“সে বিনে প্রাণে বাঁচিনে—ভুবনে ভুবনে রহি কেমনে?
আমি যাব সেই পথে, যে পথ লাগে ভাল নয়নে ৷”
ললিতা ঠোঁটে পিচ কাটিয়া বলিল—বল কি বোনাই, অঙ্গে তবে তোমার ছাই কই?
নির্মলা কিন্তু আসিয়া সস্নেহে তাহাকে সম্ভাষণ করিয়া বলিল—ব’স দাদা, আমি চা ক’রে দি।
বাজনদারটি আসিয়া মুদুস্বরে বলিল—কাল ছিলে কোথা বল তো? কার বাড়ীতে? সে কেমন হে? অর্থাৎ তাহার ধারণা নিতাই কাল রাত্রে বসন্তকে ভুলিবার জন্য শহরের কোন দেহব্যবসায়িনীর ঘরে গিয়া আশ্রয় লইয়াছিল।
বেহালদার ধমক দিল—থাম হে, থাম তুমি। যেমন তুমি নিজে, তেমনি দেখ সবাইকে। ব’স ওস্তাদ, ব’স। নিতাই হাসিয়া বসিল।
প্রৌঢ়া এতক্ষণ কাজে ব্যস্ত ছিল। একজন পুরনো কাপড়ের ব্যবসায়ীর সঙ্গে বসন্তর কাপড়গুলি বেচিবার বন্দোবস্ত করিতেছিল। দাম-দস্তুর শেষ করিয়া সে বাহিরে আসিল। নিতাইকে বলিল—ওগো বাবা, এই বেলাতেই উঠছি। গুছিয়ে তোমার জিনিসপত্তর বেঁধেছেঁদে নাও।
নির্মলা একটি বাটিতে তেলমাখা মুড়ি নামাইয়া দিয়া বলিল—চায়ের জল ফুটছে, ততক্ষণে মুড়ি কটি থেয়ে নাও। কাল তো সারারাত খাও নাই।
তাহার মুখের দিকে চাহিয়া নিতাই বলিল—বোন নইলে ভায়ের দুঃখ কেউ বোঝে না।
—আর মাসী বেটীর কথা বুঝি ভুলেই গেলে বাবা? প্রৌঢ়া আসিয়া একটি মদের বোতল, গোটা দুয়েক গত রাত্রের সিদ্ধ ডিম, খানিকটা মাংস আনিয়া নামাইয়া দিল —কাল রাত থেকে আনিয়ে রেখেছি। খাও, শরীলের জুৎ হবে।
নিতাই তাহার মুখের দিকে চাহিয়া মৃদু হাসিয়া বলিল—মা-মাসীকে কি কেউ ভোলে, না ভোলা যায়? চিরদিন তোমার কথা মনে থাকবে মাসী।
প্রৌঢ়া হাসিয়া বলিল—তুমি খাও, আমি আসছি। প্রৌঢ়া চলিয়া যাইতেই ঢুলীটা আরও কাছে আসিয়া বসিল। নিতাই হাসিয়া বলিল— নাও, নাও, ঢেলে লাও, আরম্ভ কর।
কৃতাৰ্থ হইয়া মদ ঢালিতে ঢালিতে চুপি চুপি বলিল—বসনের কাপড়চোপড় বিক্রী হয়ে গেল।
নিতাই কোন উত্তর দিল না।
অভিযোগ করিয়া ঢুলীটা আবার বলিল—গয়না দু-এক পদ রেতে খুলে লাও নি কেনে, বল দেখি? এমুনি মুখ্যুমি করে, ছি!
নিতাই বোতল দেখাইয়া বেহালাদার ও দোহারকে বলিল—এস, লাও, তাহারাও এবার অপরিমেয় সহানুভূতির সঙ্গে কাছে আসিয়া ঘেষিয়া বলিল। কিছুক্ষণ পরেই বেহালাদার সচকিত হইয়া বলিল—ওই! বোতল শেষ হয়ে গেল! তুমি? তুমি তো কই—
নিতাই হাসিয়া বলিল—ত হোক, দরকার নাই।
—তুমি খাবে না?
—নাঃ।
সকলে অবাক হইয়া গেল।
নিতাই বলিল বেহালাদারকে—তোমার কাছে একটি জিনিস শিখবার সাধ ছিল। রাত্রে বেহালায় তুমি যে স্বরটি বাজাও ওই স্বরটি বেহালায় তুলতে শিখবো। গলায় পারি, বেহালায় শিখব।
বেহালাদার বলিল—নিশ্চয়। তোমাকে শেখাব না ওস্তাদ? দেখ দেখি! তিন দিনে শিখিয়ে দোব।
–নিতাই হাসিয়া বলিল—তিন দিন আর পাব কোথায় তোমাকে?
—কেনে? সবিস্ময়ে প্রশ্নটা করিল দোহার। বেহালাদার স্থির দৃষ্টিতে নিতাইয়ের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। সে আঁচ করিয়াছে।
নিতাই হাসিয়া বলিল—আজই আমি চলব।
—সে তো আমরাও। তুমি—
দোহারের মুখের উপর হাত দিয়া বেহালাদার বলিল—থাম তুমি থাম।
নিতাই কিন্তু দোহারের কথা ধরিয়াই জবাব দিল—হ্যাঁ যাব সবাই, তোমরা এক পথে, আমি আর এক পথে।
বেহালদার তাহার হাতখানি চাপিয়া ধরিল, শুধু বলিল–ওস্তাদ!
নিতাই একটু চুপ করিয়া রহিল, কথার উত্তর দিল না। একটু চুপ করিয়া থাকিয় বেশ গল ছাড়িয়া গান ধরিয়া দিল;—মনে নুতন পদ আসিয়াছে।
“বসন্ত চলিয়া গেল হায়,
কালো কোকিল আজি কেমনে গান গায়
বল—কেমনে থাকে হেথায়!”
হঠাৎ বেহালাদার বেহালাটা টানিয়া লইয়া বলিল—শোন ওস্তাদ, শোনা, সেই সুর তোমাকে শোনাই, শোন। এসেছে।
সে ছড়ি টানিল—লম্বা টানা সুর। সেই সুর!
ইহারই মধ্যে আসিয়া হাজির হইল মাসী।
—বাবা। নিতাই হাত তুলিয়া ইসারায় জানাইল—এখন নয় একটু পরে। কিন্তু বেহালাদার খামিয়া গেল। সে মাসীর মুখ দেখিয়া থামিয়া গিয়াছে।
মাসী বলিল–কি শুনছি বাবা?
—কি মাসী?
—তুমি—? তুমি চলে যাবে? আমাদের সঙ্গে যাবে না?
—না মাসী। খেলার একপালা শেষ হল। এবার নতুন পালা।
—অন্য দলে—?
—না মাসী। এবার পথের পালা। এবার পথে পথে। প্রৌঢ়া অনেক বুঝাইল। অনেক প্রলোভন দেখাইল। বসন্তর গহনা কাপড়-চোপড়ের দামের অংশ পর্যন্ত দিতে চাহিল। আরও বলিল—বসনের চেয়ে ভাল নোক আমি দলে আনছি বাবা। আমি কথা দিচ্ছি, তোমার কাছেই সে থাকবে।
নিতাই বলিল—না মাসী, আর নয়।
নির্মলা কাঁদিল।
নিতাইও একবার চোখ মুছিয়া বলিল—না ভাই, তুমি কেঁদে না, তুমি কাঁদলে আমি বেথা পাব।
বেহালাদার বলিল—তুমি বিবাগী হবে ওস্তাদ?
নিতাই ও প্রশ্নের জবাবে তাহার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। তাই তো। বসন্তের সঙ্গে যে গাটছড়া ও গিঁট সে বাঁধিয়াছিল, সে গিঁট খুলিয়া গিয়াছে। বসন্ত আজ তাহাকে মুক্তি দিয়াছে। এবার একটা নতুন ডাক যেন সে শুনিয়াছে। পথে পথে চলো মুসাকের। বেহালাদারের প্রশ্নে তাহার মনে অকস্মাৎ সুরটি বাজিয়া উঠিল।—বিবাগী?
বৈরাগ্যই তাহার ভাল লাগিল।
কবি – ২১ (শেষ)
ঝুমুরের দল ধরিল দেশের পথ।
নিতাই কোন পথে কোথায় যাইবে তাহা ঠিক করে নাই, তবে ওই দলটির সঙ্গে থাকিবে না তাহা ঠিক, সেই কারণে দলের বন্ধন কাটাইবার অন্য একটা পথ ধরিল। কাটোয়া হইতে ছোট লাইন ধরিয়া ইহারা চলিল মল্লারপুরের দিকে। নিতাই বড় লাইন ধরিয়া উত্তর মুখে চলিল। শেষ মুহূর্তে ঠিক করিয়া ফেলিল সে কাশী যাইবে।
নির্মলা অনেকখানি কাঁদিল। মেয়েটা তাহকে দাদা বলিত। দাদা বলিয়া নিতাইয়ের জন্য কাঁদিতে তাহার সঙ্কোচের কোন কারণ ছিল না।
শেষ মুহূর্তে ললিতাও কাঁদিল। বলিল—জামাই, সত্যিই ছাড়লে!
প্রৌঢ়া বর্তমানের আশা ছাড়িয়াও কিন্তু ভবিষ্যতের আশা ছাড়ে নাই। সে বলিল—চিরকাল তো মামুষের মন বিবাগী হয়ে থাকে না বাবা। মন একদিন ফিরবে, আবার চোখে রঙ ধরবে। ফিরেও আসবে। তখন যেন মাসীকে ভুলো না। আমার দলেই এসো।
বেহালাদার স্নান হাসি হাসিয়া বলিল—আচ্ছা।
মহিষের মত লোকটাও কথা বলিল—চললে? তা— খানিকটা চুপ করিয়া থাকিয়া আবার বলিল—সন্নাসী হওয়ার কষ্ট অনেক হে। ভিখ্ করে পেট ভরে না—তা নইলে—বেশ, এস তা হ’লে।
তাহারা যাইবে ছোট লাইনের ট্রেনে—যে লাইনের উপর নিতাইয়ের নিজের বাড়ী। ওই লাইনের ট্রেনেই নিতাই আসিয়াছিল—গ্রাম ছাড়িয়া। সেই ছোট গাড়ীতেই চড়িয়া মাসী বলিল—এস বাবা, এই গাড়ীতেই চড়। এই নাইনেই তো বাড়ী ৷ মন খারাপ হয়েছে—বাড়ী ফিরে চল বাবা।
বাড়ী! নিতাই চমকিয়া উঠিল। বাড়ী! স্টেশন! সেই কৃষ্ণচূড়ার গাছ! সেই রেল লাইনের বাঁক! সেই স্বর্ণশীর্ষবিন্দু কাশফুল! সোনার বরণ ঝকঝকে ঘটি মাথায় ক্ষার-ধোওয়া মোট খাটো কাপড় পরা অতি কোমল কালো মেয়েটি! সেই তাহার ঠাকুরঝি। ঠাকুরঝি।
সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়িয়া গেল সেই কতকালের পুরানো গান—
“কালো যদি মন তবে কেশ পাকিলে কঁদি কেনে?
কালো চুলে রাঙা কুসুম হেরেছ কি নয়নে?”
নিতাইয়ের মুখে হাসির রেখা দেখা দিল। অদ্ভুত হাসি। কত কথা মনে পড়িতেছে, কত কথা—কত পুরানো গান!
তবুও নিতাই বার বার ঘাড় নাড়িয়া নীরবেই জানাইল—না। না। না। না।
তাহার মনের মধ্যে সেই গানের কলি গুঞ্জন করিতেছিল—“চাঁদ তুমি আকাশে থাক।” মনে ঘুরিতেছিল—“তাই চলেছি দেশান্তরে—”—সে আবার একবার ঘাড় নাড়িয়া জানাইল— না। ঠাকুরঝি এতদিনে ভাল হইয়াছে, ঘরসংসার করিতেছে। সে গিয়া আর নূতন অশান্তির সৃষ্টি করিবে না। না। না সে যাইবে না। সে যাইবে না।
নিতাই নীরবেই বিদায় লইল। এই বিদায় তাহার শোকাচ্ছন্ন মনকে আরও উদাস করিয়া তুলিল। দলের প্রত্যেক জনটির মুখ তাহার চোখের সম্মুখে ক্ষণে ক্ষণে জাগিয়া উঠিতেছিল— বিদায়-ব্যথা-কাতর ম্লান মুখ। কাহারও সহিত কোনদিন তাহার ঝগড়া হয় নাই কিন্তু তাহারা যে এত ভাল—এ কথা আজিকার দিনের এই মুহূর্তটির আগে কোনদিন কোন একটিবারের জন্যও মনে হয় নাই। বরং সে সময় তাহদের দোষগুলাই অনেক বড় হইয়া তাহার চোথে পড়িয়াছে। মাসীকে দেখিয়া মনে হইত মুখে মিষ্টি কথা বলিলেও সমস্ত অন্তরটা বিষে ভরা, মিথ্যা ছাড়া সত্য বলিতে জানে না। পৃথিবীতে খাদ্য এবং অর্থ ছাড়া আর কিছুকে ভালবাসে না মাসী। আজ মনে হইল—না, না, মাসী—মাসীরই মত, ময়েরই মত ভালবাসিত তাহাকে। তাহার চোখের ওই কয় ফোঁটা জল বসন্তের মরণকালের ভগবানের নামের মতই সত্য।
নির্মলা চিরদিন ভাল। মায়ের পেটের বোনের মতই ভাল।
ললিতার চোখা চোখা ঠাট্টাগুলি—শ্যালিকার মুখের ঠাট্টার মতই মিষ্ট ছিল।
বেহালাদারের কথা মনে করিয়া তাহার চোখে জল আসিল। কানের কাছে বাজিয়া উঠিল সেই সুর।
সেই সুরটাই ভাঁজিতে ভাঁজিতে সে ফিরিয়া বসিল গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গায় স্নান করিয়া সে মনে মনে একখানি গঙ্গা স্তব রচনা করিবার চেষ্টা করিল ৷ হইল না। ঘাটের উপরেই একটা গাছের তলায় আসিয়া সে বসিল। কিন্তু কোথায় সে যাইবে? পথে পথে ভিক্ষা করিয়া ফিরিবে বাউল দরবেশের মত? না। এ কল্পনা তাহার ভাল লাগিল না। তবে? কি বা করিবে— কোথায়ই বা যাইবে? হঠাৎ তাহার মনে হইল—হায় হায় হায়, হায় রে পোড়া মন! এই কথা কি ভাবিতে হয়? ঠাকুর, ঠাকুরের কাছেই যাইবে সে! গোবিন্দ। বিশ্বনাথ! প্রভু, প্রভুর কাছে যাইবে সে! মায়ের কাছে যাইবে! মা অন্নপূর্ণা। রাধারাণী রাধারাণী রাধারাণী! সে সেই সব দেবতার দরবারে বসিয়া গান গাহিবে—মহিমা কীর্তন করিবে—ভগবানকে গান শুনাইবে—শ্লোতারা শুনিয়া চোখের জল ফেলিবে—সঙ্গে সঙ্গে তাহাকেও কিছু কিছু দিয়া যাইবে—তাহাতেই তাহার দিন গুজরান হইবে। তাহার ভাবনা কি? হায় রে পোড়া মন—এতক্ষণ তুমি এই কথাটাই ভাবিয়া পাইতেছিলে না? এখান হইতে কাশী, বাবা বিশ্বনাথ—মা অন্নপূর্ণা। কাশী হইতে অযোধ্যা, সীতারাম–সীতারাম! সীতারামের রাজ্য হইতে রাধাগোবিন্দ, রাধরাণী—রাধারাণীর রাজ্য বৃন্দাবন।
তারপর মথুরা—না, না, মথুরা সে যাইবে না। রাধারাণীকে কাঁদাইয়া রাজ্যলোভী শ্যাম রাজা হইয়াছে সেখানে, সে রাজ্যে নিতাই যাইবে না। মধুরা হইতে বরং কুরুক্ষেত্র–হরিদ্বার।
হরিদ্বারের পরেই হিমালয়—পাহাড় আর পাহাড়। ছেলেবেলায় পড়া ভূগোল মনে পড়িল— পৃথিবীর মধ্যে এত উচু পাহাড় আর নাই—হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ গৌরীশঙ্কর। হিমালয়ের মধ্যেই মানস-সরোবর। সেখান পর্যন্তও নাকি মানুষ যায়। নিতাই মানস-সরোবরে স্নান করিবে। তারপর জনশূন্য হিমালয়ের কোখাও একটা আশ্রয় বানাইয়া সেইখানেই থাকিয়া যাইবে। নিত্য নূতন গান রচনা করিবে—গাহিবে, পাহাড়ের গায়ে খুদিয়া খুদিয়া লিথিয় রাখিবে। সে মরিয়া যাইবে—তাহার পর যাহার সে-পথ দিয়া যাইবে তাহারা সে গান পড়িবে আর মনে মনে নিতাই-কবিকে নমস্কার করিবে।
শেষ বৈশাখের দ্বিপ্রহর। আগুনের মত তপ্ত ঝড়োহাওয়া গঙ্গার বালি উড়াইয়া হু হু করিয়া বহিয়া চলিয়াছে। দুই পায়ের শস্যহীন চরভূমি ধূসরবর্ণ-যেন ধুধু করিতেছে। মানুষ নাই, জন নাই; কেবল দুই-চারিটি চিল আকাশে উড়িতেছে—তাহারাও যেন কোথায় কোন দূরদুরন্তরে চলিয়াছে। সব শূন্য—সব উদাস—সব স্তব্ধ—একটা অসীম বৈরাগ্য যেন সমস্ত পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছে। নিতাই সেই অগ্নিগৰ্ভ রৌদ্রের মধ্যেই বাহির হইয়া পড়িল। “চলো মুসাফের বাঁধো গাঁঠোরী—বহুদূর যানা হোগা।” কাশী! সে স্টেশনে ফিরিয়া বড় লাইনে কাশীর টিকিট কাটিয়া ট্রেনে চড়িল।
নিতাই আসিয়া উঠিল কাশীতে।
ব্রিজের উপর ট্রেনের জানাল দিয়া কাশীর দিকে চাহিয়াই সে মুগ্ধ হইয়া গেল। বাঁকা চাঁদের ফালির মত গঙ্গার সাদা জল ঝক্ঝক্ করিতেছে—সমস্ত কোল জুড়িয়া মন্দির, মন্দির আর ঘাট, আরও কত বড় বড় বাড়ী। নিতাইয়ের মনে হইল মা-গঙ্গা যেন চোখঝলসানো পাকা বাড়ীর কণ্ঠি গাঁথিয়া গলায় পরিয়াছেন। ট্রেনের যাত্রীরা কলরব তুলিতেছে—জয় বাবা বিশ্বনাথ —অন্নপূর্ণামায়ী কি জয়!
সেও তাহদের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে নিজের কণ্ঠস্বর মিশাইয়া দিল। জয়ধ্বনির স্বরের সঙ্গে সুর মিশাইয়া দিল। জয় বাবা বিশ্বনাথ! অন্নপূর্ণামায়ী কি জয়!
স্টেশনে নামিয়া কিন্তু অকস্মাৎ একসময় তাহার মনের ছন্দ কাটিয়া গেল। সে যেন হুঁচোট খাইয়া দাঁড়াইয়া গেল। সে বিব্রত এবং বিহ্বল হয়ে অনুভব করিল সে কোন বিদেশে আসিয়া পড়িয়াছে!
বাংলা দেশের শেষ হইতেই সে একটা অস্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করিতেছিল। ট্রেনে ক্রমশই ভিন্নভাষাভাষী ভিন্ন বেশভূষায় ভূষিত লোকের ভিড় বাড়িতেছিল। কাশীতে নামিয়াই সে ভিন্ন ধরণের মামুষের মেলার মধ্যে মিশিয়া গিয়া এক সময় প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করিল যে, এখানকার মানুষের জীবনের ছন্দের সঙ্গে তাহার জীবনের ছন্দ কোনখানে মিলিতেছে না। তাহার উপর কাশী-কাশী-কাশী—তাহার কল্পনার কাশী কোথায়? সে তো এই দোকানদানিভরা বিকিকিনির কোলাহলে মুখর এই নগরীটি নয়! কোথায় সেই বিশ্বনাথের কাশী?
বিহ্বলের মতই সে দাঁড়াইয়া রহিল।
বিহ্বলের মত চারিদিকে চাহিতে চাহিতে এক পথ হইতে অন্য পথে চলিতেছিল। কতক্ষণ চলিয়াছিল তাহার ঠিক ছিল না। অবশেষে একখানা এক্কায় উঠিয়া সে এক্কাওয়ালাকে কোনমতে বুঝাইল যে সে বিশ্বনাথের মন্দিরে যাইবে। এক্কাওয়ালাই তাহাকে একটা চৌরাস্তায় নামাইয়া দিয়া বলিল—এই দিকে যাও! সেই পথে কয়েক পা অগ্রসর হইয়া অকস্মাৎ তাহার মুখ চোখ আনন্দে প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল। পূজার থালা হাতে ধপধপে সাদা খান পরিয়া একটি মহিলা যাইতেছিলেন। সে আনন্দে অধীর হইয় তাহার দিকে আগাইয়া গেল। তাহার মনে হইল—এ যে তাহাদের গ্রামের সেই রাঙা মা-ঠাকুরুণ। হ্যাঁ-তিনিই তো! তেমনি ঝলমলে সন্ত্রম-ভরা ভঙ্গিতে কাপড় পরিয়াছেন, মাথায় তেমনি আধ-ঘোমটা, মাথার চুলগুলি তেমনি ছোট করিয়া ছাঁটা—অবিকল তিনি। হারাইয়া-যাওয়া ছেলে যেন মাকে খুঁজিয়া পাইয়াছে এমনিভাবেই নিতাই আশ্বস্ত এবং উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। ছুটিয়া আসিয়া সে তাঁহার আগে গিয়া জোড়হাত করিয়া দাঁড়াইল।
না, রাঙা মা-ঠাক্রুণ নন, তবে ঠিক রাঙামায়ের মতই। ইনি যে তাহদের দেশের অন্য কোন গ্রামের আর কোন রাঙামা—তাহাতে নিতাইয়ের আর সন্দেহ রহিল না। এবং সত্যসত্যই সে হিসাবে তাহার ভুল হইল না –তিনি বাঙালী বিধবা এবং যাঁহারা গ্রামে মা-ঠাক্রুণ হইয়া দাঁড়ান তাহদেরই একজন বটেন। পতিপুত্রহীন বাঙালী বিধবা কাশীতে বিশ্বনাথকে আশ্রয় করিয়া মণিকর্ণিকার ঘাটের দিকে তাকাইয়া আছেন। জীবনের বোঝা নামাইবেন সেইখানে। মন্দিরে পূজা সারিয়া তিনি বাড়ী ফিরিতেছিলেন। নিতাই আসিয়া হাত জোড় করিয়া বলিল—মা-ঠাক্রুণ!
তিনি থমকিয়া দাঁড়াইয়া গেলেন। প্রথমে ভ্রূ কুঞ্চিত হইয়া উঠিল। নিতাইয়ের দিকে চাহিয়া দেখিয়া প্রসন্ন হইয়া বলিলেন—কে তুমি বাবা?
নিতাই গড় হইয়া প্রণাম করিয়া বলিল—আজ্ঞে মা, আমি এখানে বড় ‘বেপদে’ পড়েছি।
‘বেপদ’ শব্দটি তাহাকে সকল বিপদ হইতে রক্ষা করিল। শব্দটি শুনিয়া তিনি বুঝিলেন লোকটি পল্লীর মানুষ এবং একেবারে নূতন এখানে আসিয়াছে।
তিনি প্রসন্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করিলেন—কি বিপদ বাবা?
—আমি এখানকার কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছি না মা! তার ওপর গরীব নোক’, আশ্রয় নাই; নতুন এসেছি।
হাসিয়া তিনি বলিলেন—বুঝেছি এস, আমার সঙ্গে এস। স্টেশন থেকে আসছ বুঝি?
—হ্যাঁ মা! পথে পথে নিতাই যেন বাঁচিয়া গেল।
তাহার এই নূতন মা–তাঁহাকে সে নূতন মাই বলিল; তিনি নিতাইকে নিজের বাসায় লইয়া গেলেন। মানুষটি বড় ভাল।
নিতাই মনে মনে নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিল। ভাগ্যবিধাতাকে বলিল—প্রভু, তোমার মত দয়াল আর হয় না। অধমের ওপর দয়ার তোমার শেষ নাই। নইলে এমন বিদেশে বিভূরে এসেও মা যশোদার মত মায়ের আশ্রয় পেলাম কি ক’রে?
এই নূতন মা তাহাকে নিজের বাসায় লইয়া গেলেন। কোন এক আদিঅন্তহীন আঁকাবঁকা গলির ভিতর তার বাসা—একখানি ঘর, এক টুকরা বারান্দা। আর রান্না করিবার জন্য ছোট আর একটা বারান্দার একটা কোণ। নিতাই সঙ্কুচিত হইয়া বলিল—আমি বরং বাড়ীর বাইরে বসি। জাতে আমি বড় নীচু।
—কেন বাবা? এই বারান্দায় ব’স। হ’লেই বা নীচু জাত।
নিতাইয়ের চোখে জল আসিয়া গেল। সত্যই মা যশোদা। বৃন্দাবনের মায়েরা—যশোমতীর দেশের মায়েরা কেমন মা তাহা সে জানে না, কিন্তু তাহার দেশের মায়ের ছাড়া যশোদার মত মা অন্য কোন দেশে আছে বলিয়া তাহার মনে হয় না। সে দেখিয়াছে এই দেশের কত লোক —হিন্দুস্থানী কথা যাহারা বলে—তাহারা তাহাদের দেশে যায়–অনায়াসে এক বৎসর, দুই বৎসর এক নাগাড়ে কাটাইয়া দেয়, কই মাকে দেখিবার জন্য তো তাহারা ছুটিয়া যায় না! মায়েরাও নিশ্চয় দেশে দিব্য থাকে! যে যশোদা গোপালকে এক বেলার জন্য গোষ্ঠে পাঠাইরা কাঁদিতে বসিতেন, সে যশোদার মত মা তাহারা কি করিয়া হইবে? তা ছাড়া এমন মিষ্ট কথা—আহা-হা-রে —মা গো মা! না—কি বাবা গোপাল! এমন ডাক—এমন সাড়া— আর কোথায় মেলে?
মা তাহাকে একে একে কত কথা জিজ্ঞাসা করিলেন—কি নাম, কোথা ঘর, কোথা পোস্টাপিস, কোন্ জেলা? অবশেষে জিজ্ঞাসা করিলেনা, বাড়ীতে কে কে আছে বাবা? মা, ভাই, বিয়ে করনি বাবা? নিতাইয়ের মনে পড়িয়া গেল ঠাকুরঝিকে, মনে পড়িয়া গেল বসন্তকে। সে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল—না।
নূতন মা কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া প্রশ্ন করিলেন—তোমাদের গ্রামে কত ঘর ব্রাহ্মণ— কত ঘর কোন জাত আছে বাবা মাণিক? তোমাদের কোন স্টেশন? তোমাদের ওদিকে গেল বার ধান কেমন হয়েছিল বাবা? ধান ছাড়া আর কোন ফসল হয়? বর্ষা কেমন হয় বাবা? বাদলা হয় ঘন-ঘন?
মায়ের চোখ দুইটি স্বপ্নাতুর হইয়া উঠিল।
—বর্যায় কাদা কেমন হয় বাবা? তোমাদের দেশের ভাবের গাছ বেশী, না তালের গাছ বেশী? ডাবের দর কি রকম? মাছ কেমন—কোন মাছ বেশী? তোমাদের দেশের মুড়ি কেমন হয় বাবা?
নিতাই একে একে জবাব দিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে তাহারও মনে ভাসিয়া উঠতে লাগিল এক একটি ছবি।
–তোমাদের গ্রামের কাছে নদী আছে বাবা? বড় দীঘি আছে গ্রামে? আঃ, কতদিন দীঘির জলে স্নান করি নাই! দীঘিতে পদ্মফুল ফোটে? শালুক সব গ্রামেই আছে। নীল শালুক আছে বাবা তোমাদের গ্রামে? কলমীশুশুনীর শাক হয় বাবা?
মধ্যে মধ্যে প্রশ্ন ফুরাইয়া যায়। মা চুপ করিয়া থাকেন উদাস মনে। বোধ হয়, তাহারও মনে পড়ে দেশের কথা। আবার হঠাৎ মনে পড়ে কোন একটা নূতন কথা, সেইটার পিছনে পিছনে আসিয়া দাঁড়ায় আবার এক বাক প্রশ্ন।
—তোমাদের ওদিকে সজনের ডাঁটা হয়? ‘নজনে’ আছে? পানের বরজ আছে? কেয়া-র গাছ আছে তোমাদের গ্রামে, সাপ থাকে গোড়ায়? গোখরো কেউটে সাপ খুব বেশী ওদিকে, না? নদীর ধারে শামুকভাঙা কেউটে থাকে? গাঙ-শালিক আছে। বউ কথা কও পার্থী আছে? থাকবেই তো। ‘চোখ গেল’ অনেক আছে, না? ‘কৃষ্ণ কোথা রে’ পাখী? অনেকে বলে গেরস্তের খোকা হোক, গায়ের রঙ হলুদ, মাথাটি কালো, ঠোঁটটি লাল টুকটুকে, আমরা বলি—‘কৃষ্ণ কোথা রে’ পাখী। বেনে বউও বলি—আছে?
হঠাৎ মায়ের চোখ জলে ভরিয়া উঠিল। তিনি চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন কিছুক্ষণ। দেখিতে দেখিতে ফোঁটা দুই জল যেন আপনা-আপনি চোখ কাটিয়া বাহির হইয়া টপ টপ করিয়া ঋরিয়া পড়িল।
নিতাই কোন প্রশ্ন করিতে সাহস করিল না। কিন্তু ‘কৃষ্ণ কোথা রে’ পাখীর কথা জিজ্ঞাসা করিতে গিয়া চোখে জল আসিল দেখিয়া তাহার মনে হইল—বোধহয় তাহার কৃষ্ণও কোথায় চলিয়া গিয়াছে।
মা বলিলেন—মা যশোদা গোপালের জন্য কাঁদছিলেন আর হলুদ বাটছিলেন। বাটা হলুদ নিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই গড়লেন এক পাখী। সেই পাখীর মাথায় ঝরে পড়ল-তাঁর চোখের এক ফোট জল! সেই জলের তাপে পুড়ে তার মাথাটি হয়ে গেল কালো—আর জলের সঙ্গে ছিল যে চোখের রক্ত, সেই রক্তে তার ঠোঁট হয়ে গেল লাল। পাখীটিকে ছেড়ে দিয়ে বললেন–পাখী, তুই দেখে আয় আমার কৃষ্ণ কোথায়। পাখী ডেকে ডেকে ফিরতে লাগল—‘কৃষ্ণ কোথা রে?’ ‘কৃষ্ণ কোথা রে?’ চিরকাল সে ডেকেই ফিরছে।
নিতাইয়ের চোখ দিয়াও জল ঝরিতে আরম্ভ করিল।
মা বলিলেন—আমার কৃষ্ণও চলে গেছে বাবা। ব্রহ্মাণ্ডেও আর কেউ নেই। তাই এসেছি বাবার চরণে। নইলে দেশ ছেড়ে— অর্ধপথেই থামিয়া মা চোখ মুছিলেন। আবার প্রশ্ন করিলেন—তুমি কাশী এসেছ তীর্থ করতে? এই বয়সে তীৰ্থ? কিছু মনে ক’রো না বাবা— তোমাদের জাতের কেউ তো এমন ভাবে আসে না! তাই জিজ্ঞাসা করছি।
হাত দুটি জোড় করিয়া নিতাই বলিল–পূর্বজন্মের কর্মফল—হয়তো আমার কর্মফের, নইলে— নিতাই কথাটা শেষ না করিয়াই চুপ করিল। মা জিজ্ঞাসা করিলেন–কি বলছিলে বাবা?
নিতাই একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—আপনার কাছে লুকোব না মা। আমার বাবা, দাদা, ভাই, মামা, মেসো এরা সব চুরি-ডাকাতি করত। জেলও খাটত। সেই বংশে আমার জন্ম মা। আমি—বলিয়া সে থামিয়া গেল। কয়েক মুহূর্ত পরে সে আবার বলিল—বলিতে সে বোধহয় সঙ্কোচ অনুভব করিতেছিল, সসঙ্কোচেই বলিল— দেশে কবিগান শুনেছেন মা? দুই কবিয়ালে মুখে মুখে গান বেঁধে পাল্লা দিয়ে গান করে?
—শুনেছি বইকি বাবা। কত শুনেছি। আমাদের গায়ে নবান্নের সময় বারোয়ারী অন্নপূর্ণা পূজো হত। কবিগান হ’ত পূজোয়। দুর্গাপূজোয় হ’ত যাত্রাগানা, কৃষ্ণযাত্রা–শখের যাত্র। নীলকণ্ঠের গান—“সাধে কি তোর গোপালে চাই গো? শোন যশোদে!” সে সব গান কি ভুলবার। মনসার ভাসান গান হ’ত মনসাপূজোয়। চব্বিশ প্রহরের সময় কীর্তন হ’ত! বাউল বৈরেগীরা খঞ্জনী একতারা নিয়ে গান গেয়ে ভিক্ষে করত—“আমি যদি আমার হতাম কুড়িয়ে পেতাম হেমের ঘড়া ” আহা-হা! বাবা সেই কীর্তন-গানে শুনেছিলাম— “অমিয় মথিয়া কেবা লাবনি তুলিল গো তাহাতে গড়িল গোরাদেহ”–গোরাচাঁদের দেহ অমৃত ছেঁকে তৈরী হয়েছে। এ সব গান যে অমৃত-ছাঁকা জিনিস বাবা। কবিগান শুনেছি বইকি!
চুপ করিয়া গেল। ইহার পর আর নিজেকে কবিয়াল বলিয়া পরিচয় দিতে সাহস হইল না।
বিধবাই জিজ্ঞাসা করিলেন—তুমি কি কবির দলে থাকতে বাবা? নিজে কবিগান করতে?
হাত জোড় করিয়া নিতাই বলিল—হ্যাঁ মা, অধম একজন কবিয়াল। তবে মা বড় দরের কবিয়াল আমি নই। আমি ঝুসুর দলের সঙ্গে থেকে গান করতাম।
—তা হোক না বাবা! কবিয়াল তো বটে। তা তীর্থ করতে বেরিয়েছ বুঝি?
একটু চুপ করিয়ু থাকিয়া নিতাই বলিল—আর ফিরব বলে বেরুই নাই মা। ইচ্ছে আছে ভগবানের দরবারে পথে পথে গান করব, তাতেই দিন কটা কেটে যাবে আমার।
বিধবা অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন—তাতে তো তুমি মুখ পাবে না বাবা। তুমি কবিয়াল–গান গাইবে—লোককে আনন্দ দেবে, হাসাবে, কাঁদাবে, মেডেল পাবে, কত লোক কত প্রশংসা করবে—তবে তো তোমার আনন্দ হবে, মুখ হবে! বলিতে বলিতে তিনি হঠাৎ থামিয়া গেলেন।–সুখ সংসারে মেলে না বাবা। যদি মেলে, যদি বিশ্বনাথ দেন তো তোমার আপন কাজের মধ্যেই পাবে।
অপরাহ্লে সে মায়ের কাছ হইতে বিদায় হইল। ইহারই মধ্যে সে তাহার সকল কথাই বলিল। রাজার কথা, বিপ্ৰপদর কথা। এমন কি বসন্তের কখাও বলিল। বলিল না শুধু ঠাকুরঝির কথা। শুধু তাই নয়, তাহাকে সে গানও শুনাইল।
মায়ের বৃত্তান্তও সে সব জানিল। আপনার জন মায়ের কেউ নাই, একমাত্র সন্তানকে হারাইয়া মা এখানে আসিয়া আশ্রয় লইয়াছেন। দেশ হইতে জ্ঞাতিরা যাহারা তাহার শ্বশুরের সম্পত্তির উত্তরাধিকার পাইয়াছে, তাহারা মাসে দশটি করিয়া টাকা পাঠায়, তাও অনিয়মিত। মা হাসিয়া বলিলেন–পেটের জন্যে ঝগড়া করতে ইচ্ছে হয় না বাবা, লজ্জা হয়। আহার কমিয়ে আধপেট অভোস করলে এক মাসের থোরাকে দুমাস যায়। তার মধ্যে উপোস করতে পারলে —বিধবার উপেস তো অনেক।
নিতাই অধীর হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। ওঃ—সে মায়ের এই আধপেটা অন্নের ভুগি লইয়াছে! মা তাহাকে হাসিমুখে দিয়াছেন। ও:! সে বলিল—আমি এইবার উঠি মা! থাকলে আবার আসব।
নিতাই প্রণাম করিল, দূর হইতে ভূমিষ্ঠ হইয়া বলিল—আপনি দু’পা পিছিয়ে যান মা। আমি ওই ঠাঁইটির ধুলো নেব।
মা বলিলেন—তুমি আমার পা ছুঁয়েই নাও বাবা। আমি তে চান করব এখুনি।
—না। নিতাই তাহার পা ছুঁইল না।
মা বলিলেন—অনেক সত্ৰ আছে; জায়গা মিলবে। আমার ঘর এই তো দেখছ—তা, ছাড়া এ বাড়ীতে আর দশজন থাকে। সবাই মেয়েছেলে এখানে—
নিতাই হাসিয়া বলিল—দেবতার দেখা খানিকক্ষণের জন্যই বটে মা। চিরকালের পুণ্যি তো আমার নয় মা অন্নপূর্ণা আপনি আমার সাক্ষাৎ মা অন্নপূর্ণা।
মা বলিলেন—তোমার কচি বয়স, তুমি কবিয়াল—তুমি দেশে ফিরে যাও বাবা। চমৎকার তোমার গলা। গানও তোমার ভাল। দেশে তোমার কদর হবে। এ তো বাংলা গানের দেশ নয় বাবা। অবিশ্যি গঙ্গার ঘাটে—ঘাট তো এথানে অনেক আর বাঙালীও অনেক— সেখানে বসে গান করলে অনেক শুনবার লোক পাবে—কিছু কিছু হয়তে পাবেও। কিন্তু সংসারে পেট চলাই তো সব নয় বাবা। একটু বিষন্ন হাসির সঙ্গে কথাটি শেষ করিলেন মা।
এই কথাটার নিতাই একটু ক্ষুণ্ণ হইল। এই লইয়া মা তাহাকে দুইবার কথাটা বলিলেন।
সন্ধ্যায় বিশ্বনাথের মন্দির-প্রাঙ্গণে আসিয়া মায়ের কথার সত্যতা কিন্তু সে অনুভব করিল। ঘটনাট ঘটিল এইরূপে। প্রাঙ্গণের এক প্রান্তে দাঁড়াইয়া মন্দিরশীর্ষের ধ্বজ ও কলসের দিকে সে তাকাইয়া ছিল। সোনার পাত দিয়া মোড়া মন্দির। আকাশে ছিল পরিপূর্ণ জ্যোৎস্না। সেই জ্যোৎস্নার ছটায় ঝলমল করিতেছিল।
চারিদিকে আরতি ও শৃঙ্গার-বেশ দর্শনার্থীর ভিড়। হাজার কণ্ঠে বিশ্বনাথের জয়ধ্বনি, সেই ধ্বনির সঙ্গে সে নিজের কণ্ঠও মিশাইয়া দিল—জয় বিশ্বনাথ!
তারপর সে মনে মনে গান রচনা আরম্ভ করিল—
