বসন্তদের ঝুমুরদলের আস্তানায় ঘরগুলার সামনে গাছতলায় চ্যাটাই পাতিয়া লণ্ঠনের আলোয় প্রৌঢ়া সুপারি কাটিতেছিল—জন-দুইয়েক রান্নায় ব্যস্ত ছিল। একটা খড়ের কুঠুরীতে উজ্জল আলো জ্বলিতেছে, মেয়েপুরুষের সম্মিলিত হাসির উচ্ছ্বাসে ঘরখানা উচ্ছ্বসিত। তাহার মধ্যে নিতাই চিনিল—-বসন্তর হাসি; এমন ধারালো খিল-খিল হাসি বসন্ত ভিন্ন কেহ হাসিতে পারে না, অন্যত ঝুমুর দলের কোন মেয়ে পারে না।
নিতাইকে দেখিয়াই প্রৌঢ়া আনন্দে উচ্ছ্বসিত হইয়া দাঁড়াইল—এস, এস, বাব এস। আমি তোমার পথ চেয়ে রয়েছি।
রন্ধনরত মেয়ে দুইটি রান্না ছাড়িয়া কাছে আসিয়া দাঁড়াইল,—হাসিমুখে বলিল—এসে গিয়েছ—লাগছে!
নিতাই হাসিয়া বলিল—এলাম বৈকি।
গ্রৌঢ় বলিল—ওলো, বাবাকে আমার চা ক’রে দে। মুখে হাতে জল দাও বাবা।
একটি মেয়ে বলিল—খুব ভাল করে গান করতে হবে কিন্তুক।
অন্য মেয়েটি ছুটিয়া গিয়া আলোকোজ্জল কুঠুরীটার দুয়ারে দাঁড়াইয়া বলিল—ওলো বসন, কবিয়াল আইচে লো! তোর কালো-মাণিক!
নিতাই হাসিয়া সংশোধন করিয়া দিল—কালো-মাণিক লয়, কয়লা-মাণিক।
বসন্ত ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিল—তাহার পা টলিতেছে, ডাগর চোখের পাতা ভারী হইয়া নামিয়া আসিতে চাহিতেছে, নকের ডগায় চিবুকে কপালে ঘাম দেখা দিয়াছে। সে আসিয়া দৃষ্টি বিস্ফোরিত করিয়া নিতাইয়ের দিকে চাহিয় তাহার হাত ধরিয়া বলিল—না, তুমি আমার কালো-মাণিক। আমার মনে রেখেছ তুমি, ছিদ্দ কুম্ভে জল রেখেছ—তুমি আমার কালো-মাণিক।
নেশার প্রভাবে বসন্তর কণ্ঠস্বর স্বভাবতই খানিকট আবেগময় হইয়াছিল—কিন্তু সে আবেগ, শেষ কথা কয়টি বলিবার সময় যেন অনেক গুণে বাড়িয়া গেল।
প্রৌঢ়া রহস্য করিয়া বলিল—তা ব’লে যেন কাঁদতে বসিস না বসনা, নেশার ঘোরে!
নেশায় অধনিমীলিত চোখ দুইটি আবার বিস্ফারিত করিয়া বসন এবার খানিকক্ষণ প্রৌঢ়ার দিকে চাহিয়া বলিল—আলবৎ কাঁদব, কালো-মাণিকের গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ভাসিয়ে দোব। এমন যত্ন ক’রে কে চা ক’রে দেয়—কে গায়ের ধুলো মুছিয়ে দেয়? আজ সারারাত কাঁদব—। বলিতে বলিতেই সে আপনার ঘরের হুয়ারের কাছে আসিয়া বলিল—এই নাগরের, যাও, চলে যাও তোমরা। আর আমোদ নেহি হোগা!
প্রৌঢ়া শশব্যস্ত হইয়া উঠিয়া গিয়া বসন্তর হাত ধরিয়া বলিল—এই বসন! বসন! ছিঃ! করছিস কি? খদের লক্ষ্মী—তাড়িয়ে দিতে নাই।
বসন প্রৌঢ়ার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিতে থাকিতে ফোঁপাইয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিল— তা বলে আমি কাঁদতেও পাব না মাসী, আমি কাঁদতেও পাব না?
নিতাই উঠিয়া আসিয়া বলিল—না কাঁদবে কেনে? ছি!
—তবে তুমিও এস! তুমি গান করবে আমি নাচব।
—আচ্ছা, আচ্ছা। প্রৌঢ়া বলিল—যাবে। এই এল, চ খেয়ে জিরুক খানিক, তারপর যাবে; তু চল ততক্ষণ।
—চা? না, চা থাবে কি! চা খাবে কেনে? খুব ভাল মদ আছে—মদ খাবে! এস। বসন্ত নিতাইয়ের হাত ধরিয়া আকর্ষণ করিল।
নিতাই হাত টানিয়া লইয়া বলিল—ছাড়।
–না।
—মদ আমি খাই না।
—খেতে হবে তোমাকে। আমি থাইয়ে দোব।
–না,
বসন্ত ঘাড় বাঁকাইয়া নিতাইয়ের দিকে চাহিয়া বলিল-আলবৎ খেতে হবে তোমাকে।
প্রৌঢ়া বলিল—মাতলামি করিস না বসনা, ছাড়, ঘরে যা।
তেমনি বঙ্কিম গ্রীবাভঙ্গি করিয়া চাহিয়া বসন নিতাইকে বলিল—যাবে না তুমি? মদ খাবে না?
–না।
—আমার কথা তুমি রাখবে না?
—এ কথাটি রাখতে পারব না ভাই।
বসন্ত নিতাইকে ছাড়িয়া দিল। তারপর টলিতে টলিতে ঘরের মধ্যে গিয়া প্রবেশ করিয়া বলিল–বন্ধ করে দেও দরজা।
প্রৌঢ়া আক্ষেপ করিয়াই বলিল—মেয়েট ওই মদ খেয়েই নিজের সর্বনাশ করলে। এত মদ খেলে কি শরীর থাকে!
নিতাই একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল। যে মেয়েটি চা করিতে গিয়াছিল, সে একটা কলাইকরা গ্লাসে চা আনিয়া বলিল—লাও, চা খাও ওস্তাদ।
হাসিয়া নিতাই চায়ের গ্লাসটি লইয়া বলিল—নক্ষ্মী দিদি আমার, বাঁচালে ভাই!
প্রৌঢ়া হাসিয়া বলিল—বাঃ, বেশ হয়েছে। নির্মল, তু ওস্তাদকে দাদা বলে ডাকবি। ভাইদ্বিতীয়েতে ফোঁটা দিবি ওস্তাদকে, কিন্তুক কাপড় লাগবে!
নিতাই পরম গ্রীত হইয়া বলিল–নিশ্চয়!
অপর মেয়েটি রান্নাশাল হইতেই বলিল – তা হলে আমি কিন্তুক ঠাকুরঝি সম্বন্ধ পাতালাম।
প্রৌঢ়া খুশী হইয়া সায় দিয়া বলিল—বেশ বলেছিস ললিতে, বেশ বলেছিস! বসন তোকে দিদি বলে।
নিতাইয়ের হাত হইতে চায়ের গ্লাসটা খসিয়া পড়িয়া গেল—ঠাকুরঝি! ঠাকুরঝি!
* * *
রাত্রির অগ্রগতির সঙ্গে সে এক বীভৎস দৃপ্ত। নিতাইয়ের কাছে এ দৃশ্য অপরিচিত নয়। মেলা উৎসবের আলোকোজ্জ্বল সমারোহের একটি বিপরীত দিক আছে। সে দিকটা সহজে মানুষের চোখে পড়ে না। আলোকের বিপরীত অন্ধকারে ঢাকা সে দিক। গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা বিপরীত দিকটিতে মাটির তলায় সরীসৃপের মত মানুষের বুকের আদিম প্রবৃত্তির ভয়াবহ আত্মপ্রকাশ সেখানে। অবশ্য নিতাইয়ের যে পারিপার্শ্বিকের মধ্যে জন্ম, সে পারিপার্শ্বিকও অবস্থাপন্ন সভ্যসমাজের ছায়ায় অন্ধকারে ঢাকা বিপরীত দিক। সভ্যসমাজের আবর্জনা ফেলার স্থান। সেখানেও অনাবিষ্কৃত চির-অন্ধকার—মেরুলোকের মত চির অন্ধকার। এ ধরনের বীভৎসতার সঙ্গে তাহার পরিচয় না-থাকা নয়। তবুও এমন করিয়া প্রত্যক্ষ মুখোমুখি হইয়া সে কখনও দাঁড়ায় নাই। সে হাঁপাইয়া উঠিল।
নির্মলা এবং ললিতার ঘরেও আগন্তুক আসিয়াছে। মত্ত জড়িত কষ্ট্রের অশ্লীল হাস্যপরিহাস চলিতেছে।
বসন্তর ঘর হইতে সে লোক দুইটা চলিয়া গিয়াছে, আবার নূতন আগন্তুক আসিয়াছে।
প্রৌঢ়া দলের পুরুষগুলিকে লইয়া মদ খাইতে বসিয়াছে। নিতাইকে আবার একবার চা দেওয়া হইয়াছে। সে ভাবিতেছিল ঠাকুরঝিকে। ইচ্ছা হইতেছিল—এখনই এখান হইতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়া সে পলাইয়া যায়। কলঙ্ক তো তাহার হইয়াই গিয়াছে, সে কলঙ্কের ছাপ ঠাকুরঝির অঙ্গেও লাগিয়াছে। হয়তো তাহার স্বামী এজন্য তাহাকে পরিত্যাগই করিবে— বাড়ী হইতে তাড়াইয়া দিবে। দশের ভয়ে তার বাপও হয়তে তাহাকে বাড়ীতে স্থান দিবে না। আজ তাহার সব লজ্জা শেষ হইয়া গিয়াছে। ঘর ভাঙিতে আর বাকী নাই। ভাঙিয়াই গিয়াছে। তার আর ভয় কেন? আজ তো নিতাই গিয়া ঠাকুরঝির হাত ধরিয়া বলিতে পারে—“এস, আজ হইতে তোমারও যে গতি, আমারও সেই গতি।” নিতাই চঞ্চল হইয়া উঠিল। আবার অনেকক্ষণ ভাবিয়া সে স্থির করিল—চলিয়াই সে যাইবে, ইহাদের এই মেলার গানের আসর সারিয়া চলিয়া যাইবে। কিন্তু গ্রামে নয়, অন্য যেখানে হোক—এত বড় দুনিয়ায় যেদিকে মন চায় সেই দিকে চলিয়া যাইবে। মুহূর্তে পূর্বের চিন্তা কল্পনা সব তাহার পাণ্টাইয়া গিয়াছে—না না, সে হয় না। ঠাকুরঝির ভাঙা ঘর আবার জোড়া লাগিবে, তাহার মুখের সংসার আবার মুখে ভরিয়া উঠিবে।
ঠাকুরঝি তাহাকে ভুলিয়া যাক। না দেখিলেই ভুলিয়া যাইবে। সন্তান-সন্ততিতে তাহার কোল ভরিয়া উঠুক, মুখে সম্পদে সংসার উথলিয়া পড়ক, স্বামী সন্তান সংসার লইয়া সে সুখী হোক।
কবি – ১৪
বিগত রাত্রিটা প্রায় বিনিদ্র চোখেই সে যাপন করিয়াছিল। কিছুতেই ঘুম আসে নাই। ভোরে উঠিয়াই সে ঝুমুর দলের আস্তানা হইতে বাহির হইয়া পড়িল। একটা প্রকাও দীঘিকে মাঝখানে রাখিয়া দীঘির চারিপাশে মেলা বসিয়াছে। রাসপূর্ণিমায় রাসোৎসব মেলা; দীঘির পূর্ব দিকে রাধাগোবিনের মন্দির; পাশেই সেবাইত বৈষ্ণব বাবাজীর আখড়া; মুখ হাত ধুইয়া নিতাই সেই রাধাগোবিন্দের মন্দিরে গিয়া বসিল। রাসমঞ্চে অষ্টসখীপরিবৃতা রাধাগোবিন্দকে তাহার বড় ভাল লাগিল। সেখানেই বসিয়া সে গান রচনা আরম্ভ করিয়া দিল। রাধাকৃষ্ণের যুগল-রূপের স্তবগান। প্রথমে গুন গুন করিয়া গানখানি রচনা শেষ করিয়া—বেশ গলা ছাড়িয়া গান আরম্ভ করিল। মিষ্ট গলার গানে বেশ কয়েকজন লোকও জমিয়া গেল। আখড়ার মোহন্তও বাহির হইয়া আসিলেন।
নিতাই গাহিতেছিল—
“আশ মিটায়ে দেখ রে নয়ন যুগল-রূপের মাধুরী!”
মোহন্ত, চোখ বুজিয়া ঘাড় নাড়িয়া তাল দিতে দিতে একজনকে বললেন–খোল আন তো বাবা।
মোহন্ত খোল লইয়া নিজেই সঙ্গত আরম্ভ করিয়া দিলেন। গান শেষ হইলে বলিলেন— তোমার কণ্ঠটি তো বড় ভাল! পদাবলী জান বাবা?
নিতাই পদাবলী কথাটা বুঝিল না। বিনীত ভাবে প্রশ্ন করিল—আজ্ঞে! —মহাজন পদাবলী বাবা–চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাসের পদ? নিতাই হাত জোড় করিয়া বলিল—প্রভু, অধীনের অধম নীচ কুলে জন্ম। এ সব কি করে জানব বাবা?
হাসিয়া মোহন্ত বলিলেন–জন্ম তো বড় নয় বাবা, কর্মই বড়, মহাপ্রভু আমার আচণ্ডালে কোল দিয়েছেন।
মুহূর্তে নিতাইয়ের চোখ দুইটা জলে ভরিয়া উঠিল, বলিল—কর্মও যে অতি হীন প্রভু; ঝুমুর দলে—বেশ্যাদের সঙ্গে থাকি, কবিগান করি।
—কবিগান কর?
–আজ্ঞে হ্যাঁ প্রভু।
—যে গান তুমি গাইলে, সে কি তোমার গান?
মাথা নত করিয়া সলজ্জ হইয়া নিতাই বলিল—আজ্ঞে হ্যাঁ।
মোহন্ত সাধুবাদ দিয়া বলিলেন—ভাল ভাল! চমৎকার গান! তারপর বলিলেন–কর্ম তোমার তো অতি উচ্চ কর্মই বাবা। তোমার ভাবনা কি! যারা কবি, তারাই তো সংসারে মহাজনা, তারাই তো সাধক। কবির গানে ভগবান বিভোর হন। চণ্ডীদাসের পদাবলী শুনে মহাপ্রভু ভাবে বিভোর হয়ে নাচতেন।
টপ্ টপ্ করিয়া কয়েক ফোট জল নিতাইয়ের চোখ হইতে ঝরিয়া পড়িল, সে বলিল— কিন্তু সঙ্গ যে অতি নীচ সঙ্গ বাবা, বেশ্যা–
মোহন্ত হাসিয়া হাত তুলিয়া ইঙ্গিতে নিতাইকে বাধা দিলেনা, বলিলেন—প্রভুর সংসারে নীচ কেউ নাই বাবা। নিজে, পরে নয়—নিজে নীচ হলে সেই ছোঁয়াচে পরে নীচ হয়। নীল চশমা চোখে দিয়েছ বাবা? সূর্যের আলো নীলবর্ণ দেখায়। তোমার চোখের চশমার রঙের মত তোমার মনের ঘৃণা পরকে ঘৃণ্য করে তোলে। মনের বিকারে এমন সুন্দর পৃথিবীর উপর রাগ করে মানুষ আত্মহত্যা করে মরে। আর বেশ্যা? বাবা, চিন্তামণি বেশ্যা—সাধক বিল্বমঙ্গলের প্রেমের গুরু। জান বাবা, বিল্বমঙ্গলের কাহিনী?
নিতাই বিল্বমঙ্গলের কাহিনী জানিত। গ্রামের বাবুদের থিয়েটারে বিল্বমঙ্গল পালা সে দেখিয়াছে। সে বলিল—হ্যাঁ। কাহিনীটা সব তাহার মনে পড়িয়া গেল।
মোহন্ত সস্নেহে বলিলেন—তবে?
নিতাই ফিরিয়া আসিল—অদ্ভুত এক মন লইয়া। ঝুমুর দলের মেয়েগুলি গানবাজনায় নাচে মুরে তালে পারদর্শিনী বলিয়া কবিয়াল নিতাই বাহিরে তাহদের খাতির করিত, কিন্তু মনের গোপন কোণে ঘৃণাই সঞ্চিত ছিল। আজ এই মুহূর্তে সেটুকুও যেন মুছিয়া গেল। মনটা যেন তাহার জুড়াইয়া গিয়াছে। ফিরিবার পথে বার বার তাহার চোখে জল আসিল। কাপড়ের খুঁটে সে চোখ মুছিল-আর মনে মনে বাবাজীকে প্রণাম করিল। মনে মনে সংকল্প করিল গোবিন্দের প্রসাদের সঙ্গে সে বাবাজীর প্রসাদকণাও চাহিয়া লইবে।
ঝুমুর দলের আস্তানায় আসিয়া সে অবাক হইয়া গেল। মনে হইল, এও বুঝি গোবিন্দের রূপা।
আশ্চর্য! আজিকার প্রভাতের এই স্থান ও পাত্র-পাত্রীগুলির রূপের সহিত গতরাত্রির স্থান ও পাত্র-পাত্রীগুলির এতটুকু মিল নাই। সমস্ত স্থানটা গোবরমাটি দিয়া অতি পরিপাটীরূপে নিকাইয়া ফেলা হইয়াছে। গাছতলায় একটি কলার পাতায় অনেকগুলি ফুল, মেয়েগুলি স্নান সারিয়া জলসিক্ত চুল পিঠে এলাইয়া দিয়া শান্তভাবে বসিয়া আছে; সকলের পরনেই লালপাড় শাড়ী—একটি নিবিড় এবং গভীর শান্ত পবিত্রতার আভাস যেন সর্বত্র পরিস্ফুট।
বসন্ত পিছন ফিরিয়া বসিয়া ছিল, নির্মল ও ললিত বসিয়া ছিল এইদিকে মুখ ফিরাইয়া। তাহার অভ্যর্থনা করিয়া বলিল—বেশ মানুষ যা হোক তুমি। এই এত বেলা পর্যন্ত কোথা ছিলে বল দেখি?
বসন্ত মুখ ফিরিয়া চাহিল। নিতাই মৃদু হাসিল। বসন্ত মুখ ফিরাইয়া লইল এবং পরক্ষণেই রান্নাশালে চলিয়া গেল। নিতাই আসিয়া নির্মলা ও ললিতার কাছে বসিয়া বলিল–বাঃ, ভারি ভাল লাগছে কিন্তুক; চারিদিক নিকানে, তোমর সব স্নান করেছ, লালপেড়ে কাপড় পরেছ—
হাসিয়া নির্মলা বলিল—আজ যে লক্ষ্মীপুজো গো দাদা!
—লক্ষ্মীপূজো?
—হ্যাঁ। পূর্ণিমা বেরস্পতিবার, আমাদের বারমেসে লক্ষ্মীপূজো আজ।
নিতাই অবাক হইয়া গেল। এতদিন মেলামেশা করিয়াও এ কথাটা সে জানিত না। ইহাদেরও ধর্মকর্ম আছে। সে প্রশ্ন করিল—কখন হবে লক্ষ্মীপূজো?
—সেই সন্ধ্যেবেলায়। আজ তোমার পালা আরম্ভ হতে সেই ল’টার আগে লয়।
প্রৌঢ়া বলিল—বাবা আমার ভক্তিমন লোক। ভাল লোক।
ললিত বিচিত্র হাসি হাসিয়া বলিল—লোক ভাল, কিন্তু পাল্লা মোগলের। খানা—
প্রৌঢ়া ইঙ্গিত করিয়া বলিল—চুপ।
বসন্ত আসিয়া দাঁড়াইল, তাহার হাতে একটি গ্লাস। গ্লাসটি বাড়াইয়া দিয়া বলিল—লাও।
নিতাই তাহার মুখের দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিল—কি?
মুখ মচকাইয়া বসন বলিল—মদ লয়, ধর!
নিতাই গ্লাসটি লইয়া দেখিল—সদ্য প্রস্তুত ধূমায়িত চা। ললিত হাসিয়া বলিল—বুঝে-মুঝে খেও ভাই জামাই; বশীকরণের ওষুধ দিয়েছে।
বসন্ত চলিয়া যাইতেছিল, সে ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া মুখ বাঁকাইয়া বলিল—আগুন পোড়ারমুখে।
নিতাই হাসিয়া কথাটা নিজের গায়ে লইয়া বলিল—তাই দাও ভাই, কয়লার ময়লা ছুটে যাক। আগুনের পারা বরণ হোক আমার। জান তো?
“আগুনের পরশ পেলে কালো কয়লা রাঙা বরণ।”
ললিত খিলখিল করিয়া হাসিয়া বলিল—যাও কেনে, আগুনের শীষ তো জ্বলছেই, গায়ে গায়ে পরশ নিয়ে আগুন ধরিয়ে নিয়ে এস।
বসন্তের চোখে ছুরির ধার খেলিয়া গেল, কিন্তু পরমুহূর্তে সে হাসিয়া বলিল—মদ জ্বলে দেখেছিস? বলিয়া নিজের দেহখানা দেখাইয়া সে বলিল—এ হ’ল মদের আগুন। বলিয়া সে ঘরের মধ্যে চলিয়া গেল।
নিতাইয়ের মনে পড়িল গত রাত্রির কথা; সে হাসিল। ইহার মধ্যে নিতাই বসন্তের হইয়া গিয়াছে। বসন্ত জানিয়াছে নিতাই তাহার।
