অনেকক্ষণ কোনও কথা বলতে পারলেন না ইয়াসিন দারোগা। সামনে গিরিধারীর দেহটা একটা পৈশাচিক বিভীষিকার মতো পড়ে রয়েছে। হঠাৎ চোখে পড়ল, দেওয়ালের কোণ ঘেঁষে ছোট গোলমতো কী একটা পড়ে আছে।
দারোগা লাফিয়ে উঠে ওটাকে তুলে আনলেন। একটা পিস্তলের খালি কার্তুজ। সেটাকে মন দিয়ে নাড়াচাড়া করে তিনি বললেন, হুঁ।
অর্থাৎ যেন মস্ত একটা সমস্যার সমাধান তিনি চোখের সামনে দেখতে পেয়েছেন। এর পরে চটপট আসামীদের ধরে ফেলতে তাঁর কোনও অসুবিধেই ঘটবে না।
খানিকটা ধাতস্থ হয়ে ইয়াসিন দারোগা একটা বিড়ি ধরালেন। আর যাই হোক, দিনের বেলা। চারিদিকে ঝকঝক করছে রোদ। স্টেশন ভরা লোক। একটা বিচিত্র ঘটনার গন্ধ পেয়ে আশপাশ থেকে কিছু কৌতূহলী লোকও এসে জড়ো হয়েছে। রাত্রির অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে তার অজানা ভয় আর আশ্চর্য বিভীষিকাটাও মিলিয়ে গিয়েছে। এখন কোনও আনাচকানাচ থেকে একটা বেখাপ্পা পিস্তলের গুলি এসে তাঁর টুপিটাকে উড়িয়ে দিতে পারবে না–এ-সম্পর্কে প্রায় নিশ্চিত আর নিশ্চিন্ত বোধ করলেন ইয়াসিন দারোগা।
অতএব এবার নিশ্চিন্ত-চিত্তে কর্তব্য পালনে মনোযোগী হওয়া যায়।
তাঁর মতো একটা ভারিক্কি দারোগার যেরকম পদমর্যাদা থাকা উচিত, সেইরকম চোখমুখের একটা ভয়ঙ্কর ভঙ্গি করে তিনি বিড়ির ধোঁয়া ছাড়লেন। জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর শহরে খবর দিয়েছেন নিশ্চয়?
একটা চেয়ারে বিহুলের মতো বসে ছিলেন গণেশবাবু। তাঁর কপালে একটি পটি বাঁধা, কেমন করে যেন কেটে রক্ত বেরিয়েছিল ওখান থেকে। অন্ধকার ঘরের ভেতর যেসব ধস্তাধস্তি ঘটেছিল–তার ফলেই ওটা হয়ে থাকবে বোধহয়।
গণেশবাবু সেই রাত থেকে দারুভূত মুরারির মতো ঠায় বসে আছেন। ভয়ে-আতঙ্কে আর ঘটনার অস্বাভাবিক আকস্মিকতায় তাঁর কথাই বন্ধ হয়ে গেছে তখন থেকে। ইয়াসিন দারোগার কথায় শুধু তাঁর ঠোঁটটা একবার নড়ে উঠল। তিনি কী একটা বলবার চেষ্টা করলেন, বলতে পারলেন না।
জবাব দিলে এ-এস-এম রহমান।
–হ্যাঁ স্যার, টেলিফোন করেছি।
–কোনও খবর এল?
–হ্যাঁ, খবর পাঠিয়েছে। বারোটার ট্রেনে লোক আসছে।
–যাক–বাঁচা গেল। ইয়াসিন দাবোগা দায়মুক্ত। তবু যতটা পারা যায় নিজের কর্মদক্ষতার পরিচয়টা এই ফাঁকে দিয়ে দেওয়া দরকার।
–তা বেশ। ওরা এলে ভালোই হবে। কিন্তু এ সামান্য ব্যাপার–আমিই এর কিনারা করতে পারতাম। কত খুন-জখম জল করে ফেলল এই ইয়াসিন দারোগাকত ফেরারীকে ধরে চালান করে দিলে, আর এ ভো–হুঁ!–
গলার স্বরে উচ্ছ্বসিত গর্ব আর গৌরব ফুটে বেরুল।
রহমান বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ–স্যার।
ইয়াসিন খুশি হয়ে গর্বভরে পা নাচাতে লাগলেন।
রহমান জিজ্ঞাসা করলে, ব্যাপারটা আপনার কী মনে হয় স্যার?
দারোগা অত্যন্ত বিচক্ষণের মতো একবার ডাইনে আর একবার বাঁয়ে হেলালেন ঘাড়টা। মুখের ওপর মুরুব্বিয়ানার একটা গুরু-গম্ভীর ছায়া পড়ল : আমার তো মনে হয় এ একেবারে জলের মতো পরিষ্কার কেস। আসামীকে আমি চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি ইচ্ছে। করলেই অ্যারেস্ট করতে পারি। কিন্তু শহরের কর্তাদের কেরামতিই এবারে দেখা যাক। তারপরে যা করবার আমি করব।
–আচ্ছা স্যার–একবার কেশে নিয়ে রহমান জিজ্ঞাসা করলে : দুজন লোক ডাকাতি করবার জন্যে এসেছিল এ তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু তাদের গুলি করে তাড়ালেই বা কে, আর অমন করে হাসলেই বা কেন? তা ছাড়া কালো হাতখানাই বা কার? আর তা ছাড়া ঘরের ভেতরে মড়ার মাথা গড়িয়ে দেওয়া
ইয়াসিন দাবোগা একেবারে দস্তুরমতো বিরক্ত হয়ে উঠলেন।
–আরে মশাই, আপনি তো আচ্ছা লোক? বলি, দারোগা কে? আপনি না আমি? রহমান সঙ্কোচে এতটুকু হয়ে গেল : আজ্ঞে আপনি।
–তবে?
উত্তরে কী বলা যায় রহমান ভেবে পেল না।
–দারোগা না হলে কি বোঝা যায় মশাই? রেল-কোম্পানির ঘন্টা বাজিয়ে আর মালগাড়ির হিসেব নিয়ে কি পুলিশের ব্যাপার বুঝতে পারা যায়? এর জন্যে আলাদা মগজ চাই–হুঁহুঁ! সরকার আমাদের মুখ দেখে বহাল করেনি, বুঝলেন? ভেতরে অনেক বস্তু আছে। বলেই একটা থানার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা করে দিয়েছে। মানেন কি না?
–আজ্ঞে মানি বইকি!
–তা হলে? তা হলে এত সহজেই বুঝতে চাইছেন কেন সব? ধৈর্য ধরে থাকুন, সময়ে সব জানতে পারবেন।
ঘরের সবাই একেবারে চুপ মেরে রইল।
দারোগা একখানা খাতা বার করলেন। বললেন, এনকোয়ারি-রিপোর্টটা তৈরি করে ফেলা যাক। খুন-জখম, পিস্তলের কাণ্ডগুরুতর ব্যাপার। আপনারা যে যা জানেন সব ঠিক করে বলবেন। যদি সত্যি কথা একবিন্দু গোপন করেন তা হলে সকলকে জেলে যেতে হবে-মনে থাকে যেন!
–আজ্ঞে মনে থাকবে বইকি।
মহা আড়ম্বরে দারোগা সাক্ষ্য নিতে বসলেন। এক ঘণ্টার মধ্যে তিনবার চা এল, দুটো ডাব এল। সেইসঙ্গে যেমন তর্জন, তেমনি গর্জন। ভাব দেখে মনে হল, হাতের কাছে আসামীকে না পেলে তিনি এঁদের ফাঁসিকাঠে নিয়ে লটকে দেবেন। গণেশবাবু একেই হতভম্ব হয়ে বসে ছিলেন, দারোগার ধমকধামকে তাঁর প্রায় হার্টফেল করবার উপক্রম হল।
রিপোর্ট লেখা হল।
চতুর্থ পেয়ালা চা আর তিন নম্বর ডাব নিঃশেষ করে ইয়াসিন দারোগা উঠতে যাবেন, এমন সময় ঘরে ঢুকল স্টেশনের ঝাড়দার রামগিদ্ধড়। দারোগাকে সেলাম দিয়ে বললে, হুজুর, আপকা চিঠি!
–আমার চিঠি? সবিস্ময়ে দারোগা বললেন, আমার চিঠি? কোত্থেকে এল?
