গজেশ্বর হাতির শুড়ের মতো প্রকাণ্ড একটা হাত বাড়িয়ে আমায় পাকড়াও করতে যাচ্ছিল—হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল : বাপ রে গেলুম-আরে বাপ রে গেছি–
ততক্ষণে আমিও দেখেছি, কালো কটকটে একটা কাঁকড়া বিছে, গজেশ্বরের পায়ের কাছে তখনও দাঁড়া উঁচু করে যমদূতের মত খাড়া হয়ে আছে।
—গেলুম—গেলুম—ওরে বাবা–জ্বলে গেলুম—
বলতে বলতে সেই ষাঁড়ের মত জোয়ানটা মেঝের ওপর কুমড়োর মতো গড়াতে লাগল : গেছি—গেছি—একদম মেরে ফেলেছে—
আর আমি? এমন সুযোগ আর কি পাব? তক্ষুনি লাফিয়ে উঠে পাহাড়ের খাঁজে পা লাগালুম—এইবার এসপার কি ওসপার।
১২. শেঠ ঢুণ্ডুরাম
শেঠ ঢুণ্ডুরাম
ওঠ জোয়ান-হেঁইয়ো! পাথরের খাঁজে খাঁজে পা দিয়ে দিয়ে যখন গর্তের মুখে উঠে পড়লুম, তখন আমার পালাজ্বরের পিলেটা পেটের মধ্যে কচ্ছপের মতো লাফাচ্ছে। অবশ্য কচ্ছপকে আমি কখনও লাফাতে দেখিনিসুড়সুড় করে শুড় বের করতে দেখেছি কেবল। কিন্তু কচ্ছপ যদি কখনও লাফায়—আনন্দে হাত-পা তুলে নাচতে থাকে তা হলে যেমন হয়, আমার পিলেটা তেমন করেই নাচতে লাগল। একেবারে পুরো পাঁচ মিনিট।
পিলের নাচ-টাচ থামলে কামরাঙা গাছটার ডাল ধরে আমি চারিদিকে তাকিয়ে দেখলুম। কোথাও কেউ নেই ক্যাবলা আর টেনিদা কোথায় গেছে কে জানে! ওধারে একটা আমড়া গাছে বসে একটা বানর আমাকে ভেংচি কাটছিল—আমিও দাঁত-টাত বের করে সেটাকে খুব খারাপ করে ভেংচে দিলুম। বানরটা রেগে গিয়ে বললে, কিচকিচ কিছু—বোধহয় বললে, তুমি একটা বিচ্ছু!—তারপর টুক করে পাতার আড়ালে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল।
পায়ের তলায় গর্তটার ভেতর থেকে গজেশ্বর গাড়ইয়ের গোঙানি শোনা যাচ্ছে। আমার বেশ লাগছিল। আমাকে বলে কিনা কাটলেট করে খাবে! যাচ্ছেতাই সব ইংরিজি শব্দের মানে করতে বলে আর জানতে চায় হনোলুলুর রাজধানীর নাম কী! বেশ হয়েছে। পাহাড়ি কাঁকড়া-বিছের কামড়—পুরো তিনটি দিন সমানে গান গাইতে হবে গজেশ্বরকে!
এইবার আমার চোখ পড়ল সেই কালান্তক গোবরটার দিকে। এখনও তার ভিতর দিয়ে পেছলানোর দাগ—ওই পাষণ্ড গোবরটাই তো আমায় পাতালে নিয়ে গিয়েছিল। ভারি রাগ হল, গোবরকে একটু শিক্ষা দেবার জন্যে ওটাকে আমি সজোরে পদাঘাত করলুম।
এহে-হে—এ কী হল। ভারি ছ্যাঁচড়া গোবর তো! একেবারে নাকে-মুখে ছিটকে এল যে! দুত্তোর!
কিন্তু এখানে আর থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। গজেশ্বরকে বিশ্বাস নেই—হঠাৎ যদি উঠে পড়ে গর্তের ভেতর থেকে! সরে পড়া যাক এখান থেকে! পত্রপাঠ!
যাই কোন্ দিকে! ঝর্ণিপাহাড়ি বাংলোর ঠিক পেছন দিকে এসে পড়েছি সেটা বুঝতে পারছি কিন্তু যাই কোন্ ধার দিয়ে! কীভাবে যে এসেছিলুম, ওই মোম আছাড়টা খাওয়ার পর মাথার ভেতর সে সমস্ত হালুয়ার মতো তালগোল পাকিয়ে গেছে। ডাইনে যাব, না বাঁয়ে? আমার আবার একটা বদ দোষ আছে। পটলডাঙার বাইরে এলেই আমি পুব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ কিছুই আর চিনতে পারিনে। একবার দেওঘরে গিয়ে আমার পিসতুতো ভাই ফুচুদাকে বলেছিলুম; দেখো ফুচুদা, কী আশ্চর্য ব্যাপার! উত্তরদিক থেকে কী চমত্তার সূর্য উঠছে!–শুনে ফুচুদা কটাং করে আমার লম্বা কানে একটা মোচড় দিয়ে বলেছিল, স্ট্রেট এখান থেকে রাঁচি চলে যা প্যালা—মানে, রাঁচির পাগলা গারদে!
কোন্ দিকে যাব ভাবতে ভাবতেই আমার চোখ একেবারে ছানাবড়া! কিংবা একেবারে চমচম! ওদিকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গুটিসুটি মেরে ও কারা আসছে? কাঠবেড়ালির ল্যাজের মতো ও কার দাড়ি উড়ছে হাওয়াতে?
স্বামী ঘুটঘুটানন্দ—নির্ঘাত। তাঁর পেছনে পেছনে আরও দুটো ষণ্ডা জোয়ান—তাদের হাতে দুটো মুখ বাঁধা সন্দেহজনক হাঁড়ি। নির্ঘাত যোগসর্পের হাড়ি-মানে, দই আর রসগোল্লা-ফোল্লা থাকা সম্ভব! একা একা নিশ্চয় খাবে না, খুব সম্ভব হাবুল সেনও ভাগ পাবে।
আমি পটলডাঙার প্যালারাম রসগোল্লার ব্যাপারে একটুখানি দুর্বলতা আমার আছে। কিন্তু সেই লোভে আবার আমি গজেশ্বর গাড়ইয়ের পাল্লায় পড়তে চাই না উহু কিছুতেই না। বেঁচে কেটে পড়ি এখান থেকে।
সুটু করে আমি বাঁ পাশের ঝোপে ঢুকে গেলুম। দৌড়নো যাবে না—পায়ের আওয়াজ শুনতে পাবে ওরা। ঝোপের মধ্যে আমি সুড়সুড়িয়ে চললুম।
চলেছি তো চলেইছি। কোন্ দিকে চলেছি জানি না। ঝোপঝাড় পেরিয়ে, নালাফালা টপকে, একটা শেয়ালের ঘাড়ের ওপর উলটে পড়তে পড়তে সামলে নিয়ে, চলেছি আর চলেইছি। আবার যদি দস্যু ঘচাং ফুর পাল্লায় পড়ি—তা হলেই গেছি! গজেশ্বর যেরকম চটে রয়েছে আমাকে আবার পেলে আর দেখতে হবে না। সোজা শুক্তোই বানিয়ে ফেলবে!
প্রায় ঘণ্টাখানেক এলোপাথাড়ি হাঁটবার পর দেখি, সামনে একটা ছোট্ট নদী। ঝুরঝুরে মিহি বালির ভেতর দিয়ে তিরতির করে তার নীলচে জল বয়ে চলেছে। চারদিকে ছোট বড় পাথর। আমার পা প্রায় ভেঙে আসবার জো—তেষ্টায় গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
পাথরের ওপর বসে একটুখানি জিরিয়ে নিলুম! আকাশটা মেঘলা—বেশ ছায়াছায়া জায়গাটা। শরীর যেন জুড়িয়ে গেল! চারদিকে পলাশের বন—নদীর ওপারে আবার দুটো নীলকণ্ঠ পাখি।
একটুখানি জলও খেলুম নদী থেকে। যেমন ঠাণ্ডা—তেমনি মিষ্টি জল। খেয়ে একেবারে মেজাজ শরিফ হয়ে গেল। দস্যু ঘচাং ফুঃ, গজেশ্বর, টেনিদা, ক্যাবলা, হাবুলসব ভুলে গেলুম। মনে এত ফুর্তি হল যে আমার চা-রা-রা-রা-রা–রামা হো–রামা হো–বলে গান গাইতে ইচ্ছে করল।
কেবল চা-রা-রা-রা-রা–বলে তান ধরেছি হঠাৎ পেছনে ভোঁপ-ভোঁপ-ভোঁপ!
