পুরুষেরা সকলেই গিয়াছে জগন ডাক্তারের ওখানে। হামদুর কারবার চলিতেছে মেয়েদের সঙ্গে। মেয়েরা কেহ মাসি, কেহ পিসি, কেহ দিদি, কেহ চাচি, কেহ বা ভাবী। হামদু একটা খাসি লইয়া এক বাউরি ভাবীর সঙ্গে দর করিতেছিল–ইহার গায়ে কি আছে, তুই বল ভাবী, সেরেফ খালটা আর হাড় কখানা। পাঁচ স্যার গোস্তও হবে না ইয়াতে। জোর স্যার তিনেক হবে। ইয়ার দাম পাঁচ সিকা বলেছি—কি অন্যায় বলেছি বল? পাঁচজনা তো রয়েছে বলুক পাঁচজনায়। আর এই অসময়ে লিবেই বা কে বল? গরজ এখন তুর, না, গরজ পরের, তু বুঝ কেনে!—বলিতে বলিতেই সে চিৎকার করিয়া ডাকিলও দুগ্গা দিদি, শুগো শু। তোর বাড়ি পাঁচবার গেলাম। শুন্–শুন্!
দুর্গা আগুনের সন্ধানেই পাড়ায় বাহির হইয়াছিল, সে দূর হইতেই বলিল—বেচব না আমি।
–আরে না বেচিস, শুন্—শু। তুকে বেচতে আমি বলি নাই।
–কি বলছ বল? দুৰ্গা আগাইয়া আসিয়া দাঁড়াইল।
–আরে বাপ রে দিদি যে একেবারে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে আলি গো!
–তাই বটে। ফিরে গিয়ে আমাকে ব্ৰাধতে হবে। কি বলছ বল?
–ভাল কথাই বলছি ভাই; বলছি ঘরে টিন দিবি? সন্ধানে আমার সস্তায় টিন আছে।
–টিন?
–হ্যাঁ গো! একেবারে লতুন। কলওয়ালারা বেচবে, কিনবি? একেবারে নিশ্চিন্তি! দেখৃ। গোটা চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা।
দুর্গা কয়েক মুহূর্ত ভাবিল। মনশ্চক্ষে দেখিল—তাহার ঘরের উপর টিনের আচ্ছাদন রোদের ছটায় রুপার পাতের মত ঝকমক করিতেছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই সে আত্মসংবরণ করিয়া বলিল—উঁহুঁ! না।
—তুর টাকা না থাকে আমাকে ইয়ার পরে দিস। ছমাস, এক বছর পরে দিস।
দুর্গা হাসিয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিল—উঁহুঁ! ও বলদের নামে তুমি হাত ধোও, হামদু ভাই। ও আমি এখন দুবছর বেচব না।—বলিয়া দেহের একটা দোলা দিয়া চলিয়া গেল।
আগুন লইয়া বাড়ি ফিরিয়া দুৰ্গা দেখিল—দড়িগাছটা সেইখানেই পড়িয়া আছে, মা সেটা স্পর্শ করে নাই। উনানে আগুন দিয়া এখন সে পাতুর সঙ্গে বসচায় নিযুক্ত। বড় বড় দুই বোঝা তালপাতা উঠানে ফেলিয়া পাতু হাঁপাইতেছে এবং মায়ের দিকে ক্রুদ্ধ বাঘের মত চাহিয়া আছে। পাতুর বউ কাঠকুটা কুড়াইয়া জড়ো করিতেছে, রান্না চড়াইবে।
দুর্গা বিনা ভূমিকায় বলিল,-বউ, রান্না আর করতে হবে না। আমিই রাধছি, একসঙ্গেই খাব সব।
পাতু দুর্গার দিকে চাহিয়া বলিল—দেখ দুগ্গা দেখ! মায়ের মুখ দেখ। যা মন চায় তাই বলছে! ভাল হবে না কিন্তুক।
—তা আমিই বা কি করব বল? এতক্ষণ তো আমার সঙ্গেই লেগেছিল। মা যে! গভ্যে ধরেছে মাথা কিনেছে! তাড়িয়ে দিতেও নাই, খুন করতেও নাই। মারধর করলেও পাপ।
–একশো বার। তোর কথার কাটান নাই, কিন্তু ই গাঁয়ে থাকব কি সুখে তুই বল দেখি?
–সত্যিই তু উঠে যাবি নাকি? হ্যাঁ দাদা? ভিটে ছেড়ে উঠে যাবি?
পাতু কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। তারপর বলিল—তাতেই তো আবার এই অবেলাতে তালপাতা কেটে আনলাম দুৰ্গা! নইলে—জংশনে কলে কাম-কাজ, থাকবার ঘর সব ঠিক করে এসেছিলাম দুপুরবেলাতে।
দুহাত ছাঁদাছাঁদি করিয়া তাহারই মধ্যে মাথা গুঁজিয়া পাতু মাটির দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল।
দুর্গা বলিল, ওঠ। ওই দে কখানা লম্বা বাঁশ রয়েছে আমার, ওই কখানা চাপিয়ে তালপাতা দিয়ে ঘরখানা ঢাক। পিতি-পুরুষের ভিটে ছেড়ে কেউ কখনও যায় নাকি? তুই চালে উঠ, আমি আর বউ দুজনাতে তুলে দিচ্ছি সব।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া পাতু উঠিল। দুর্গা কাপড়ের আঁচল কোমরে অ্যাঁটসট করিয়া বাঁধিয়া বলিল, ওই গাদা সতীশ। সতীশ বাউরি রে! মিনসে জগন ডাক্তারকে বলছে—পাতু বায়েন বড়নোক, ব্যালেস্টার, উকিল। তা আমি বললাম,আহা, তোমার মুখে ফুলচন্নন পড়ুক! বলে বড়নোক, গা ছেড়ে উঠে চলে যাবে। ওরা যায় তো, তোদিগে ভিটে দানপত্তর নিখে দিয়ে যাবে। তোরা ভোগ করবি!
বিড়ালীর মত হৃষ্টপুষ্ট পাতুর বউটা খুব খাঁটিতে পারে, খাটো পায়ে দ্রুতগতিতে লাটিমের মত পাক দিয়া ফেরে। সে ইহারই মধ্যে বাঁশগুলাকে টানিয়া আনিয়া উঠানে ফেলিয়াছে।
০৯. গোটা পাড়াটা পোড়াইয়া
গোটা পাড়াটা পোড়াইয়া দিবার অভিপ্রায় শ্রীহরির ছিল না। কিন্তু যখন পুড়িয়া গেলই, তখন তাহাতেও বিশেষ আফসোস তাহার হইল না। পুড়িয়াছে বেশ হইয়াছে, মধ্যে মধ্যে এমন ধারায় বিপর্যয় ঘটিলে তবে ছোটলোকের দল সায়েস্তা থাকে, ক্রমশ বেটাদের আস্পর্ধা বাড়িয়া চলিতেছিল। তাহার উপর দেবু ঘোষ ও জগন ডাক্তারের উস্কানিতে তাহারা লাই পাইতেছিল। হাতের মারে কিছু হয় না, ভাতের মার—অর্থাৎ ভাতে বঞ্চিত করিতে পারিলেই মানুষ জব্দ হয়। বাঘ যে বাঘ তাহাকে খাঁচায় পুরিয়া অনাহারে রাখিয়া মানুষ তাহাকে পোষ মানায়।
এ সব বিষয়ে তাহার গুরু ছিল দুর্গাপুরের স্বনামধন্য ত্রিপুরা সিং। দুর্গাপুর এখান হইতে ক্রোশ দশেক দূর। শ্ৰীহরির মাতামহের বাড়ি ওই দুর্গাপুরে। তাহার মাতামহ ত্রিপুরা সিংয়ের চাষবাসের তদ্বিরকারক ছিল। বাল্যকালে শ্রীহরি মাতামহের ওখানে যখন যাইত, তখন সে ত্রিপুরা সিংকে দেখিয়াছে। লম্বা চওড়া দশাশয়ী চেহারা। জাতিতে রাজপুত। প্রথম বয়সে ত্রিপুরা সিং সামান্য ব্যক্তি ছিল। সম্পত্তি ছিল, মাত্র কয়েক বিঘা জমি। সেই জমিতে সে পরিশ্রম করিত অসুরের মত। আর স্থানীয় জমিদারের বাড়িতে লক্ষ্মীর কাজ করিত। আরও করিত তামাকের ব্যবসা। হাতে লাঠি ও মাথায় তামাকের বোঝা লইয়া গ্রাম-গ্রামান্তরে ফেরি করিয়া বেড়াইত, ক্ৰমে শুরু করে মহাজনী। সেই মহাজনী হইতে প্রথমত বিশিষ্ট জোতদার, অবশেষে তাহার মনিব জমিদারের জমিদারির খানিকটা কিনিয়া ছোটখাটো জমিদার পর্যন্ত হইয়াছিল। ত্রিপুরা সিংয়ের দাড়ি ছিল, বড় শখের দাড়ি, সেই দাড়িতে গালপাট্টা বাঁধিয়া গোঁফে পাক দিতে দিতে সে বলিত, শ্ৰীহরি নিজের কানে শুনিয়াছে—সে ছেলেবেলায়—এহি গাও হমি তিন-তিনবার। পুড়াইয়েসি, তব না ই বেটালোক হমাকে আমল দিল!
