–রইল পাঁচ টাকা।
–পাঁচ টাকায় কী হবে?
–না। আর দেব না। কিছুতেই দেব না।
–ভাল।
জামাটা টেনে নিয়ে পাঁচটা টাকার নোটটাও ফেলে দিলেন। তারপর জামাটা গায়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল ছেলে বনবিহারী, নতুন বাইসিক্ল হাতে নিয়ে বাপের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে, মেলা দেখতে যাবে, টাকা চাই। গায়ে ডবলব্ৰেস্ট কোট, পায়ে পাম্পসু। বনবিহারী বাবুদের ছেলেদের সমান বিলাসী। চাকর ইন্দির দাঁড়িয়ে, নন্দ তখন ছেলেমানুষ, সেও দাঁড়িয়ে, তারা জানে—মশায় মেলার সময় বকশিশ দেবেন। সকলের দিকে তাকিয়ে যেন আগুন জ্বলে গেল। আতর-বউ পাঁচ টাকার নোটখানা কুড়িয়ে নিয়ে ছেলের হাতে দিলেন। জীবনমশায় বললেন–ইন্দির, আমার সঙ্গে আয়।
তিনি ভুলে গেলেন–হরিশের ছেলের অসুখের কথা। শুনেছিলেন, ছেলেটির অসুখ করেছে। গত রাত্রে হরিশকে নিমন্ত্ৰণ পাঠিয়েছিলেন খাওয়ার জন্য; হরিশ আসতে পারে নি, লিখেছিল–ছেলেটার হঠাৎ কম্প দিয়া জ্বর আসিয়াছে। মেয়েরা ভয় পাইতেছে, যাইতে পারিলাম না। জীবনমশায় ভেবেছিলেন একবার খোঁজ নেবেন। কিন্তু উদ্ভ্রান্ত হয়ে ভুলে গেলেন। নবগ্রামে সাহাদের মদের দোকানে এসে সাহাকে ডেকে বললেন–পঞ্চাশটা টাকা চাই সাহা।
সাহা শুধু মদের দোকানই করত না, টাকা দাদনেরও কারবার করত, সাধারণকে টাকা দিত গহনার উপর, সম্মানী ব্যক্তিকে হ্যান্ডনোট।
অবাক হয়ে গেল সাহা—মশায়ের টাকা চাই।
চাই। কাল-পরশু চেয়ে নিস। আন টাকা। বিনা বাক্যব্যয়ে সাহা টাকা এনে তার হাতে তুলে দিলে। কোনো স্মরণচিহ্ন চাইলে না।
টাকা নিয়ে ইন্দিরকে দুটো টাকা দিয়ে বাকি টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন—মেলা। মেলা ঘুরে গিয়ে বসেছিলেন জুয়োর আসরে। রাত্রি তখন আটটা। বসে গেলেন জুয়োর আসরে। মনে। মনে সেদিন কী বাজি রেখেছিলেন মনে নেই। বোধহয় এক বছরের মধ্যে তিনি যদি মরেন, তবে তিনি জিতবেন।
দশটার সময় ছুটে এসেছিল—এই শশী। শশী তখন হরিশের অধীনে চ্যারিটেবল ডিসপেনসারির কম্পাউন্ডার। তার মেলাতে থাকারই কথা, কিন্তু হরিশের ছেলের অসুখের জন্য। আসতে পারে নি। ছেলের অবস্থা সংশয়াপন্ন; ওদিকে হরিশের হাতের রোগী নোটন গড়াঞীর। পুত্রবধূ মালিশ খেয়ে বসে আছে। ভুল হরিশের। ছেলের অসুখ; বিভ্রান্তমস্তিষ্ক হরিশ মালিশের শিশি দিয়ে বলেছে—এইটে খাবার।
–এখুনি চলুন আপনি।
উঠেছিলেন তাই, তখন কেঁচার খুঁটে গোটা বিশেক টাকা অবশিষ্ট, ডাক্তার উঠেই টাকা। কটা গোছ করে জাহাজের ঘরে বসিয়ে দিয়ে বলেছিলেন সই! জাহাজ ডোবে তো গেল, ওঠে। তোে রেখে দিয়ো-কাল নেব।
জাহাজ ড়ুববে, অর্থাৎ তিনি হারবেন সে তিনি জানতেন। অর্থাৎ তিনি মরবেন না এক বছরের মধ্যে। অনেক দেখতে হবে তাঁকে। এখন হরিশের ছেলেকে দেখতে হবে, চল।
যেতে যেতে হরিশের ছেলে শেষ হয়ে গিয়েছিল। জীবন মশায়কে দেখে বুক চাপড়ে কেঁদে উঠেছিল হরিশ।জীবন! এ কী হল আমার! জীবন! তুমি যদি সকালে একবার আসতে ভাই, তবে হয়ত বাচত আমার ছেলে।
জীবনমশায় মৃদু তিরস্কার করেছিলেন হরিশকে—তুমি না ডাক্তার হরিশ! ছি! তোমার তো এমন অধীর হওয়া সাজে না। অন্যহনি ভূতানি গচ্ছন্তি যমমন্দির এ কথা জানেন যিনি নিয়ন্তা তিনি, আর জানেন তত্ত্বজ্ঞানী—আর এ সমস্ত না বুঝেও এ কথা তো ডাক্তারের অজানা নয়। চুপ কর। মেয়েদের সান্ত্বনা দাও। আমি যাই গড়ীর বাড়ি।
মুহূর্তে হরিশের শোকের উচ্ছ্বাস স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
গড়াঞীর বাড়ির সামনে তখন নানা গবেষণা চলছে। হরিশের ভাগ্য ভাল; সময়টা মেলার। লোকজন সবই গিয়েছে মেলায়। নইলে এতক্ষণ হরিশের বিরুদ্ধে থানায় ডায়রি হয়ে যেত। জীবনমশায় এসে বসলেন। প্রথমেই শিশিটা হস্তগত করে পকেটে পুরলেন। তারপর নাড়ি। ধরলেন। বিষের ক্রিয়ার লক্ষণ রয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন করলেন-ওষুধটা সবটা খেয়েছে? পেটে গিয়েছে? যায় নি। ঋজালো ওষুধ রোগী বমি করে ফেলে দিয়েছে। ভয় নাই। শশীকে। বললেন––ডিসপেনসারিতে স্টমাক-পাম্প আছে—নিয়ে আয়।
সেই রাতেই রাত বারটায় খোকা চাটুজ্জে এসে পড়ল—মশায় রক্ষা করুন। আমার বোন নলিনী গলায় দড়ি দিয়েছে।
চিকিৎসার জন্য খোকা চাটুজ্জে তাকে ডাকে নি। অন্য কারণে ডেকেছিল।
জীবনমশায় প্রেসিডেন্ট পঞ্চায়েত। তিনিই পারেন পুলিশ-লাঞ্ছনার হাত হতে বাঁচাতে। তা তিনি বাঁচিয়েছিলেন। গড়াঞীর পুত্রবধূর পেটের মালিশ বমি করিয়ে বের করে মরণের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নতুন ওষুধ দিয়ে রাত্রি আড়াইটার সময় থোকা চাটুজ্জের বাড়ি এসে বাইরের দাওয়ার উপর বসলেন। রিপোর্ট লিখে বললেন, শ্মশানে নেবার ব্যবস্থা কর। আমি রয়েছি।
সেতাবকে বললেন–দাবার ছক খুঁটি আন সেতাব। শুধু তো বসে থাকা যায় না। পাত, ছক পাত।
সব মনে পড়ছে। মনে আছে সবই; মনে পড়ালেই মনে পড়ে। সেদিন রাত্রি চারটে পর্যন্ত দাবা খেলেছিলেন-বাজির পর বাজি জিতেছিলেন। সেতাব বলেছিল—তোর এখন চরম ভাল সময় রে জীবন! ডাঙায় নৌকো চলছে।
তাঁরই তাই মনে হয়েছিল। কিন্তু–!
হঠাৎ আটকে গেল নৌকো।
এই মেলার পরই কিন্তু বনবিহারী প্রমেহ রোগে আক্রান্ত হল। শুনলেন মেলায় সে নাকি মদও খেয়েছিল।
ডাঙায় চলমান নৌকাটা আটকেই শেষ হয় নি, অকস্মাৎ মাটির বুকের মধ্যেই ড়ুবে গেল।
জীবনমশায় ছেলে বনবিহারীকে ডেকে বলেছিলেন, ছিছিছি। বনবিহারী মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সে নতমুখে তার কঠিন ক্রোধ ফুটে উঠেছিল। জীবনমশায় বলেছিলেন বংশের ধারাকে যে কলুষিত করে সে কুলাঙ্গার। বাপ লজ্জা পায়, মা লজ্জা পায়, ঊর্ধ্বতন চতুর্দশ পুরুষ শিউরে ওঠেন পরলোকের সমাজে তাদের মাথা হেট হয়! জানতে পারেন নি, দরজার ওপাশে কখন আতর-বউ এসে কান পেতে দাঁড়িয়েছেন। তিনি সেই মুহূর্তেই ঘরে ঢুকে বলেছিলেন—একটা ভুলের জন্য এত বড় কথা বললে তুমি ওকে? আমার গর্ভের দোষ দিলে! চৌদ্দ পুরুষের মাথা হেঁট করেছে বললে? তুমি লজ্জা পেয়েছ বললে! তুমি নিজের কথা ভেবে দেখে কথাটা বলেছ? নিজে তুমি কর নি? ও হয়ত সঙ্গদোষে কোনো ভ্ৰষ্টার পাল্লায় পড়ে একটা ভুল করে ফেলেছে। কিন্তু তুমি? মঞ্জরীর জন্যে তুমি কী কাণ্ডটা করেছিলে—মনে পড়ে না?
