হঠাৎ কানে ঢুকিল–গুণ গুন স্বর।
“কালো যদি মন তবে কেশ পাকিলে কাঁদ কেনে?”—গুনগুন করিয়া অতি মৃদুস্বরে কে গান গাহিতেছে! ওই ঝোপটার আড়ালে; কৃষ্ণচূড়াগাছটির তলায়। মুহূর্তে ভাটার নদীতে যেন ষাঁড়াষাঁড়ির ঘান ডাকিয়া গেল।, ঠাকুরঝি! তাহারই বাঁধা গান গাহিতেছে ঠাকুরঝি। রবার-সোল ক্যাম্বিশের জুতা পায়ে নিঃশব্দে নিতাই আসিয়া তাহার পিছনে দাঁড়াইল এবং অপরূপ মৃদুস্বরে গাহিল,
‘কালো কেশে রাঙা কুসুম হেরেছ কি নয়নে?”
ঠাকুরঝি চমকিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল সচকিত বন্ত কুরঙ্গীর মত–বাবা রে! কে গো?
পরমুহূর্তেই সে বিস্ময়ে নির্বাক হইয়া গেল—কবিয়াল!
নিতাইয়ের মুখ ভরিয়া আবার হাসি ফুটিয়া উঠিল, পরম স্নেহভরে সে ভক্ত অনুরাগিণীটিকে বলিল—এস, চা খেতে হবে একটু!
ঘরে আসিয়া নিতাই চাদরখানি গল হইতে খুলিয়া রাথিতে গেল। কিন্তু বাধা দিয়া ঠাকুরঝি বলিল—খুলো না, খুলো না; দাঁড়াও দেখি ভাল ক’রে!
ভাল করিয়া দেখিয়া ঠাকুরঝি বলিল–আচ্ছা সাজ হইছে বাপু। ঠিক কবিয়াল কবিয়াল লাগছে। ভারি সোন্দর দেখাইছে।
নিতাই বলিল-বাবুরা শিরোপা দিলে চাদরখানা।
—ম্যাডেল? ম্যাডেল দেয় নাই?
—সে আসছে বার দেবে। মেডেল কি দোকানে তৈরী থাকে ঠাকুরঝি!
—ত চাদরখানাও আচ্ছা হইছে। তুমি বুঝি খুব ভাল গায়েন করেছ, লয়?
হাস্যোদ্ভাসিত মুখে কহিল—খুব ভাল। ‘কালো যদি মন্দ তবে’ গানখানাও গেয়ে দিয়েছি।
সঙ্গে সঙ্গে কালো মেয়েটির মুখখানিও কেমন হইয়া গেল; চোখের পাতা দুইটা নামিয়া আসিল। সে দুইটা যেন অসম্ভব বকমের ভারী হইয়া উঠিয়াছে। নত চোখে সে বলিল—না বাপু ছি! কি ধারার নোক তুমি? —
নিতাই হাসিয়া বলিল—দাঁড়াও, দাঁড়াও, ভুলেই গিয়েছিলাম একেবারে।
—কি?
—চোখ বোজ দেখি। তা নইলে হবে না।
—কেন?
—আঃ, বোজই না কোন চোখ। তারপর চোখ খুললেই দেখতে পাবে।
ঠাকুরঝি চোখ বন্ধ করিল; কিন্তু তবু সে তাহারই মধ্যে মিটমিটি চাহিয়া দেখিতেছিল। নিতাই পকেটে হাত পুরিয়াছে।
—উ কি, তুমি দেখছ! নিতাই ঠাকুরঝির চাতুরী ধরিয়া ফেলিল। বোজ, খুব শক্ত করে চোখ বোজ।
পরক্ষণেই ঠাকুরঝি অনুভব করিল তাহার গলায় কি যেন কুপ করিয়ু পড়িল। কি? চকিতে চোখ খুলিয়া ঠাকুরঝি দেখিল, সূতার মত মিহি, সোনার মত ঝকঝকে একগাছি সূতাহার তাহার গলায় তখনও মৃদু মৃদু দুলিতেছে।
ঠাকুরঝি বিস্ময়ে আনন্দে যেন বিবশ ও নির্বাক হইয়া গেল।
—সোনার?
—না, সোনার নয়, কেমিকেলের। সোনার আমি কোথায় পাব বল? আমি গরীব।
ঠাকুরঝির অন্তর তারস্বরে বলিয়া উঠিল—ত হোক, তা হোক, এ সোনার চেয়েও অনেক দামী। হারখানির ছোঁয়ায় বুকের ভিতরটা তাহার থররর করিয়া কাঁপিতেছে, বসন্তদিনে দুপুরের বাতাসে অশ্বখগাছের নূতন কচি পাতার মত।
—ওস্তাদ! ওস্তাদ!
রাজা আসিতেছে; ট্রেনখানা চলিয়া গিয়াছে, ডিউটি সারিয়া রাজা স্টেশনের প্লাটফর্ম হইতে হাঁকিতে হাঁকিতে আদিতেছে।
ঠাকুরঝি চমকিয়া উঠিল, সঙ্গে সঙ্গে নিতাইও চকিত হইয়া উঠিল। মুহূর্তে ঠাকুরকি গলার সূতী-হারখানি খুলিয়া ফেলিল। শঙ্কিত চাপা গলায় বলিল—জামাই আসছে।
নিতাইও যেন কিংকৰ্তব্যবিমূঢ় হইয়া গেল—ত হ’লে?
পরমুহূর্তেই সে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল, তখনও তাহার গলায় চাদর, পায়ে জুতা। খানিকট আগাইয়া গিয়াই সে সবিনয়ে রাজাকে নমস্কার করিয়া বলিল—রাজন, আপনার শরীর কুশল তো?
রাজার চোখ বিস্ময়ে আনন্দে বিস্ফারিত হইয়া উঠিল—আরে, বাপ রে, বাপ রে! গলামে চাদর—
বাধা দিয়া নিতাই বলিল—শিরোপা।
–শিরোপা!
—হাঁ। বাবুরা গান শুনে খুশী হয়ে দিলেন।
–হাঁ?
–হাঁ ।
—আরে, বাপ রে, বাপ রে! রাজা নিতাইকে বুকে জড়াইয়া ধরিল, তারপর বলিল—আও ভাই কবিয়াল, আও।
—কোথায়?
—আরে, আও না। সে তাহার হাত ধরিয়া টানিতে টানিতে লইয়া গেল বণিক মাতুলের চায়ের দোকানে।
—মামা! বনাও চা। লে আও মিঠাই।
বেনে মামাও যুবাক হইয়া গেল নিতাইয়ের পোশাক দেখিয়া। বাতে-পঙ্গু বিপ্ৰপদ অন্যদিকে চাহিয়া বসিয়া ছিল,—আড়ষ্ট দেহখানাকে টানিয়া সে ফিরিয়া চাহিয়া নিতাইকে দেখিল, তাহারও চোখে রাজ্যের বিস্ময় জমিয়া উঠিয়াছে।
নিতাই সবিনয়ে বিপ্ৰপদর পদধূলি লইয়া আজ কতদিন পরে সুপ করিয়া টানিয়া লইল। তারপরে সবিনয়ে হাসিয়া বলিল—চাদরখানা বাবুরা শিরোপা দিলেন প্রভু।
বেনে মামা বলিল–আমাদিগে কিন্তু সন্দেশ খাওয়াতে হবে নিতাই।
–নিশ্চয়। খাও ন মাতুল, সন্দেশ তো তোমার দোকানেই। দাম দেব।
—নেহি, হাম দেঙ্গে দাম। বানাও ঠোঙ্গা। কাঠের একটা প্যাকিং-বাক্স টানিয়া রাজ চাপিয়া বসিল, নিতাইয়ের হাত ধরিয়া টানিয়া পাশের জায়গায় বসাইয়া দিয়া বলিল—বইঠ্ যাও।
এতক্ষণে বিপ্ৰপদ কথা বলিল, সে আজ আর রসিকতা করিল না, ঠাট্টাও করিল না, সপ্রশংস এবং সহৃদয় ভাবেই বলিল—তারপর গাওনা কি রকম হ’ল বল দেখি নিতাই?
নিতাই উৎসাহিত হইয়া উঠিল; বিপ্ৰপদকে আজ জয় করিয়াছে। ইহার অপেক্ষ বড় কিছু সে কল্পনা বা কামনা করিতে পারে না। সে আবার একবার বিপ্ৰপদর পদধূলি লইয়া জোড়হাত করিয়া বলিল—আজ্ঞে প্রভু, গাওনা আপনার চরম। দু’দিকেই দুই বাঘা কবিয়াল— এ বলে আমাকে দেখ ও বলে আমাকে দেখ; একদিকে ছিষ্টিধর, অন্যদিকে মহাদেব। লোকে লোকরণ্যি। তার মেলাও তেমনি।
বেনে মামা ঠোঙায় মিষ্টি ভরিয়া হাতে হাতে দিয়া বলিল—খেতে খেতে গল্প হোক। খেতে খেতে! সকলকে ঠোঙা দিয়া সে নিতাইয়ের ঠোঙাটি অগ্রসর করিয়া ধরিল। কিন্তু নিতাইয়ের অবসর নাই—কথার সঙ্গে তাহার হাত দুইটিও নানা ভঙ্গিতে নড়িতেছে।
বিপ্ৰপদ ও এতক্ষণে ধীরে ধীরে সহজ হইয়া উঠিয়াছে, সে চট করিয়া বেনে মামার হাত হইতে ঠোঙাটি লইয়া ধমক দিয়া উঠিল—ভাগ বেট বেরসিক কাহাঁকা! কবিরা সন্দেশ খায় কোন্ কালে? কবিরা চাদের আলো খায়, ফুলের মধু খায়, কোকিলের গান খায়। তারপর নিতাইকে সম্বোধন করিয়া বলিল—হ্যাঁ, তারপর নিতাইচরণ? একদিকে ছিষ্টিধর, একদিকে মহাদেব। লোকে লোকারণ্যি! তারপর? বলিয়া সে দুইহাতে ঠোঙা ধরিয়া মিষ্টি খাইতে আরম্ভ করিল।
নিতাইয়ের উৎসাহ কিন্তু উহাতে দমিত হইল না। সে সমান উৎসাহেই বলিয়া গেল— একদিন, বুঝলে প্রভু, মহাদেবের নেশাটা খানিকট বেশী হয়ে গিয়েছিল। সেদিন—মহাদেব হয়েছে কেষ্ট, ছিষ্টিধর রাধা। ছিষ্টিধর তো ধুয়ো ধরলে—“কালো টিকেয় আগুন লেগেছে— তোরা দেখে যা গো সাধের কালাচাঁদ।” গালাগালির চরম করে গেল। ওদিকে মহাদেব তখন বমি করছে। দোয়াররা সব মাথায় জল ঢালছে। আমি সেই ফাঁকে এসে ধরে দিলাম ধুয়ে —“কালো যদি মন তবে কেশ পাকিলে কাদ কেনে?” বাস, বুঝলেন প্রভূ, বাবুভাই থেকে আরম্ভ করেসে একেবারে ‘বলিহারি, বলিহারি’ রব উঠে গেল। সঙ্গে সঙ্গে শিরোপা এই চাদরখানা গলার ওপরে বীপাং করে এসে পড়ল।
কথাটা সত্য। নিতাই ধুয়াটা ধরিয়াছিল এবং লোকে সত্যই ভাল বলিয়াছে, কিন্তু শিরোপার কথাটা ঠিক নয়।
তবে শিরোপা পাইলে অন্যায় হইত না। নিতাই মেলায় গাওনা করিয়াছে ভালো। তার সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর এবং বিচিত্র বিচার-দৃষ্টি একটা নূতন স্বাদের সৃষ্টি করিয়াছিল। সত্যই তো— কালো যদি মন্দই হইবে—তবে কালো চুলে সাদা রঙ ধরিলে—মন তোমার উদাস হইয় ওঠে কেন? নিতাই বার বার এই প্রশ্নটির জবাব চাহিয়াছিল। ছিষ্টিধর খ্যাতিমান কবিয়াল–সে মানুষকে জানে এবং চেনে–সে এ প্রশ্নের জবাব রসিকতা করিয়া উড়াইয়া দিতে চাহিয়াছিল। গাহিয়াছিল—
