“সংসারে যে সহ্য করে সেই মহাশয়।
ক্ষমার সমান ধর্ম কোন ধর্ম নয়॥”
কবিতা আওড়াইয়া নিতাই বলিল—বুঝলে রাজন, ক্ষমা করেছি আমি। একে ব্রাহ্মণ, তার রোগা লোক, তার উপর মূর্খ, ওকে আমি ক্ষমা করেছি।
রাজন মুগ্ধ হইয়া গেল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া সে বলিল—সাদা বাংলায় বলিল— ভালই করেছ ওস্তাদ। তারপরই সে আবার বলিল—তাহলে কি করবে ওস্তাদ? একটা কিছু করা তো চাই ভাই। পেটের তুল্য অনবুঝ তো নাই সংসারে।
—আমি একটা দোকান করব ওস্তাদ।
—দোকান?
—হ্যাঁ, দোকান। বিড়ির দোকান, নিজেই বিড়ি বাঁধব, আর ইস্টশানের বটতলায় বসে বেচব। দু-এক বাক্স সিগারেটও রাখব।
রাজন উৎসাহিত হইয়া উঠিল—বহুৎ আচ্ছ, বহুৎ আচ্ছা হোগা ওস্তাদ! নিতাই কিন্তু এবার একটু মানভাবেই বলিল—বণিক মাতুল একটু রুষ্ট হবে আমার ওপর। কিন্তু—
—কেয়া কিন্তু? উ গোসা করনেসে কেয়া হোগা? জান্তি ভাত খায়েগা আপনা ঘরমে!
—ন রাজন। কারও ক্ষতি করতে আমার ইচ্ছা নাই। তা ছাড়া আমার হাতের পান, চা, জল এ তে কেউ থাবে না। বলিতে বলিতেই সে উৎফুল্ল হইয়া উঠিল –আচ্ছা রাজন, বাঁশ কিনে যদি মোড় সাজি বেশ শৌধীন করে তৈরি করি, তা’হলে কেমন হয়?
—উ সব্সে আচ্ছা!
–কিন্তু বিপ্ৰপদ বলবে কি জানো? ডোমবৃত্তির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলবে—বেটা ডোম!
দাঁতে দাঁত ঘষিয়া রাজন বলিল—একদিন ঠেসে কান দুটো মলে দেবো বেটা বামুনের।
–না। না। না। হাজার হ’লেও ব্রাহ্মণ! রাজন, “ব্রাহ্মণ সামান্য নয়, ব্রাহ্মণে করিলে ক্রোধ হইবে প্রলয়।” শাস্ত্রের কথা ভাই। তা ছাড়া—
রাজা বাধা দিয়া বলিল—ধ্যে-ৎ! ব্রাহ্মন! সাতশো ব্রাহ্মন একঠো বক-পাখীকা ঠ্যাং ভাঙনে নেহি শকতা হ্যায়! ব্রাহ্মন?
নিতাই হাসিয়া বলিল—না-না-না। বলুক ডোম! ডোমেই বা লজ্জা কি? ডোমই বা ছোট কিসে? ডোমও মানুষ বামুনও মানুষ!
—বাস—বাস—বাস! কেয়া হরজ্। বলনে দেও ডোম। রাজনেরও আর কোন আপত্তি রহিল না।–বহুত আচ্ছা কাম, দোকান লাগাও, আওর একঠো সাদী করে ওস্তাদ! সন্সার পাতাও।
তাচ্ছিল্যের সহিত ঠোঁট উন্টাইয়া নিতাই বলিল-দূর!
—দূর কেঁও ভাই? উ হাম নেহি শুনেগা।
—আচ্ছা তার আগে একটা কাহিনী বলি শোন।
কাহিনীতে রাজনের পরম অনুরাগ, সে বিড়ি ধরাইয়া জাঁকিয়া বসিল। নিতাই আরম্ভ করিল লেজকাটা শেয়ালের গল্প। গল্প শেষ করিয়া নিতাই বলিল—তুমি লেজ কেটেছ ব’লে আমি লেজ কাটছি না রাজন!
রাজা প্রথমে অবশ্য খানিকট হাসিল, তারপর কিন্তু বলিল—উ বাত তুমারা ঠিক নেহী হ্যায়। সন্সারমে আয়কে সাদী নেহি করেগা তো কেয়া করেগা?
নিতাই এবার বলিল—তুমি ক্ষেপেছ রাজন! বিয়ে করে বিপদে পড়ব শেষে! আমাদের জাতের মেয়ে কখনও বিদ্যের মর্ম বোঝে?—কেবলই খ্যাচ-থ্যাচ করবে দিনরাত। তা ছাড়া ধরগা তোমার—; কথা শেষ হইবার পূর্বেই নিতাই ফিক করিয়া হাসিয়া ফেলিল।
ভ্ৰ নাচাইয়া রাজা প্রশ্ন করিল—উ কেয়া বাত ওস্তাদ? ফিক করকে হাঁসতা কেঁউ?
—হাসবো না? তোমার, তেমন মনে-ধরা কনেই বা কোথায় হে? বেশ মৃদু হাসিয়া নিতাই বলিল—আমরা হলাম কবিয়াল লোক। আমাদের চোখ তো যাতে-তাতে ধরবে না রাজন!
রাজা এবার হাসিয়া গড়াইরা পড়িল। রাজার উচ্চহাসি উৎকট এবং বিকট। রাজার সে হাসি কিন্তু অকস্মাৎ আবার বন্ধ হইয়া গেল। গম্ভীর হইয়া সে বার বার ঘাড়, নাডিয়া এই সত্যকে স্বীকার করিয়াই বলিল—ঠিক বাত ওস্তাদ, ঠিক বাত বোলা হ্যায় ভাই। লঢ়াইমে গিয়া, দেখা, আ-হ-হ একদম ফুলকে মাফিক জেনানা। ইরাণী দেখা হ্যায় ওস্তাদ, ইরাণী? ওইস, লেকিন উস্সে তাজা।
রাজার কথা ফুরাইয়া গেল, কিন্তু স্মতির ছবি ফুরাইল না। সে উদাস দৃষ্টিতে জানালার ভিতর দিয়া চাহিয়া রহিল বিস্তীর্ণ কৃষিক্ষেত্রের দিকে। যেন বসরার সেই রূপসীদের শোভা— ওই ধূ-ধূ করা কৃষিক্ষেত্রে ভাসিয়া উঠিয়াছে। নিতাইও চাহিয়া ছিল জানালার ভিতর দিয়া, রেললাইনের সমান্যরাল শাণিত দীপ্ত দীর্ঘ রেখা দুইটি বাকের মুখে যেখানে একটি বিন্দুতে এক হইয়া মিলিয়া গিয়ছে, সেই বিন্দুটির দিকে। সহসা একসময় সেই বিন্দুটির উপর জাগিয়া উঠিল চলন্ত সাদা কাশফুলের মত একটি রেখা, রেখাটির মাথায় একটি স্বর্ণবিন্দু, যেন ঝকমক করিয়া উঠিতেছে মুহূর্তে মুহূর্তে চকিতে চকিতে একটি ছটা চুটিয়া আসিতেছে।
তাহাদের এই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিল রাজার স্ত্রীর তীক্ষ উচ্চ কণ্ঠ। রাজার স্ত্রী চীৎকার করিতেছে। রাজা এখানে বসির আড্ডা দিতেছে, তাই সে আপনার অদৃষ্টকে উপলক্ষ্য রাখিয়া, রাজাকে লক্ষ্য করিয়া বাছিয়া বাছিয়া শাণিত বাক্যবাণ নিক্ষেপ করিতেছে।
—ছি রে, চি রে আমার আদেষ্ট! সকালবেলা থেকে বেলা দোপর পর্যন্ত মানুষের ঘর ব’লে মনে থাকে না। অদেষ্টে আমার আগুন লাগুক, পাথর মেরে এমন নেকনকে (কপালকে) ভেঙে কুচিকুচি করি আমি।
রাজার মুখখানা ভীষণ হইয়া উঠিল, সে উঠিয়া পড়িল। নিতাই শঙ্কিত হইয়া বলিল— কোথা যাচ্ছ?
—আতা হ্যায়। আভি আতা হ্যায়। সে চলিয়া গেল।
—রাজন! রাজন! নিতাই পিছন পিছন আসিয়া দুয়ারে দাঁড়াইয়া রহিল। কিছুক্ষণ পরই রাজা ফিরিল সেই উচ্চহাসি হাসিতে হাসিতে। হাসিয়া সে মাটির উপর গুইয়া পড়িল। নিতাই প্রশ্ন করিল—হ’ল কি?
রাজার হাসিতে মুহূর্তের জন্য ছেদও পড়ে না এবং এমন টানা হাসির মধ্যে কথাও বলা যায় না। তবুও বহুকষ্টে রাজা বলিল—ভাগ হ্যায়। মাঠে মাঠে—। সঙ্গে সঙ্গে সেই উৎকট উচ্চহালি।
নিতাই বুঝিল। গালিগালাজ-মুখরা রাজার স্ত্রী রুদ্র মূর্তিতে রাজাকে আসিতে দেখিয়াই বিপরীত দিকের দরজা দিয়া বাহির হইয়া ছুটিয়া পলাইয়াছে। রাজা উঠিয়া দাঁড়াইয়া, ফিরিয়া দেখার অভিনয় করিয়া বলিল, এইসা করকে দেখ্তা; হাম এক পাঁও গিয়া তো ফিন দৌড় লাগায়। অর্থাৎ রাজাকে এক পা অগ্রসর হইতে দেখিলেই সে দৌড় দিয়াছে, আবার কিছুদূর গিয়া ফিরিয়া দেখিয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে রাজা আর এক পা বাড়াইয়াছে, দৌড়িয়া যাইবার ভঙ্গি করিয়াছে, অমনি রাজার বউও ছুটিয়া পলাইয়াছে। রাজার কিলকে তাহার বড় ভয়। বলিতে বলিতে রাজা আবার হাসিয়া গড়াইয়া পড়িল।
এই মুহূর্তটিতেই বাড়ীর মধ্যে আসিয়া প্রবেশ করিল সেই ঠাকুরঝি। পরনে সেই ক্ষারে ধোয়া ধবধবে মোটা সূতার খাটো কাপড়, মাথায় পরিচ্ছন্ন মাজ পিতলের ঘটী। দ্বিপ্রহরের রৌদ্রে সেটি সোনার মত ঝকঝক করিতেছে।
নিতাই সাদরে আহবান করিল—এস ঠাকুরঝি, এস!
ঠাকুরঝি রাজাকে এমনভাবে হাসিতে দেখিয়া বিপুল কৌতুক অনুভব করিল। সকৌতুকে সে রাজার দিকে আঙ্গুল দেখাইয়া নিতাইকে প্রশ্ন করিল তাহার স্বভাবগত বাচন ভঙ্গিতে—এই, এই, জামাই এত হাসছে কেনে?
—শুধাও ভাই জামাইকে। নিতাই হাসিল।
—অ্যাই! অ্যাই! ই কি হাসি গো! এমন ক’রে হাসছ কেনে গো জামাই? সঙ্গে সঙ্গে হাসির ছোঁয়াচ তাহাকেও লাগিয়া গেল। সেও হাসিতে আরম্ভ করিল—হি-হি-হি। হি-হি-হি। অত্যন্ত দ্রুত মৃদু ধাতব ঝঙ্কারের মত হাসি।
রাজার হাসি অকস্মাৎ থামিয়া গেল। তাহার দিকে আঙ্গুল দেখাইয়া হাসার জন্য সে ভীষণ চটিয়া উঠিয়াছে। তাহার মনে হইল মেয়েটা তাহাকে ব্যঙ্গ করিতেছে। ভীষণ চটিয়া রাজা ধমক দিয়া উঠিল—অ্যাও! .
ধমক থাইয়া মেয়েটির হাসি বাড়িয়া গেল।
রাজা বলিল–আলকাতরার মত রঙ, সাদা দাত বের করে হসছে দেখ! লজ্জা নাই তোর?
এবার মেয়েটি যেন মার খাইয় স্তব্ধ হইয়া গেল। কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ থাকিরা অত্যন্ত ব্যস্তভা প্রকাশ করিয়া সে বলিল–লাও বাপু, দুধ লাও! আমার দেরি হয়ে গেল। গেরস্ততে বকবে।
রাজা বলিল—তোকেও একদিন ঠাঙানি দিতে হবে দেখছি। দিদির মত মাঠে মাঠে—? আবার সে হাসিতে আরম্ভ করিল।
ঠাকুরঝি কিন্তু এবার হাসিল না। সে নীরবে নতমুখে ঘটী হইতে মাপের মাসে দুধ ঢালিয়া গ্লাসটি পরিপূর্ণ করিয়া ধরিয়া আবার তাগাদ দিল—কই গো, কড়াই পাত।
নিতাই ব্যস্ত হইয়া দুধের কড়াটি পাতিয়া দিয়া বলিল—রাগ করলে ঠাকুরঝি? না না, রাগ ক’রো না।
ঠাকুরঝি উত্তর দিল না, মাপা দুধ ঢালিয়া দিয়া সে নীরবেই চলিয়া গেল। পিছন হইতে রাজা এবার রসিকতা করিয়া বলিল—ও, ঠাকুরঝি আমার ডাকগাড়ি গেল। বাবা রে, বাবা রে, ছুটেছে! পোঁ—ভস-ভস ভস-ভস। বাবা রে।
ঠাকুরঝি কিন্তু ফিরিয়াও চাহিল না।
নিতাই বলিল—না রাজন, এ-প্রকার বাক্য বলা তোমার উচিত হ’ল না।
কিন্তু রাজা সে কথা স্বীকার করিল না। কিসের অনুচিত? সে ফুৎকারে আপনার অন্যায় উড়াইয়া দিল—ধে-ৎ!ত
সঙ্গে সঙ্গেই সে উঠিয়া পড়িল। দেড়টার গাড়ীর ঘণ্টা দিতে হইবে। এই সময়টি নির্ণয়ে ঠাকুরঝি তাহার সিগনাল। ঠাকুরঝি দুধ দিয়া গ্রামে গেলেই সে স্টেশনের দিকে রওনা হয়, মধ্যপথেই শুনিতে পায় মাস্টার হাঁকিতেছে—রাজা!
রাজা নিত্য সাড়া দেয়, আজও দিল—হাজির হ্যায় হুজুর।
