হারুবাবুর চকচকে টাকের প্রসঙ্গে বেশ উৎসাহিত হচ্ছিল পিলটু। প্রতিবাদ করে বলল–না পিসেমশাই, বাঘ নয়। সেই যে কৃপণ আর খিটখিটে হারুবাবু–
–পিলটু!
একটা খনখনে গলা বেজে উঠল কানের কাছেই। দুজনেরই চমক লাগল। পিসিমা এসে হাজির হয়েছেন।
পিসেমশাই গম্ভীর হয়ে গেলেন, পিলটু একবার ভয়ে ভয়ে পিসিমার দিকে তাকাল। পিসিমা মোটেই পিসেমশাইয়ের মতো নন। দারুণ রাশভারী, বেশ চড়া মেজাজ। পিলটুকে ভালোবাসেন না, তা নয়–খুব ভালোবাসেন। কিন্তু সময় মতো পড়তে না বসলে কিংবা একটু গণ্ডগোল করলেই–সঙ্গে সঙ্গে রামবকুনি!
পিসিমার মুখের দিকে তাকিয়েই পিলটুর বুঝতে বাকি রইল না, পিসিমার মেজাজ এখন ঠিক নেই। পিসিমা ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ লক্ষ করলেন তাকে।
–পিলটু, একবার বাড়ির ভিতরে যাও। তোমার পিসেমশাইয়ের সঙ্গে আমার কথা আছে।
পিলটু আর দেরি করল না। তক্ষুনি বন্দুকটা নিয়ে সুড়ুৎ করে বাড়ির ভিতরে হাওয়া হয়ে গেল।
কাঠগড়ার আসামীর দিকে জজসাহেব যেমন করে তাকিয়ে থাকেন, তেমনি করে পিসেমশাইয়ের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন পিসিমা। তারপর–
–তুমি ওকে এয়ার গান কিনে দিয়েছ কেন?
–ছেলেমানুষ বলে। নিজে তো আর কিনতে পারি না–লোকে পাগল বলবে।
পিসিমা কড়া গলায় বললেন–থামো। ঠাট্টা করতে হবে না। একে তো দুষ্টু ছেলে–তায় বন্দুক হাতে পেয়ে রাতদিন হইচই করে বেড়াচ্ছে। জোর করে কাছে এনে রেখেছ, যদি লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে না পারে, তা হলে রমেনের কাছে কৈফিয়ত দেবে শুনি?
রমেন পিলটুর বাবার নাম।
–ও ঠিক মানুষ হবে, তুমি ভেব না–আনন্দবাবু গড়গড়ায় টান দিলেন।
–ছাই হবে। পিসিমা ঠোঁট ওলটালেন–একেবারে বাঁদর হয়ে যাচ্ছে। ও-সব চলবে। আমি খগেনকে চিঠি লিখে দিয়েছি, সে কালই আসছে।
–খগেন পিসেমশাই চমকে সোজা উঠে বসলেন।
–হ্যাঁ, খগেন।–পিসিমার স্বর আরও কঠোর।
পিসেমশাই একবার খাবি খেলেন–খগেন কেন আসবে?
–সব ম্যানেজ করবার জন্যে। আমার মামাতো ভাইয়ের শালার বন্ধু বলেই বলছি না–ছেলেটি সব দিক থেকেই খাসা। বিলেত থেকে ফিরে এসেও কেমন ধার্মিক ব্রাহ্মণ—
–ধার্মিক হয়েছে তিন বার ব্যারিস্টারি ফেল করেছে বলে, আর বাপ লাঠি নিয়ে তাড়া করেছিল, সেই জন্যে।
পিসিমা ধমক দিয়ে বললেন–চুপ করো। আমি খগেনকে চিঠি লিখেছিলুম। কালই সে আসছে। আর শুধু যে আসছে তা-ই নয়। এখন থেকে এখানেই সে থাকবে।
এখানেই থাকবে। পিসেমশাই আবার খাবি খেলেন–খগেন থাকবে? সেই যে শেষরাতে উঠে বেসুরো কালীকীর্তন গায়, চারবার স্নান করে, গঙ্গাজল দিয়ে মুরগি খায় আর রাতদিন বলে ব্যায়াম করুন। সকালে ব্যায়াম, দুপুরে ব্যায়াম, বিকেলে ব্যায়াম, সন্ধেয় ব্যায়াম, মাঝরাত্তিরেও ব্যায়াম। একবার দিল্লিতে সাতদিন আমার বাসায় ছিল, ব্যায়ামের উপদেশে শক্ত ব্যারামে পড়বার জো হয়েছিল আমার!
–ভয় নেই, তোমাকে ব্যায়াম শেখাবে না। পিলটুর জন্যেই সে আসছে।
–বেচারা!
পিসিমা ভ্রূকুটি করে বললেন–তুমি তো ছেলেটার মাথা খাচ্ছ, দেখি খগেন এসে ওকে বাঁচাতে পারে কি না!
–বাঁচাবে? মেরে ফেলবে!
পিসিমা গর্জন করে বললেন হয়েছে, আর দরকার নেই। আমি যা বলছি তা-ই শোনো। খগেন আসবেই–কেউ তাকে ঠেকাতে পারবে না।
বলে, পিসিমা চলে গেলেন।
হা হতোস্মি! মানে–গেলুম! পিসেমশাই মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন সেখানেই।
.
দুই – দুবলাল সিংয়ের অ্যাডভেঞ্চার
খুবলাল সিং আনন্দবাবুর দারোয়ান।
ভালো মেজাজের লোক। খায়-দায়, লাঠি কাঁধে এদিক ওদিক চক্কর দেয়, ফাইফরমাস খাটে। ভালো মনিব, সুখের চাকরি। কিন্তু সম্প্রতি সে খুব মুস্কিলে পড়েছে।
মুস্কিল আর কিছু নয়–দেশ থেকে তার ভাইপো দুবলাল সিং এসে হাজির হয়েছে। নামের সঙ্গে আশ্চর্য মিল। খুবলাল বেশ লম্বাচওড়া জোয়ান, কিন্তু খাস হিন্দুস্থানী হয়েও দুবলাল একেবারে প্যাঁকাটির মতো রোগা। গুণের মধ্যে কেবল ঘুমুতে পারে আর ছারা–র্যা র্যা বলে হোলির ছড়া কাটতে পারে।
খুবলালকে দুবলাল চেপে ধরেছে। একটা চাকরি তাকে পাইয়ে দিতে হবে।
শুনে, গোঁফে চাড়া দিয়েছে খুবলাল।–চাকরি আছে, বেশ ভালো চাকরি। সম্প্রতি মাইল কয়েক দূরে একটা বড় ফলের বাগান কিনেছেন আনন্দবাবু। কলা, আমরুদ (পেয়ারা), পিচফল, আর আনারস সেখানে বিস্তর ফলে। কিন্তু বাঁদরেই খায় আর চুরিও যায়। সেই বাগান পাহারা দেবার জন্যেই লোক দরকার। আরামে থাকতে পারবে, পেট ভরে ফলও খেতে পারবে।
দুবলালের চোখ চকচকিয়ে উঠেছে।
–তা হলে ওটা আমারই চাই। পাইয়ে দাও চাচা।
–তোকে?–চোখ বাঁকা করে তাকিয়েছে খুবলাল।
–কেন? আমি পারব না?
–পারবি না কেন? খেতে তুই ভালোই পারবি। তোর মতো একটা ধেড়ে বাঁদর থাকতে ছোটখাটো বাঁদরেরা গাছের একটা ফলও ছুঁতে পারবে না সে আমার বেশ মালুম আছে। কিন্তু বাবু তোকে নেবে না।
–কেন নেবে না?–দুবলাল ব্যথা পেয়েছে মনে। বলেছে–তামাম হাজারিবাগ জিলায় আমার মতো হোলির ছড়া কে কাটতে পারে, শুনি?–এই বলে কানে হাত দিয়ে সুর ধরেছে—ছ্যা-রা-রা-রা। আরে, বৃন্দাবন কি বন্মে ডোলে-ডোলে বনোয়ারী—হাঁ—ছ্যা–রা–
–বাস্, খামোশ।–হাউমাউ করে উঠেছে খুবলাল–আর চেঁচালে বাবু এখুনি তোকে-আমাকে বাড়ির চৌহদ্দি থেকে বার করে দেবে। আরে, ওতে চিড়ে ভিজবে না। খুব একটা জোয়ান কি–মানে জব্বর কোনো পালোয়ানী দেখাতে পারলে তবেই। কিন্তু এই তো একটা মুসা ভি মারতে পারিস না। কে চাকরি দেবে তোকে?
