সে কলকাতার বড় বড় সাহেব-ডাক্তারের নাম নিয়ে এ অঞ্চলের ডাক্তারদের নামকরণ করেছিল।
জীবন দত্তের নাম দিয়েছিল—ডাক্তার বার্ড।
হরিশ ডাক্তারকে বলত ডাক্তার ম্যানার্ড।
শশীকে বলত–লিউকিস।
নতুন ডাক্তার এসেছিল হাসপাতালে কলকাতার মিত্তিরবাড়ির ছেলে, তাকে বলত-ডাঃ ব্রাউন!
সীতারামের এই রসিকতা সেকালে ভারি পছন্দ হয়েছিল লোকের। ডাক্তারেরা নিজেরাও হাসতেন এবং মেজাজ খুশি থাকলে পরস্পরকে এই নামে ডেকে রসিকতা করতেন।
এতকাল পরে সেই নাম? বিস্মিত হল শশী। কিন্তু এই নামে সেকালে ডাকলে যে উত্তর সে দিত সেই উত্তরটি দিতে ভুল হল না তার। ঘাড়টা একটু ঘেঁট করে সায়েবি ভঙ্গিতে সে বললে–ইয়েস স্যার!
জীবনমশায় বললেন–সে আমলটা বড় সুখেই গিয়েছে, কী বলিস শশী?
—ওঃ, তার আর কথা আছে গো! সে একেবারে সত্যযুগ।
হেসে ফেললেন ডাক্তার। শশীর সবই একেবারে চরম এবং চূড়ান্ত। ভাল তো তার থেকে। ভাল হয় না, মন্দ তো–একেবারে মন্দ। হয় বৈকুণ্ঠ নয় নরক।
তারপরই শশী বললে–সীতারাম বেটা শাপভ্রষ্ট দেবতা ছিল, বুঝলেন? তাহঠাৎ সীতারামকে মনে পড়ল ডাক্তারবাবু?
–নাঃ। তার নামটা মনে পড়ে গেল। আমি জিজ্ঞেস করছিলাম রামহরির কথা।
–বললাম তো বেটার অবস্থা আজকে খারাপ, বোধহয় অনিয়ম-টনিয়ম করেছে। তা শুধাবার তো উপায় নাই। মারতে আসবে বেটা। বলে মারার চেয়ে তো গাল নাই, মরতে তো বসেইছি, না খেয়ে মরব কেন, খেয়েই মরব।
—সে তো গিয়েই দেখব রে। আমি শুধাচ্ছি ব্যাপারটা কী বল দেখি, মানে নতুন বিয়ে করে
মশায়ের কথার মাঝখানে তাচ্ছিল্যভরে শশী বলে উঠল—বেটার মতিগতি কী রকম পালটেছে আর কি!
—হুঁ। রামহরির এই স্ত্রীটি বোধহয় খুব ধার্মিক মেয়ে, দেখতেও বোধহয় খুব সুন্দরী?
শশী একটু ভেবেচিন্তে বললে—তাই বোধহয় হবে।
–হুঁ! ডাক্তার স্মিতহাস্য প্রসন্ন মুখে আবার আকাশের দিকে চোখ তুললেন।
নবগ্রামের বাজার সম্মুখে।
ডাক্তার বললেন–বাইরে বাইরে চল বাবা মাঠের পথে। ভিড় ভাল লাগে না।
২২. মাঠের পথেই গাড়ি ভাল
মাঠের পথেই গাড়ি ভাল।
জীবনমশায় এবার একটু দেহ এলিয়ে শুয়ে পড়লেন। শশী বললে—তাই গড়ান একটু। আমি হেঁটেই চলি। আঃ! এ সময় একটু বিশ্রাম না করলে চলবে না। এ সময়টায় জীবনে বোধ করি কখনই তিনি বের হন নি। কোনো ডাক্তারই যায় না। ডাক্তারেরাও তো মানুষ।
অনাবৃষ্টির শেষ শ্রাবণের দুপুরবেলা; মেঘাচ্ছন্নতা রয়েছে, বৃষ্টি নাই। মাঠ শুকনো না হোক, অনাবাদি পড়ে রয়েছে। ফসল নাই কিন্তু আগাছা বেড়েছে। মাঠের এখানে ওখানে বাঁশ উঁচু হয়ে রয়েছে। পুকুর থেকে দুনি করে জল তুলে চাষ করছে উদ্যোগী চাষীরা। একেবারে সব থেকে নিচু মাঠে চাষ চলছে। সেখানে মানুষ গরুর মেলা বসে গেছে, গাড়িখানা চলেছে উঁচু মাঠের মাঝখান দিয়ে, দু-চার জন চাষী এখানে কায়ক্লেশে কাজ চালাচ্ছে। দেশে শস্য নাই, আকাশে মেঘ দুর্লভ, মেঘ যদি আসে তাতে বৃষ্টি আরও সুদুর্লভ। বৃষ্টি হলে রোগটা কম হয়। এ তিনি ভাল করে লক্ষ্য করেছেন—যেবার বৃষ্টি ভাল হয়—সেবার ম্যালেরিয়া অন্তত কম হবেই। কত আবিষ্কার হল; মশা ম্যালেরিয়ার বীজ বয়ে নিয়ে বেড়ায়; কলেরার বীজাণু জলের মধ্যে বাড়ে, খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে মানুষকে আক্রমণ করে মাছিতে বয়ে নিয়ে বেড়ায়, ছড়ায়; কলেরার টিকা আবিষ্কার হল; কালাজ্বরের চেহারা ধরা পড়ল; কত কত রোগ আবিষ্কার। হ্যাঁ, দেখে গেলেন। বটে। সাধ অবশ্য মিটল না; বড় একজন চিকিৎসক হয়ে এর তত্ত্ব-তথ্য পুরো দেখা এবং বুঝে ওঠা ঘটল না, শুনলেন বিশ্বাস করে গেলেন—কার্য-কারণের রহস্য দেখবার দিব্যদৃষ্টি লাভ হল না এ জন্মে—তবুও অনেক, অনেক দেখে গেলেন। একটি সাধ হয় মধ্যে মধ্যে—অণুবীক্ষণ যন্ত্রে বীজাণুগুলিকে চোখে দেখা যায় তাদের বিচিত্র চেহারা বিচিত্র ভঙ্গি—সেই দেখবার ইচ্ছা হয়, আর ইচ্ছে হয় এক্স-রে করানো যখন হয় তখনকার ব্যাপারটা। মানুষের রূপময় দেহ অদৃশ্য হয়ে যায় দেখা যায় কঙ্কাল-অন্ত্রপাতির ক্ষত। মতির মায়ের পায়ের এক্স-রের প্লেটটা একবার দেখতে তার ইচ্ছে হয়।
হঠাৎ জীবন মশায়ের চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয়ে গেল। শশী হাত নেড়ে ও কী করছে?
কাকে ও যেন ইশারা করছে। কে? কাকে?
—কে রে শশী?
–আজ্ঞে?
–কাকে কী বলছিস হাত নেড়ে?
–পুতকী আর মাছির বাচ্ছা গো। অ্যাঁকের মত উড়ছে মুখের চারিপাশে। বর্ষাতে বৃষ্টিবাদলের নাম নাই, এ বেটাদের পঙ্গপাল ঠিক আছে, বেড়েছে—এ বছর বেড়েছে। শশী বার বার শূন্যমণ্ডলে হস্ততাড়না শুরু করলে।
—গাড়িতে উঠে আয়।
–এই তো—আর এসে পড়েছি। সামনেই তো ডাঙাটা। ডাঙাতে এ আপদ থাকবে না।
সামনেই মস্ত বড় উঁচু টিলা। টিলার ওপারেই ঢালের উপর গলাইচণ্ডী ঢুকবার মুখেই রামহরির বাড়ি। এখন আখড়া। সিধে লাল রাস্তা চলে গিয়ে বেঁকেছে। একজন সাইকেল আরোহী চলেছে। পাড়ার্গায়েও আজ সাইকেল হয়েছে। দু-চারখানা পাওয়া যাবেই; মশায়ের জীবনে একসময় দুটো ঘোড়া এসেছিল—তারপর গরুরগাড়িতেই যাত্রা শেষ করলেন।
প্রদ্যোতের সঙ্গে পারবার তাঁর কথা নয়। হাসলেন ডাক্তার। প্রদ্যোত ডাক্তার নাকি মোটর কিনবে। অন্ততপক্ষে মোটর সাইকেল। চার ঘণ্টায় বিশ মাইল পথ সদর গিয়ে আবার ঘুরে আসবে।
লোক ছুটে আসছে। গাড়ি দেখে থমকে দাঁড়িয়ে বললে—শিগগির আসুন।
***
রামহরির বাড়ির দরজায় কজন শুকমুখে দাঁড়িয়ে আছে।
