***
বাপের মৃত্যুর পর জ্ঞানযোগেই নিজেকে ড়ুবিয়ে দেবার জন্য জীবন দত্ত ডাক্তারি পড়বার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। তখন বিলাতি চিকিৎসার অভিনবত্বে দেশ চকিত হয়ে উঠেছে। রঙলাল ডাক্তারের পালকির বেহারাদের হাঁকে দেশের পথঘাট মুখরিত; নবীন মুখুজ্জে ডাক্তারের ঘোড়ার খুরের ধুলোয় পথের দুই ধার ধূসর। শুধু পথঘাটেই নয়, কবিরাজদের মনের মধ্যেও এর সাড়া উঠেছে। এই বিদ্যা আগে থেকেই তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল, বাপের মৃত্যুর পর তিনি সুযোগ পেলেন।
বৃদ্ধ জীবনমশায় অন্ধকারের মধ্যে আবার একবার হাসলেন, দাড়িতে হাত বোলালেন।
হায়রে হায়! মানুষ সংসারে নিজেকে নিজে যত ছলনা করে, প্রতারণা করে, মিথ্যা বলে তার শতাংশের একাংশও বোধহয় পরকে করে না।
বৃদ্ধ বার বার মাথা নাড়লেন। ছোট ছেলের অপটু মিথ্যা বলার চাতুরীকে ধরে ফেলে কতকটা হতাশায়, কতকটা স্নেহবশে, কতকটা ধরে-ফেলার আনন্দে যেমন প্রবীণেরা মাথা নাড়ে তেমনিভাবেই মাথা নাড়লেন বার বার। সেদিনের আত্মপ্রতারণার কথাই আজ ধরে ফেলেছেন তিনি।
শুধু জ্ঞানলাভের জন্য, জ্ঞানযোগের মধ্যে নিজেকে সমাহিত করবার জন্য ডাক্তারি শিখতে চেয়েছিলেন? নিজে ঘোড়ায় চড়ে, আতর-বউকে পালকিতে চাপিয়ে কাঁদীতে ভূপী বোসের বাড়ি যাওয়ার কামনার তাড়নার কথাটা মিথ্যা?
শুধু কি এই? জগত্মশায়ের মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই কতকগুলি বাধা ঘর কি হাতছাড়া হয় নাই তার? লোকে বলে নাই—এইবার মশাইদের বাড়ির পর গেল?
নবগ্রামে কি প্রথম অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার এসে বসে নি? তার প্রায় মাসদুয়েক পর ওই কিশোরের বাপ কৃষ্ণদাসবাবুর আশ্রয়ে কি হরিশ ডাক্তার আসে নি? তিনি কি নিজেই শঙ্কিত হন নি?
গুরু রঙলাল ডাক্তার এর অন্য অর্থ করেছিলেন। বলতেন জীবন, তোমাকে আমি ভালবাসি কেন জান? তোমাকে ভালবাসি তুমি জীবনে হার মান নি এই জন্যে। এ দেশের কবিরাজরা হার মেনে এই অ্যালোপ্যাথিকে শুধু ঘরে বসে শাপ-শাপান্তই করলে। না পারলে নিজেদের শাস্ত্রের উন্নতি করে এর সঙ্গে পাল্লা দিতে না চাইলে এর মধ্যে কী আছে সেই তত্ত্বকে জানতে। আধমরারা এমনি করেই মরে হে। তুমি জ্যান্ত মানুষ। তাই তোমাকে ভালবাসি। হার মানার চেয়ে আমার কাছে অপমানের বিষয় আর কিছু নাই। হার মানা মানেই মরা। ডেড ম্যান, ডেড ম্যান! বুঝেছ?
লম্বা একটা চুরুট ধরিয়ে খালি গায়ে একখানা খাটো কাপড় পরে রঙলাল ডাক্তার ময়ূরাক্ষীর দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন আর পা দোলাতেন।
রোগী আসত। এ কথা যেদিন বলেছিলেন সেদিনের কথা মনে পড়ছে। একজন জোয়ান মুসলমানকে ড়ুলি করে নিয়ে এসেছিল। পেটের যন্ত্রণায় ধড়ফড় করছিল জোয়ানটা। রঙলাল। ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে দেখে নির্বিকারভাবেই বলেছিলেন, শুয়ে পড়, চিৎ হয়ে—এই আমার পায়ের তলায় শুয়ে পড়।
জীবন ডাক্তারকে বলেছিলেন—দেখবে নাকি নাড়ি? দেখ, তোমার নাড়িজ্ঞান কী বলে দেখ। অম্বল না অম্বলশূল না পিলের কামড় দেখ।
রোগী চিৎকার করে উঠেছিল, ওগো ডাক্তারবাবু, তুমি দেখ গো, তুমি দেখ! মরে গেলাম, আমি মরে গেলাম। নইলে একটুকুন বিষ দেন মশায়—খেয়ে আমি মরে বাঁচি। আঃ কোথাও কিছু হল না গো, কবরেজ হাকিম পীর কালীস্তান কিছু বাকি নাই মশায়।
বাধা দিয়ে রঙলাল বলেছিলেন, ঠাকুর-দেবতা কী করবে রে ব্যাটা? গোগ্ৰাসে গোশত খাবি তো তারা কী করবে? কতখানি গোশত খাস একেবারে দেড় সের না দু সের? কৃমি হয়েছে। তোর পেটে, তিন-চার হাত লম্বা কৃমি।
—হেই বাবা, ওষুধ দেন বাবা। যাতনায় আর বাঁচি না বাবা।
—তা দেব কিন্তু টাকা কই? অ্যাঁ? দুটো টাকা দে ফিজ আর ওষুধের দাম। দে আগে। টাকা না হলে হবে না।
–এক টাকা এনেছি বাবা—
জীবন বলেছিলেন, কাল তা হলে দিয়ে যেয়ো।
রঙলাল বলেছিলেন, ইউ আর এ ফুল। বিনা ফিজে চিকিৎসা কোরো না। ধারে ওষুধ দিয়ে না, মরবে তুমি। তা ছাড়া ওরা ভাববে এ লোকটার পর নেই ভাল। মানুষের বেঁচে থাকতে টাকা চাই। মানুষ খাটে ওই বাঁচার মূল্য উপার্জন করতে, তাতেও যে দাক্ষিণ্য দেখাতে যায় সে শুধু ফুলই নয় সে অপরাধী, অপরাধী। তাকে জীবনের যুদ্ধে হরতেই হবে। জাস্ট লাইক দি হিন্দুজ, ইতিহাসে পাবে হিন্দুরা প্রবল যুদ্ধ করে জিতে এল প্রায়, মুসলমানেরা যুদ্ধবিরতি প্রার্থনা করলে, ব্যস, হিন্দুরা বিরত হল। আচ্ছা, বিশ্রাম করে নাও, কাল আবার যুদ্ধ হবে। কিন্তু রাত্রে মুসলমান আক্রমণ করলে বিনা নোটিশে, অপ্রস্তুত হিন্দুরা হারল, মরল কিন্তু স্বর্গে গেল। আমি স্বৰ্গকামী নই। বুঝেছ? বলেই রোগীর সঙ্গের লোকদের বলেছিলেন, যাও, আর একটা টাকা নিয়ে এস। যাও। রোগী থাকুক এখানে। ভয় নেই। মরবে না। যাও।
তারা চলে গেলে বলেছিলেন, জীবনে টাকা চাই জীবন! টাকা চাওয়াটা অপরাধ নয়। কারও কাছে ভিক্ষা কোরো না, কাউকে ঠকিও না, কারও চুরি কোরো না, কাউকে সর্বস্বান্ত করে নিও না, কিন্তু তুমি যার জন্যে খাটবে তার মজুরি ফিজ, এ নিতে সঙ্কোচ কোরো না। করলে তুমি মরবে স্বর্গে যাবে কি না জানি না।
১৩. রঙলাল ডাক্তার
অদ্ভুত মানুষ ছিলেন রঙলাল ডাক্তার।
সাধারণ মানুষের সমাজ তাকে মহাদাম্ভিক অর্থপিপাসু হৃদয়হীন বলেই মনে করত। ঠিক তাঁর বাবার প্রকৃতির বিপরীত।
ভাষা ছিল রূঢ়, আপ্যায়নহীন অসামাজিক মানুষ।
জীবন ডাক্তারের সঙ্গেও প্রথম পরিচয়ে এমনই ভাষা প্রয়োগ করেছিলেন তিনি।
