সেই টাকার বখরা নিয়ে গণ্ডগোল দেখা দিল। বিরিঞ্চি আর নিতাই যে শয়তান তা আমি জানতাম, কিন্তু কত বড় শয়তান তা আমার জানা ছিল না। বাইরে থেকে আরও একটা বদমায়েসকে সে জুটিয়ে আনল–সে অনাদি। এই অনাদি ও বিরিঞ্চিকে আপনি চেনেন। সেই দুজন–পুলিস-অফিসার সেজে আপনার স্টেশনে এসে জাঁকিয়ে বসেছিল, তারপর আপনাকে খুন করে মেল লুঠ করবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে পরের কথা–আগের ঘটনাই বলা যাক।
ওই তিনটে কাপুরুষ মিলে একটা পোড়ো বাড়িতে পেছন থেকে আমাকে ছোরা মারল। তারপর দরজায় শিকল টেনে দিয়ে পালিয়ে গেল। ওরা নিশ্চিত ভেবেছিল আমি মরে গেছি। আমার আঘাত সাঙ্ঘাতিক হয়েছিল–মরে যাওয়াই ছিল স্বাভাবিক। তবু আমি বাঁচলাম। ভাগ্যক্রমে একটু পরেই ওবাড়িতে আমার একটি বন্ধু এসে পড়ে, বহু সেবাযত্ন করে সে আমাকে বাঁচিয়ে তোলে।
আমি বেঁচে উঠলাম। কিন্তু প্রতিশোধের কথা ভুলতে পারলাম না। খুঁজতে লাগলাম রাক্ষস তিনটেকে। নিতাই সরকার সবচাইতে ধূর্ত, বিরিঞ্চি আর অনাদিকেও সে কলা দেখিয়েছিল। তাই নিতাইয়ের শত্রু দাঁড়াল তিনজন–আমারও তিনজন। আজ আমারই জিত হয়েছে, তিন শতুই নিপাত হয়েছে।
আমি নিতাইয়ের খোঁজে এলাম, সে রাত্রির কথা নিশ্চয় আপনার মনে আছে। তারপর অনাদি আর বিরিঞ্চি এল তাদের কার্যোদ্ধার করতে। আমি দেখলাম, আশ্চর্য যোগাযোগে তিন শতুই আমার মুঠোর মধ্যে এসে পড়েছে। ওরা ওয়েটিং রুমে এসে আস্তানা গাড়লো, ওদের কথাবার্তা শোনবার জন্যে আমাকে কৌশল করে গিরিধারীর পোশাকটা জোগাড় করতে হল। শুনলাম সব, বুঝলাম ওদের মতলব। সেইসঙ্গে এও ঠিক করলাম, হয় ওদের একদিন, নয় আমারই একদিন।
কোথায় থাকতাম আমি? সুন্দরপুর বাজারে–মুসলমান ফকির সেজে রাত্রে বেরোতাম অভিযানে। যেদিন বিরিঞ্চি আর অনাদি ডাক লুঠ করতে এবং আপনাকে খুন করতে চেষ্টা করে, সেদিন বাইরে থেকে গুলি করে আমিই ওদের চক্রান্ত ব্যর্থ করেছিলাম। গিরিধারীকে বাঁচাতে পারিনি, সে-দুঃখ আমার রয়ে গেল। কিন্তু গণেশবাবু, হয়তো আপনার মনে আছে, প্রথমদিন ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিলাম আপনাকে পুরস্কার দেব। সে-পুরস্কার দিয়েছি–আপনার প্রাণ বাঁচিয়েছি সেদিন। আমি খুনি বটে–আমাকে আপনি ঘৃণা করতে পারেন, কিন্তু আপনাকে যে দুটো পিশাচের হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছি, এ-গৌরব চিরদিন আমার থাকবে। দুটো পিশাচ। হ্যাঁ, পিশাচ বইকি। কিন্তু পিশাচ হিসেবে বিরিঞ্চির তুলনা হয় না। পাছে বখরা নেয় এই জন্যে আহত অনাদিকে নীলকুঠির জঙ্গলে সে খুন করল। তার মতো বিশ্বাসঘাতক পৃথিবীতে খুব বেশি জন্মেছে বলে মনে হয় না। তারপর ওই নীলকুঠিতেই নিতাই সরকারকে ভয় দেখিয়ে সে চেক লিখিয়ে নিল, নিষ্ঠুরভাবে তাকেও হত্যা করল। ভালোই হল, ষাঁড়ের শত্রু বাঘে মারল। নইলে ও-দুটোকে খুন করার অপরাধও আমাকেই বইতে হত।
তারপর আমার কাজ আমি করলাম। আমি শেষ করলাম বিরিঞ্চিকে। এজন্য অনুতাপ করি না। ও-পাষণ্ডকে ইংরেজের আইন কোনওদিন ছুঁতে পারত না, কাজেই আমাকেই ওর। বিচার করতে হল। অপরাধী হতে পারি, কিন্তু মনে আমার কোনও গ্লানি নেই। যে-পনেরো হাজার টাকার জন্যে এত রক্তপাত, সে-টাকা আমার হাতের মুঠোয়।
কিন্তু ও-পাপের ধনে আমার লোভ নেই। আমি বুঝেছি অন্যায়ের টাকা কত অন্যায়কে টেনে আনে, একটা পাপ কত পাপকে জমিয়ে তোলে। নিতাইয়ের বিশ্বাসঘাতকতায় আমার চোখ খুলে গেছে। ও-টাকা জনহিতকর প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমি বিলিয়ে দেব–বিলিয়ে দেব মন্বন্তরে মুমূয়ু বাংলাদেশের ক্ষুধিতদের ভেতরে।
কালো হাতের আজ থেকে মৃত্যু হল। শ্ৰীমন্ত রায় নতুন রূপে আজ বাঁচতে চেষ্টা করবে, বাঁচতে চেষ্টা করবে দেশের আর দশের সেবায়। জীবনে কোনওদিন আর আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে না; যদি হয়ও, আপনি আমাকে চিনতে পারবেন না।
আমি জানি এর পরে ওখানে পুলিশি তদন্তের ঢেউ এসে যাবে, বহু নিরীহ লোক অনর্থক হয়রান হবে। আপনি এই চিঠি তাদের দেখাবেন, বলবেন তিনটি মৃতদেহ পাওয়া যাবে নীলকুঠির জঙ্গলে, একটিকে পাওয়া যাবে পুরনো কুয়োটার মধ্যে। সেই-ই বিরিঞ্চিপাপচক্রের নেতা। আর জানবেন, আজ থেকে মানিকপুর সুন্দরপুরের সমস্ত রহস্যের ওপর শেষ যবনিকা পড়ে গেল। আপনাকে আবার ধন্যবাদ–আমার সশ্রদ্ধ নমস্কার। আশীবাদ করবেন, শ্ৰীমন্ত রায়ের হাত থেকে, মন থেকে যেন এই রক্তের দাগ মুছে যায়, যেন সহজ স্বাভাবিক মানুষ হয়ে মানুষের কল্যাণে সে বেঁচে থাকতে পারে। ইতি
শ্ৰীমন্ত রায়।
চিঠিখানা শেষ করে গণেশবাবু দুহাত তুলে নমস্কার করলেন।
অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ (উপন্যাস)
অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ (উপন্যাস) – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
এক – নিদারুণ দুঃসংবাদ
শ্রীমান পিলটু চক্রবর্তীর বয়েস বারো। সে মানুষ হচ্ছিল তার পিসেমশাই আনন্দবাবুর কাছে। রাঁচির নামকুমে।
পিলটু চক্রবর্তী আসলে কলকাতার লোক। কলকাতায় তা মা বাবা রয়েছেন এবং আরও দুটি ছোট ছোট ভাইবোন আছে। কিন্তু আজ চার বছর ধরে পিসেমশাই তাকে নিজের কাছে এনে রেখেছেন। আর কলকাতার ছোট্ট বাড়ি, ঘোট ঘোট পার্ক আর অনেক মানুষের ভিড় থেকে পিসেমশাই-এর কাছে এসে তার চমৎকার দিন কাটছে।
বাড়ির সঙ্গে অনেকখানি জুড়ে মস্ত বাগান। কত রকমের গাছ, কত যে ফুল, তার তো কোনও হিসেবই নেই। উত্তর দিকটায় কয়েকটা ঝাউ আর শিরীষ গাছ এমনি অন্ধকার করে। রেখেছে যে, বিকেলের ছায়া পড়লে পিলটু তো আগে সেদিকে যেতে সাহসই পেত না। কিন্তু এখন আর তার ভয় নেই।
