চায়ের বরাত করে তামাকের টিকে ধরিয়ে নিয়ে দাবায় বসলেন দুজনে। খেলাটা হঠাৎ যেন। জমে উঠল। সেতাবের মন্ত্রীটা ধাঁ করে মেরে বসলেন মশায়। ওদিকে আকাশে মেঘও বেশ জমেছে, বৃষ্টিও বেশ সুর ধরেছে; ঝিপঝিপ করে বৃষ্টি নেমেছে, বৃষ্টি খানিকটা হবে বলে মনে হচ্ছে। নীরবেই খেলা চলছিল, সেতাব মুখুজ্জে বললেন–ভিতরে চল জীবন—গা শিরশির করছে।
–শিরশির করছে? কেন রে? আমার তো বেশ আরাম বোধ হচ্ছে।
–তোমার কথা আলাদা। এত চর্বিতে শীত লাগে কখনো? আমার শরীরটাও ভাল নাই।
–জ্বর হয় নি তো? দেখি হাত?
–না, হাত দেখতে হবে না। ওই তোর বাতিক। আমি নিজেও জানি হাত দেখতে। দেখেছি নাড়ি গরম একটু হয়েছে। ও কিছু নয়; চল ভেতরে চল। সেতাব সরিয়ে নিলেন। হাতখানা।
ডাক্তার কিন্তু ছাড়লেন না, হাত বাড়িয়ে একরকম জোর করে সেতাবের হাতখানা টেনে নিলেন। হ্যাঁ, বেশ উত্তাপ হাতে! কিন্তু নাড়ি অনুভব করার সুযোগ পেলেন না। সেতাব মুখুজ্জে হাতখানাকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করছেন।
—ছাড়, হাত ছাড়, জীবন। হাত ছাড়।
–পাগলামি করিস নে সেতাব। নাড়ি দেখতে দে।
–না। চিৎকার করে উঠলেন সেতাব।
–আরে, হল কী তোর? আরে! বিস্মিত হয়ে গেলেন জীবন ডাক্তার।
–না–না–না। ছেড়ে দে আমার হাত। ছেড়ে দে। ঝটকা মেরে ডাক্তারের হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সেতাব উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর নিজের লণ্ঠনটা একপাশে নামানো ছিল। সেটা জ্বালাবার অবকাশও ছিল না; নেভানো লণ্ঠনটা নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়লেন দাওয়া থেকে।
—সেতাব, ছাতা, তোর ছাতা।
এবার সেতাব ফিরলেন। ছাতাটি নিয়ে লণ্ঠনটি জ্বালাতে জ্বালাতে বললেন– নিজের নাড়ি দেখ তুই। তুই এইবার যাবি আমি বললাম। লোকের নাড়ি দেখে নিদান হেঁকে বেড়াচ্ছি, নিজের নিদান হাঁক।
সেতাব চলে গেলেন সেই বৃষ্টির মধ্যে।
ডাক্তার চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। সেতার মধ্যে মধ্যে এমনি অকারণে রেগে ওঠেন। অকারণ ঠিক নয়, নিজের চাল ভুল হলে মনে মনে রাগেন নিজের উপরেই, তারপর একটা যে-কোনো ছুতোতে ঝগড়া করে বসেন। উঠেও চলে যান। ফেরানো তাকে যায় না, পরের দিন ডাক্তার যান তার বাড়ি। গেলেই সেতাব বলেন-আয়-আয় বোস। এই যাব বলে উঠেছিলাম আর তুইও এলি।
ডাক্তার একটু হেসে বাড়ির ভিতরে যাবার জন্যে ঘুরলেন; ডাক্তারখানার দরজা বন্ধ করতে গিয়ে কিন্তু থমকে দাঁড়ালেন। আজ সেতাবের রাগটা প্রচ্ছন্ন বিকার নয় তো? উত্তাপে অল্প জ্বর মনে হল। কিন্তু নাড়ি দেখতে তো দিলেন না সেতাব। ঐ দুটি কুঞ্চিত করে তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। ভাবছিলেন যাবেন এখুনি সেতাবের বাড়ি।
ফল নেই। তাই যদি হয় তবে সেতাব কিছুতেই তাকে হাত দেখতে দেবেন না, বরং আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠবেন।
আর এই বৃষ্টিতে ভিজে অনিষ্ট? সে যা হবার হয়েছে।
মৃত্যু-রোগের একটা যোগাযোগও আছে, যা বিচিত্র এবং বিস্ময়জনক।
পরের দিন।
সাধারণত ডাক্তার বেশ একটু দেরিতে ওঠেন। আজ কিন্তু উঠলেন সকালেই। সমস্ত রাত্রি ভাল ঘুম হয় নি। সেতাব সম্পর্কেই দুশ্চিন্তা একটা বাতিকের মত তাকে চঞ্চল করে রেখেছিল। কত উদ্ভট চিন্তা। তাঁর অভিজ্ঞতায় যত বিচিত্র রোগলক্ষণ উপসর্গ তার চোখে পড়েছে, তিনি যেন। উপলব্ধি করেছেন সেইসব উপসর্গের লক্ষণ তিনি সেতাবের আচরণের সঙ্গে মিলিয়ে পেয়েছেন। সেদিন। যত দেখেছেন ততই যেন মিলেছে। মনে মনে অনুতাপ হয়েছে, সেতাবকে তিনি জাপটে ধরে জোর করে ঘরে বন্ধ করে রাখলেন না কেন? ওই বৰ্ষণের মধ্যে যেতে দিলেন কেন? প্রচ্ছন্ন বিকার নিয়ে জ্বরই খুব খারাপ, তার উপর এই বর্ষায় ভিজে যদি সর্দিটা প্রবল হয় তবে
যে অসাধ্য হয়ে উঠবে।
বয়স সেতাবের হয়েছে, জীবনে বন্ধনও নাই। বন্ধন বলতে স্ত্রী—কিন্তু সে স্ত্রী এমনই সক্ষম ও আত্মপরায়ণা যে, সেতাবের অভাবে তার বিশেষ অসুবিধা ঘটবে না। সেতাবের অভাব অনুভব করবেন তিনি নিজে। সেতাব না হলে তার দিন কাটে না। তিনি থাকবেন কাকে নিয়ে?
সকালে উঠেই তিনি সেতাবের বাড়ি যাবার জন্যে প্রস্তুত হলেন। ডাক্তার-গ্নিনিও সকালেই ওঠেন। এবং তাঁর বিচিত্র স্বভাবের বিচিত্রতম অংশটুকু এই প্রথম প্রভাতেই আত্মপ্রকাশ করে থাকে। নাম তার দুর্গা। দুৰ্গা প্রভাতে ওঠেন যুদ্ধোদ্যতা দশপ্ৰহরণ ধারিণীর মত। মেজাজ সপ্তমে উঠেই থাকে; সেই মেজাজে বকেঝকে বাড়িটাকে সন্ত্রস্ত করে দিয়ে কিছুক্ষণ পর আশ্চর্যভাবে ধীরস্থির হয়ে আসেন। ডাক্তার দেরিতে ওঠেন যেসব কারণে ওটা তার মধ্যে একটা প্রধান কারণ। গিন্নি স্থির হলে নিশ্চিন্ত হয়ে গাত্রোত্থান করেন তিনি।
ডাক্তার-গিন্নি অনেক আগেই উঠে বাসনমাজা-ঝিকে তিরস্কার করছিলেন, বালি এবং করকরে ছাই দিয়ে বাসন মাজার জন্য। ওতে বাসনের পরমায়ু কতদিন? সংসারে যারা সিদ্ধপুরুষ, মৃত্যু যাদের ইচ্ছাধীন, তাদের মাথায় ডাণ্ডা মারলে তারাও মরতে বাধ্য হন। ও তো নির্জীব কাসার গেলাস। বালি দিয়ে দুবেলা ঘষলে ও আর কতদিন। কাসার দাম যে কত দুমূল্য হয়েছে সেও তাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন। ডাক্তার উঠে আসবার সময় কেশে গলা পরিষ্কার করে সাড়া দিয়ে নামলেন। তারপর গম্ভীরভাবে বললেন– আমি বেরুচ্ছি একবার মাঠে। সকালবেলা উঠেই প্রথম কথাটি তাঁকে মিথ্যে বলতে হল। নইলে গিনির দৃষ্টি এবং হুঙ্কার ভস্মলোচন ভস্মকারিণীর মত প্রখর এবং ভীষণ হয়ে উঠবে।
