গোড়ার দিকে বেশ হুঁশিয়ার হয়েই হাঁটছিলুম—যাচ্ছিলুম ক্যাবলার পাশাপাশি। তারপর দেখি একটা বৈঁচি গাছ ইয়া-ইয়া বৈঁচি পেকে কালো হয়ে রয়েছে। একটা ছিড়ে মুখে দিয়ে দেখি—অমৃত! তারপরে আরও একটা—তারপরে আরও একটা
গোটা-পঞ্চাশেক খেয়ে খেয়াল হল, ওরা অনেকখানি এগিয়ে গেছে! তাড়াতাড়ি ওদের সঙ্গ ধরতে হবে—হঠাৎ দেখি আমার পাশেই ঝোপের মধ্যে—
লম্বা শাদা মতো কী ওটা? নির্ঘাত ল্যাজ! কাঠবেড়ালির ল্যাজ।
কাঠবেড়ালি বড় ভালো জিনিস। ভন্টার মামা কোথেকে একবার একটা এনেছিল, সেটা তার কাঁধের ওপর চড়ে বেড়াত, জামার পকেটে শুয়ে থাকত। ভারি পোষ মানে। সেই থেকে আমারও কাঠবেড়ালি ধরবার বড় শখ। ধরি না খপ করে ওর ল্যাজটা চেপে!
যেন ওদিকে তাকাচ্ছিই না—এমনিভাবে গুটিগুটি এগিয়ে টক করে কাঠবেড়ালির ল্যাজটা আমি ধরে ফেললুম। তারপরেই হেঁইয়ো টান!
কিন্তু কোথায় কাঠবেড়ালি! যেই টান দিয়েছি, অমনি হাঁই-মাই করে একটা বিকট দানবীয় চিৎকার। সে চিৎকারে আমার কানে তালা গেলে গেল। তারপরেই কোথা থেকে আমার গালে এক বিরাশি সিক্কার চড়। ভৌতিক চড়।
সেই চড় খেয়ে আমি শুধু সর্ষের ফুলই দেখলুম না। সর্ষে, কলাই, মটর, মুগ, পাট, আম, কাঁঠাল-সব-কিছুর ফুলই এক সঙ্গে দেখতে পেলুম। তারপরই
সেই ঝোপের ভেতরে সোজা চিত। একেবারে পতন ও মুছা। মরেই গেলুম কি না কে জানে!
০৯. কাঠবেড়ালির ল্যাজ নয় রে ওটা কাহার দাড়ি!
যখন জ্ঞান হল তখন দেখি, আমি ডাক বাংলোর খাটে লম্বা হয়ে আছি। ঝাঁটু মাথার সামনে দাঁড়িয়ে আমায় হাওয়া করছে, ক্যাবলা পায়ের কাছে বসে মিটমিটে চোখে তাকিয়ে আছে আর পাশে একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে টেনিদা ঘুঘুর মত বসে রয়েছে।
ঝাঁটুর হাতের পাখাটা খটাস করে আমার নাকে এসে লাগতেই আমি বললুম, উফ!
চেয়ার ছেড়ে টেনিদা তড়াক করে লাফিয়ে উঠল : যাক, তা হলে এখনও তুই মারা যাসনি!
ক্যাবলা বললে, মারা যাবে কেন? হোড়াসে বেহুশ হয়ে গিয়েছিল। আমি তো বলেইছিলুম টেনিদা, ওর নাকে একটুখানি লঙ্কা পুড়িয়ে ধোঁয়া দাও—এক্ষুনি চাঙা হয়ে উঠবে।
টেনিদা বললে, আর লঙ্কা-পোড়া! যেমনভাবে দাঁত ছরকুটে পড়েছিল, দেখে তো মনে হচ্ছিল, পটলডাঙা থেকে এখানে এসেই বুঝি শেষ পর্যন্ত পটল তুলল।
মাঝখান থেকে ঝাঁটু বিচ্ছিরি রকমের আওয়াজ করে হেসে বললে, দাদাবাবু ডর খিয়েছিলেন!
ক্যাবলা বললে, যাঃ-যাঃ, তোকে আর ওস্তাদি করতে হবে না! এখন শিগগির এক পেয়ালা গরম দুধ নিয়ে আয় দেখি!
ঝাঁটু পাখা রেখে বেরিয়ে গেল।
আমি তখনও চোখে ধোঁয়া-ধোঁয়া দেখছি। ডান চোয়ালে অসম্ভব ব্যথা। এমন চড় হাঁকড়েছে যে, গোটাদুয়েক দাঁত বোধহয় নড়িয়েই দিয়েছে একেবারে। চড়ের মতো চড় একখানা! অঙ্কের মাস্টারের বিরাশি সিক্কার চাঁটি পর্যন্ত এর কাছে একেবারে সুগন্ধি তিন-নং পরিমল নস্যি। আমি পটলডাঙার রোগা ডিগডিগে প্যালারাম, পালাজ্বরে ভুগি, আর পটোল দিয়ে শিঙিমাছের ঝোল খাই, এমন একখানা ভৌতিক চপেটাঘাতের পরেও আমার আত্মারাম কেন যে খাঁচাছাড়া হয়নি, সেইটেই আমি বুঝতে পারছিলুম না।
টেনিদা বললে, আচ্ছা পুঁটিমাছ, তুই হঠাৎ ডাক ছেড়ে অমন করে অজ্ঞান হয়ে গেলি কেন?
এ অবস্থাতেও পুঁটিমাছ শুনে আমার ভয়ানক রাগ হল, চোয়ালের ব্যথা-ট্যথা সব ভুলে গেলুম। ব্যাজার হয়ে বললুম, আমি পুঁটিমাছ আছি বেশ আছি, কিন্তু ওরকম একখানা বোম্বাই চড় খেলে তুমি ভেটকিমাছ হয়ে যেতে! কিংবা ট্যাপামাছ।
ক্যাবলা আশ্চর্য হয়ে বললে, চাঁটি আবার তোকে কে মারলে?
—ভূত!
টেনিদা বললে, ভূত! ভূতের আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই। খামকা তোকে চাঁটি মারতে গেল? তাও সকালবেলায়? পাগল না পেট-খারাপ?
ক্যাবলা বললে, পেট-খারাপ। এদিকে ওই তো রোগা ডিগডিগে চেহারা, ওদিকে পৌঁছে অবধি সমানে মুরগি আর আণ্ডা চালাচ্ছে। অত সইবে কেন? পেট-গরম হয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। ভূত-টুত সব বোগাস।
টেনিদা সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলে, ঠিক। আমিও ওই কথাই বলতে যাচ্ছিলুম।
ডান চোয়ালটা চেপে ধরে আমি এবার বিছানার ওপরে উঠে বসলুম।
—তোমরা বিশ্বাস করছ না?
টেনিদা বললে, একদম না। ভূতে আর চাঁটি মারবার লোক পেলে না!
ক্যাবলা মাথা নাড়ল; বটেই তো। আমাদের লিডার টেনিদার অ্যাঁয়সা একখানা জুতসই গাল থাকতে তোর গালেই কিনা চাঁটি হাঁকড়াবে? ওতে লিডারের অপমান হয়—তা জানিস?
শুনে টেনিদা কটমট করে ক্যাবলার দিকে তাকাল।
—ঠাট্টা করছিস?
ক্যাবলা তিড়িং করে হাত-পাঁচেক দূরে সরে গেল। জিভ কেটে বললে, কী সর্বনাশ! তোমাকে ঠাট্টা। শেষে যে গাঁট্টা খেয়ে আমার গালপাট্টা উড়ে যাবে। আমি বলছিলুম কি, ভূত এসে হ্যান্ডশেকই করুক আর বক্সিংই জুড়ে দিক, লেকিন ওটা দলপতির সঙ্গে হওয়াটাই দস্তুর।
টেনিদার কথাটা ভালো লাগল না। মুখটাকে হালুয়ার মতো করে বললে, যা-যাঃ, বেশি ক্যাঁচোর-ম্যাচোর করিসনি। কিন্তু তোকেও বলে দিচ্ছি প্যালা, এ বেলা থেকে তোর ডিম খাওয়া একেবারে বন্ধ! স্রেফ কাঁচকলা দিয়ে গাঁদালের ঝোল, আর রাত্তিরে সাবু বার্লি। আজকে মুচ্ছাে গিয়েছিলি, দু-চারদিন পরে একেবারেই যে মারা যাবি!
আমি রেগে বললুম, ধ্যাত্তোর তোমার সাবুবার্লির নিকুচি করেছে! বলছি সত্যিই ভূতে চাঁটি মেরেছে, কিছুতেই বিশ্বাস করবে না।
ক্যাবলা বললে, বটে? টেনিদা বললে, থাম, আর চালিয়াতি করতে হবে না।
