের মতো চিরতে থাকে। কোথায় কীসব পাখি ডাকে কু কু কুক! মোটা গলায় মধ্যে মধ্যে হুতোম প্যাঁচা সাড়া তোলে, শেয়ালের আলাপ আসে, আর কখনও কখনও সব ছাপিয়ে অনেক দূরে গুমগুম করে শোনা যায় বাঘের ডাক।
সেই তখন—
রাঘবের ভয় করে? না!
কান্না পায়। মার কথা মনে পড়ে, বাবার জন্য ভারি কষ্ট হয়। বাবার যেসব কথা সে তখন শুনেও শুনত না, সেইগুলোও তার কানে বাজতে থাকে : তুই আমার একমাত্র ছেলে, তোর ওপরেই তো আমার সব ভরসা। দুদিন পরে বুড়ো হয়ে যাব–দোকানপাট আর। দেখতে পারব না–তখন তুই ছাড়া কে আমার পাশে এসে দাঁড়াবে? কে আমাদের দেখবে? কে দুমুঠো খেতে দেবে? তুই মানুষের মতো মানুষ হ–তোকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করবার জন্যে আমার শেষ পয়সাটা অবধি আমি খরচ করব।
আরও মনে পড়ে, ক্লাসে মাস্টারমশাই বিলেতের কোন এক বড়লোকের গল্প বলেছিলেন। তাঁর বাবাও ছিলেন সামান্য দোকানদার। একদিন তাঁর অসুখ করেছিল, ছেলেকে বললেন, তুই আজ দোকানে যা! আদুরে ছেলে জবাব দিলে, এত রোদ্দুরে আমি যেতে পারব না। বাবা আর একটি কথাও বললেন না–সেই অসুখ নিয়েই রোদের মধ্যে দোকানে চলে গেলেন। বড় হয়ে সেই ছেলেটির সেজন্যে এত অনুতাপ হয়েছিল যে রোজ দুপুরে মাথার টুপি খুলে কিছুক্ষণ রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেবেলার সেই অপরাধের শাস্তি নিত।
বাবার কথা, মাস্টারমশাইয়ের কথা তখন রঘুর এক কান দিয়ে ঢুকে আর কান দিয়ে গুলতির মতো ছিটকে বেরিয়ে অন্য কানে গেছে। সকালে ঘুম ভেঙেই ভাবত, এখন কী খাব। সরপুরিয়া না সরভাজা? দুপুরে থালার পাশে বারোরকম রান্না সাজানো থাকত। বিকেলে পাঁচ-সাতটা চমচম আর এক ভাঁড় রাবড়ি তো ছিল বাঁধা জলযোগ। আর রাত্তিরে খাওয়া-খাওয়া আর খাওয়া। ও-ই তখন একমাত্র লক্ষ্য, যাকে বলে ধ্যান-জ্ঞান-তপস্যা। কে শুনছে বাপের কথা,মাস্টারের কথা। চিরজীবন এমন করে খেয়েই দিব্যি কেটে যাবে।
কিন্তু রাতের বেলা বনের মধ্যে করাত চেরার মতো আওয়াজ করে যখন ঝিঁঝি ডাকে, যখন বাঘের ডাকে সমস্ত বলরামপুরের জঙ্গল গুমগুম করে ওঠে, যখন একা খাঁটিয়ায় রাঘবলালের আর ঘুম আসে না–তখন তার চোখ দিয়ে জল পড়ে। তারও সেই টুপি খুলে রোদ্দুরে। দাঁড়াবার মতো একটা কিছু করতে ইচ্ছে হয়। যদি সে কোনওদিন বাড়ি ফিরতে পারে তা হলে খাওয়ার কথা আর ভাববে না। বাবার কথা শুনবে-লেখাপড়া শিখে মানুষ হতে চেষ্টা করবে।
অথচ, ফিরতে সে কি কোনওদিনই পারবে আর? বৃন্দা সিংয়ের চোখ এখন হাজার হাজার জোনাকি হয়ে পাহারা দেয়–এই বন থেকে সে প্রাণ নিয়ে বেরুতে পারবে না। ভয়টা আরও ঘন হয়ে রাঘবের বুকে চেপে বসতে চায়, যখন অনেক রাত পর্যন্ত গোল হয়ে বসে। দলবল নিয়ে বৃন্দা সিং চাপা গলায় ফিসফিসিয়ে আলোচনা করে। তখন ওদের মুখগুলোকে মানুষের বলে বোধ হয় না–বাঘের মতো দেখায়।
রাঘব বুঝতে পেরেছে, ওরা কী একটা ভয়ঙ্কর ডাকাতির মতলব আঁটছে। আর তখনই রঘুর রক্ত আতঙ্কে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তার জীবন ডাকাতের দলের কাটবে। যারা মানুষ মারে, লুট করে! ফাঁসির আসামী হয়–দীপান্তরে যায়!
মুরলীকে জিজ্ঞেস করে : কী করি ভাই?
মুরলী বলে, জানি না।
–চল না, পালাতে চেষ্টা করি।
–কালী মাঈজীর মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বলি দিয়ে দেবে।
–সেও ভালো। কিন্তু কিছুতেই ডাকাত হতে পারব না!
মুরলী একটু চুপ করে থাকে। ওর চোখ দুটো ছল-ছল করে।
–পালিয়েই বা কী হবে? তোর নয় ঘর আছে–আমার কে আছে? আমি কার কাছে থাকব?
–কেন, আমাদের বাড়িতে যাবে। আমার মা বাবা খুব ভালো লোক, তোমাকে কত আদর করবে–দেখে নিয়ো।
মুরলী আবার চুপ করে থাকে। তারপর বলে, না সর্দারকে ছেড়ে আমি যাব না।
–তুমি সর্দারকে ভক্তি করো? ওইরকম ভয়ঙ্কর লোকটাকে?
–জানি না। খুব ছোটবেলায় বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। কোন্ গ্রাম–বাপের নাম কী, কিছুই মনে নেই। কিন্তু সেই থেকে সর্দার আমায় মানুষ করেছে। নেমকহারামি করতে পারব না আমি।
রাঘব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মুরলীর দিকে। এই ছেলেটাকে সে বুঝতে পারে না।
এমন সময় হয়তো দাঁত বের করে এসে হাজির হয় ভুট্টারাম। লোকটাকে দেখলে গা জ্বলে যায়।
–কী মতলব আঁটা হচ্ছে দুজনে? খইনি-খাওয়া কালোকালো দাঁত দেখিয়ে ভুট্টারাম জানতে চায়। মুরলী বলে, তা দিয়ে তোমার কী দরকার?
–দরকার কিছুই নেই, কিন্তু এই রঘুয়াটা ভারি বদমাশ। একদিন আমি ওর বদন বিগড়ে দেব।
রঘু মুরলীর পাশে সরে আসে। মুরলী বলে, কেন, কী করেছে ও?
–আমার গায়ে শজারু ছেড়ে দিয়েছে।
–আর তুমি ওরু খাঁটিয়ায় ব্যাঙ ছেড়ে দাওনি?
–চুপ রহো–ভুট্টারাম খইনি-খাওয়া দাঁতগুলোকে খিঁচিয়ে বলে : তু ভি পহেলা নম্বর কা বিচ্ছু!
–একদম জানসে মার দেগা।
–তো আও—
ভুট্টারাম নাক ফুলিয়ে গরগর করে ওঠে। একবার হাঁটু দুটো থাবড়ে তৈরি হয় কুস্তিগিরের মতো, তারপর বুনো মোষের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় ওদের দিকে।
