মন্দিরের পথে চলিতে চলিতেই কথা হইতেছিল। সমস্ত কথা শুনিয়া নিতাইয়ের মনটা উদাস হইয়া উঠিল। একটা সুগভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস তাহাব বুক হইতে ঝরিয়া পড়িল। এমন হাসিতে হাসিতে বসন্ত তাহার কাঁসির অমুখের কথাগুলো বলিল যে নিতাইয়ের মনে হইল, বসন্তের ওই ক্ষীণ হাসিতে ঈষৎ বিস্ফারিত ঠোঁট দুইটির কোলে-কোলে লাল কালির কলমে টানা রেখার মত রক্তের টকটকে রেখা ফুটিয়া উঠিয়াছে। ‘ফেলিয়া চলিয়া যাইবে গাছতলায় মরিতে হইবে। জীবন্তই হয় তো শেয়াল-কুকুরে ছিঁডিয়া খাইবে!’ সে ছবিগুলা যেন তাহার মনের মধ্যে ফুটিতে লাগিল। অগ্র-পশ্চাৎ তাহার সব ভুল হইয়া গেল। পলাইবার কথা তাহার মনে রহিল না। অজুহাতটার কখাও ভুলিয়া গেল। শুধু নীরবে মাথা হেঁট করিয়া বসন্তের সঙ্গে মন্দিরের দিকে চলিতে আরম্ভ করিল।
কিছুক্ষণ পরেই বসন্ত আবার কথা বলিল—তাহার সে বিষন্ন কণ্ঠস্বর আর নাই; কৌতুকসরস কণ্ঠে মৃদু হাসিয়া বলিল—গাঁটছড়া বাঁধবে নাকি? গাঁটছড়া?
কথাটা বসন নেহাৎ ঠাট্টা করিয়াই বলিল। আশ্চর্য বসন! এইমাত্র নিজের মরণের কথা এত করিয়া বলিয়া ইহারই মধ্যে সে-সব সে ভুলিয়া বসিয়া আছে।
নিতাই তাহার মুখের দিকে চোখ তুলিয়া চাহিল। স্থির দৃষ্টিতে বসন্তকে কিছুক্ষণ সে দেখিল। শাণিত-ক্ষুরের মত ঝকঝকে ধারালো বসন্তের ধার ক্ষয় হইয়া একদিন টুকরা-টুকরা, হয়ত গুঁড়া হইয়া যাইবে উখায় ঘষা ইস্পাতের গুঁড়ার মত।
বসন্ত হাসিয়া বলিল—দেখছ?
–হ্যাঁ!
—কি দেখছ? কেয়াফুলও শুকোয়। চোখের কোণে কালি পড়েছে!
বসন্তের মুখে তখনও হাসির রেখা। সে হাসি আশ্চর্য হাসি।
নিতাই মুখে কোন উত্তর দিল না। হাত বাড়াইয়া বসন্তের আঁচলখানি টানিয়া লইয়া নিজের চাঁদরের খুটের সঙ্গে বাঁধিতে আরম্ভ করিল।
বসন্ত চমকিয়া উঠিল—ও কি করছ? সে এক বিচিত্র বেদনার্ত উত্তেজনাভরে সে আপনার কাপড়ের আঁচলখানা আকর্ষণ করিয়া বলিল—না না, না। ছি! ও আমি ঠাট্টা করে বলেছিলাম। তুমি কি সত্যি ভাবলে নাকি?
প্রসন্ন হাসিতে নিতাইয়ের মুখখানি উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল, সে বলিল—গিঁট আগেই পড়ে গিয়েছে বসন। টেনো না। আমি যদি আগে মরি, তবে তুমি সেদিন খুলে নিও এ গিঁট; আর তুমি যদি আগে মর, তবে সেই দিন আমি খুলে নোব গিঁট।
বসন্তের মুখখানি মুহূর্তে কেমন হইয়া গেল।
ঠোঁট দুইটা, শীতশেষের পাণ্ডুর অশ্বখপাত উতলা বাতাসে যেমন থরথর করিয় কাঁপে, তেমনি করিয়া কাঁপিতে লাগিল। তাহার রক্তাভ সুগৌর মুখখান যেন সঙ্গে সঙ্গে সাদা হইয়া গিয়াছে। গরবিনী দর্পিতা বসন্ত যেন এক মুহূর্তে কাঙালিনী হইয়া গিয়াছে।
নিতাই এবার হাসিয়া বলিল—এস এস, আমার আর তর সইছে না। ঠাকুরের দরবারে রাগ করে না।
—রাগ? বসন্ত বলিল—আমার রাগ সইতে পারবে তো তুমি?
—পায়ে ধরে ভাঙাব। নিতাই হাসিল। –এস এস।
বাসায় ফিরিতেই একটা কলরব পড়িয়া গেল। নির্মলা-ললিতাদের মদের নেশা তখন বেশ জমিয়া আসিয়াছে। ফুলের মালা গলায় গাঁটছড়া বাঁধিয়া নিতাই ও বসন ফিরিবামাত্র তাহাদের দেখিয়া তাহার হলুধ্বনি দিয়া হৈ হৈ করিয়া উঠিল। গাঁটছড়াটা খুলিবার কথা নিতাই বা বসন দুইজনের কাহারও মনে হয় নাই।
নিতাই হাসিতে লাগিল। আশ্চর্য, সে লজ্জা পাইল না–কোন গ্লানিও অনুভব করিল না।
আশ্চর্যের উপর আশ্চর্য, লজ্জা পাইল বসন্ত। গাঁটছড়াবাঁধা নিতাইয়ের কাধের চাদরখানা টানিয়া লইয়া সে লজ্জায় মাথা হেঁট করিয়া মৃদু মৃদু হাসিতে হাসিতে ঘরের মধ্যে গিয়া ঢুকিল।
কবি – ১৭
ভ্ৰাম্যমাণ নাচ-গানের দল। নাচ ও গানের ব্যবসায়ের সঙ্গে দেহের বেসাতি করিয়া বেড়ায়— গ্রাম হইতে গ্রামান্যরে, দেশ হইতে দেশান্তরে। কবে কোন পর্বে কোথায় কোন মেলা হয়, কোন পথে কোথা হইতে কোথায় যাইতে হয়—সে সব ইহাদের নখদর্পণে। বীরভূম হইতে মুর্শিদাবাদ, পদব্রজে, গরুর গাড়িতে, ট্রেনে তারপর নৌকায় গঙ্গা পার হইয়া—রাজসাহী, মালদহ, দিনাজপুর পর্যন্ত ঘুরিয়া আষাঢ়ের প্রারম্ভ পর্যন্ত বাড়ি ফেরে।
প্রৌঢ়া বলে–আগে আমরা পদ্মাপারে নিচের দিকেও যেতাম। পদ্মাপারে বাঙাল দেশে আমাদের ভারি খাতির ছিল।
নির্মলা প্রশ্ন করে—পদ্মাপার তুমি গিয়েছ মাসী?
নির্মলার কথা শেষ হইতে না হইতে মাসী পদ্মাপারের গল্প বলিতে বসে। বলে—যাইনি? বাপরে, সে কি ধুম!
তারপর বেশ আরাম করিয়া পা ছড়াইয়া বসিয়া সুপারী কাটিতে কাটিতে বলে—বাতের তাল খানিক মুলিশ করে দে দিখি; পদ্মাপারের কথা বলি শোন। .
আপসোসের দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলে—আঃ মা, তোরা আর কি দেখলি–কি-ই বা রোজগার করলি আর কি-ই বা খেলি। সে ‘দ্যাশ’ কি! সোনার ‘দ্যাশ’! মাটি কি! বারোমাস মা-নক্ষ্মী যেন আঁচল পেতে বসে আছেন। সুপুরী কিনতে হয় না মা। সুপুরীর বন। যাও—কুড়িয়ে নিয়ে এস। ডাব নারিকেল—আমাদের ‘দ্যাশের’ তালের মতন। দু-ধারি পাটের ‘ক্ষ্যাত’।
সে হাত দুইখানা দীর্ঘ ভঙ্গিতে বাড়াইয়া দিয়া সুবিস্তীর্ণ পাট চাষের কথা বুঝাইয়া দিতে চেষ্টা করে। তারপর আবার বলে—এক এক পাটের ব্যাপারী কি! পয়সা কত! এই বড় বড় লৌকো। ব্যাপারীদের নজর কি, হাত দরাজ কত। প্যালা দেয় আধুলি, টাকা; সিকির কম তো লয়। আর তেমন কি খাবার সুখ। মাছই কত রকমের। ইলিশ-ভেটকি-কত মাছ মাছ—‘অছল্যি’ মাছ! আঃ তেমনি লঙ্কা খাবার ধুম!
ললিতা বলে—আমাদের একবার নিয়ে চল মাসী ওই দ্যশে।
মাসী বলে—মা, সি রামও নাই আর সি অযুধ্যেও নাই। সি দ্যাশে আর আমাদের সে আদরও নাই মা। সি কালে আমরা যেতাম—পালাগান গাইতাম। পদাবলীর গান— আমাদের সি কালের ওস্তাদের আবার বেশ রসান দিয়ে পালাগান ‘নিকতো’—সে-সব গান আমরা গাইতাম। যে যেমন আসর আর কি! তেলক কাটতে হ’ত, গলায় কণ্ঠি পরতে হ’ত। আবার বাজারে হাটে হালফেশানী গান হ’ত। আজকাল আর পালাগান কে শোনে বল?
নইলে পালাগান নিয়েই তো ঝুমুর!
বেহালাদার মাসীর কথা শুনিতে শুনিতে বলিল—উ দ্যাশের মাঝিদের গান শুনেছ মাসী?
—শুনি নাই? ভারি মিষ্টি সুর। প্রৌঢ়া নিজের মনেই গুন গুন করিয়া সুর ভাঁজিতে আরম্ভ করিল। বার দুয়েক ভাঁজিয়া নিজেই ঘাড় নাড়িয়া বলিল—উহু, আসছে না ঠিক।
বেহালাদার কি মনে করিয়া বার দুয়েক বেহালার উপর ছড়ি টানিল, প্রৌঢ়া বলিয়া উঠিল— হ্যাঁ হ্যাঁ! ওই বটে। কিন্তু বেহালাদার সঙ্গে সঙ্গেই থামিয়া গেল।
নির্মলা সুরটি শুনিবার জন্য উদগ্রীব হইয়াছিল, বেহালাদার থামিয়া যাইতেই সে অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া বলিল—ওই এক ধারার মানুষ! বাজাতে আরম্ভ করে থেমে গেল!
নির্মলার প্রিয়জন বেহালাদার একটু বিচিত্র ধরণের মানুষ; সারাদিন বেহালাটি লইয়া ব্যস্ত। ছড়িতে রজন ঘষিতেছে, বেহালার কান টানিয়া টানিয়া তার ছিঁড়িতেছে আবার তার পরাইতেছে। কখনও ঝাড়িতেছে, কখনও মুছিতেছে। মাঝে মাঝে কখনও সযত্ন-সঞ্চিত বার্নিশের শিশি হইতে বার্নিশ লইয়া মাথাইতে বসে। কিন্তু বড় একটা বাজায় না। আসরে বাজায়, বাসায় নতুন গানের মহল বসিলেও বাজায়, সে স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু সারাদিন যে মানুষটা বেহালা লইয়াই বসিয়া থাকে সে কখনও আপন মনে কোন গান বাজায় না ইহাই সকলের আশ্চর্য লাগে। ছড়ি টানিয়া সুর বাঁধিতে বাঁধিতেই জীবন কাটির গেল। তবে এক একদিন, সেও ক্বচিৎ, গভীর রাত্রে সবাই যখন ঘুমায়, সে বেহালা বাজাইতে বসে। সেও একটি গান! এবং তেমন দিনটিরও একটি লক্ষণ আছে। সেদিনের সে লক্ষণ নিতাই আবিষ্কারও করিয়া ফেলিয়াছে। নিতাই পূর্ব হইতেই বুঝিতে পারে। নির্মলার ঘরে আগন্তুক আসিয়া যেদিন সারারাত্রির মহোৎসব জুড়িয়া দিবে সেই দিন; নিতাই বুঝিতে পারে যে আজ বেহালাদার বেহালা বাজাইবে।
সে এক অভূত গান। নিতাই বাজনায় সে গান শুনিয়াছে। অন্ধকারে কোন গাছতলায় একা বসিয়া বেহালাদার সে গান বাজায়। কিন্তু কেহ কাছে আসিয়া বসিলেই বেহালাদার বেহালাখানি নামাইয়া রাখে। এমন রাত্রে, অর্থাৎ নির্মলার ঘরে মহোৎসবের রাত্রে নিতাই এই গানটি শুনিবার জন্য ঘুমের মধ্যেও উদ্গ্ৰীব হইয়া থাকে। নিস্তব্ধ রাত্রে বেহালার মুর উঠিবামাত্র তাহার ঘুম ভাঙিয়া যায়। কিন্তু সে ওঠে না, শুইয়া শুইয়াই শোনে। একমাত্র মহিষের মত লোকটাকেই বেহালাদার গ্রাহ্য করে না। লোকটা যেন লোকই নয়, একটা জড়পদার্থ। লোকটাও চুপচাপ রাঙাচোখ দুইটা মেলিয়া নেশ-বিহ্বল দৃষ্টিতে অন্ধকারের দিকে চাহিয়া থাকে।
ললিতার প্রিয়জন দোহার লোকটি অত্যন্ত তার্কিক, তর্ক তাহার অধিকাংশ সময় ওই বাজনদার লোকটির সঙ্গে। বাজনার বোল ও তাল লইয়া তর্ক তাহদের লাগিয়াই আছে। মধ্যে মধ্যে ললিতার সঙ্গেও ঝগড়া বাঁধিয়া যায়। ললিতা তাহাকে ঘর হইতে বাহির করিয়া দেয়, লোকটা মাসীর কাছে নালিশ করে, মাসীর বিচারে পরাজয় যাহারই হউক, সে-ই ললিতার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করিয়া বলে—দোষ হইছে আমার, ঘাট মানছি আমি। আর কখুনও এমন কর্ম করব না। কান মলছি আমি। লোকটা সত্যই কান মলে।
নির্মলা ও বসন্ত লোকটার নাম দিয়াছে—‘ছুঁচো! ছি-চরণের ছুঁচো।‘ কথাটা অবশ্য আড়ালে বলিতে হয়, নহিলে ললিতা কোঁদল বাঁধাইয়া তুমুল কাও করিয়া বসে। দোহার লোকটি কিন্তু রাগে না, হাসে।
বাজনদারটির প্রিয়তমা কেহ নাই। জুটিলেও টেকে না। লোকটির কেমন স্বভাব—যে নারীটির সহিত সে প্রেম করিবে, তাহারই টাকা-পয়সা সে চুরি করিয়া বসিবে। লোকটি প্রৌঢ়। নির্মল, ললিত দুইজনেই এক এক সময় তাহার প্রিয়তম ছিল। কিন্তু ঐ কারণেই বিচ্ছেদ ঘটিয়া গেছে। লোকটা কিন্তু বাজায় খুব ভাল—যেমন তাহার তালজ্ঞান, বাজনার হাতটিও তেমনি মিঠা। কতবার চুরি করিয়া ঝগড়া করিয়া দল হইতে চলিয়া গিয়াছে, আবার কিছুদিন পর ফিরিয়া আসিয়াছে। লোকটা অতিমাত্রায় চরিত্রহীন। রাত্রে বাজনা বাজায়, দিনে সে ঘুরিয়া বেড়ায় নারীর সন্ধানে।
নির্মলা ললিতা নিতাইয়ের এক নাম দিয়াছে। বলে—‘বসন্তের কোকিল’।
বসন্ত নিতাই দুজনেই হাসে।
