জীবন মশায় মহৎ নন-নিজে তাই বলেন। তার মনের আগুন তাই বোধ করি আজও জ্বলছে। বাইরে দেখে কেউ বুঝতে পারে না। বুঝতে তিনি দেন না। বুঝতে পারে একজন। সে আতর-বউ। সে প্রথম দিন থেকেই বোঝে।
জীবনের প্রচ্ছন্ন বেদনা সংসারে সকলের কাছে প্রচ্ছন্ন থাকলেও নতুন বধূটির অগোচর ছিল না। শুধু তাই নয়, বধূটিকেও আক্রমণ করলে সংক্রামক ব্যাধির মত। ফুলশয্যার রাত্রেই জীবন দত্তের বেদনা নতুন বউয়ের মনে আঘাত করে প্রতিহত হয়ে ফিরে এল।
ফুলশয্যার শেষ রাত্রে জীবন বধূকে আকর্ষণ করেছিল—নিজের বুকের কাছে। বধূটি তিক্ত কঠিন স্বরে বলে উঠেছিল—আঃ, ছাড়!
—কেন? কী হল?
–কী হবে? ভাল লাগে না।
–ভাল লাগে না?
–না। ছেড়ে দাও, পায়ে পড়ি তোমার। ছেড়ে দাও।
–কী হল?
–কী হবে? আমাকে দয়া করে বিয়ে করেছ, উদ্ধার করেছ। দাসী হয়ে এসেছি—দাসীর মত খাটব। দু মুঠো খাব। আদর তো আমার পাওনা নয়। ছেড়ে দাও আমাকে।
আজও চলছে ওই ধারায়।
আতর-বউ আজ আগ্নেয়গিরি; অগ্ন্যার আরম্ভ হলে থামে না।
আতর-বউয়ের দোষ কী? আতর-বউয়ের বুকে আগুন লেগেছে তারই বুকের আগুনের সংস্পর্শে।
***
তবু এর মধ্যে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ একটি সংসার।
ওই যে আতর-বউ বলে—কত নামডাক ছিল—দু হাতে রোজগার করেছ, চার হাতে খরচ করেছ—এর অর্থই তো হল যশ-প্রতিষ্ঠা অর্থ-সম্পদ। সাধারণ মানুষের এ ছাড়া আর কী চাই?
সাজানো সংসার-তিন কন্যা এক পুত্র। সুরমা-সুষমা-সরমা। ছেলে বনবিহারী। তারা পেয়েছিল মায়ের বর্ণচ্ছটা, বাপের স্বাস্থ্য।
খ্যাতি প্রতিষ্ঠাও অনেক হয়েছিল; সে খ্যাতি কিশোর-জীবনের আকাঙ্ক্ষার পরিমাপে সমুদ্রের। তুলনায় গোষ্পদতুল্য না হলেও দিগন্তজোড়া বিলের তুলনায় মাঝারি আকারের পরিচ্ছন্ন একটি শখের পুষ্করিণী একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। যার বাঁধানো ঘাট আছে, জলে মাছ আছে, নামেও যে পুষ্করিণীটি কর্তার অভিপ্রায় অনুযায়ী শ্যামসায়র বা শ্যামসরোবর। জলও তার নির্মল ছিল, তপ্ত গ্রামবাসীরা তাতে অবগাহন করে তৃপ্তও হয়েছে। তৃষ্ণার্তেরা তার জল পান করে শ্যামসায়রের অধিকারীকে মুক্তপ্ৰাণে আশীর্বাদও করেছে। কিন্তু দিগন্তবিস্তৃত বিলের তুলনায় সে কতটুকু, কত অকিঞ্চিৎকর—তা সেই অধিকারীই জানে যে এই বিলের মতই একটি বিল কাটাতে চেয়েছিল। যার কল্পনা ছিল ওই বিলের ঘাটে ভিড়বে কত দেশদেশান্তরের বড় বড় বজরা নৌকা ছিপ!
আজ এই পরিণত বয়সে জীবনের সকল মোহই কেটে গেছে। লাল নীল সবুজ বেগুনে সাত রঙের ইন্দ্ৰধনু তিনি আর দেখতে পান না। আজ চোখের সামনে মাত্র দুটি রঙ আছে। একটি সাদা আর অন্যটি কালো। আলো আর অন্ধকার। তাই আশ্চর্য হয়ে ভাবেন—সেদিন কী করে জেগেছিল ইন্দ্ৰধনুর মত এমন বর্ণ-বৈচিত্র্যময় আকাঙ্ক্ষা।
এ প্রশ্ন মনে উঠতেই জীবন দত্ত হাসেন। নিজেকেই নিজে প্ৰশ্ন করেন—কেন? বার বার এ প্রশ্ন মনে ওঠে কেন তোমার? এ প্রশ্ন ওঠবার তো কথা নয়।
দুটি রঙ-দিন ও রাত্রির সাদা ও কালো রঙ দুটি ছাড়া বাকি রঙগুলি তুমি নিজেই তো ধুয়ে মুছে নিয়ে নিজের হাতে। অক্ষম লোকের রঙগুলি ধুয়ে যায় ব্যর্থতায়, বেদনার চোখের জলে। তুমি ধুয়ে মুছে দিয়েছ মিথ্যা বলে, তোমার মহাগুরু জগৎ মশায়ের শিক্ষার কথা ভুলে যাও কেন? তার শিক্ষার মধ্যে তো নিজেকে সেদিন ড়ুবিয়ে দিয়েছিলে তুমি।
নিজের ভুল নিজেই সংশোধন করে নিয়ে ঘাড় নাড়লেন জীবনমশায়। বার বার দাড়িতে হাত বুলালেন। ঠিক! ঠিক!
হঠাৎ একটা আলোর ছটা এসে চোখে বাজল। আলো? উঃসন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। রাত্রি নেমেছে। খেয়াল ছিল না। পুরনো কথা মনে করতে গিয়ে বর্তমানের কথা ভুলেই গিয়েছেন তিনি।
আলোটা আসছে ভিতর-বাড়ি থেকে, হয় ইন্দির, নয় নন্দ আলো নিয়ে আসছে। না তো। পায়ের দিকে কাপড়ের ঘের দেখে মনে হচ্ছে—মেয়েছেলে। আতর-বউ আসছেন। সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন জীবনমশায়। অসময়ে আতর-বউয়ের আসাটা তার কাছে শঙ্কার কারণ।
আতর-বউই বটে। আলোটা সামনে নামিয়ে দিয়ে আতর-বউ কাছে দাঁড়ালেন। দীর্ঘাঙ্গী গৌরবর্ণা আতর-বউ, কপালে সিদ্রের টিপটি আজও পরেন, সিঁথিতে সিন্দুর ডগ-ডগ করে। কঠোরভাষিণী আতর-বউ সুযোগ পেলে বোধ করি একটা রাজ্যশাসন করতে পারতেন। জীবন মশায় এ কথা অনেকবার বলেছেন রসিকতা করে। আতর-বউ উত্তর দিয়েছেন একটা মানুষকেই আনতে পারলাম না হাতের মুঠোয়, তো একটা রাজ্য! আতর-বউ উত্তর দিয়ে চিরকাল এক বিচিত্ৰ হাসি হাসেন।
আতর-বউ আলোটি নামালেন দাওয়ার উপর।
–কী খবর? মুখ তুলে বললেন– জীবনমশায়। আতর-বউয়ের মুখখানি বড় মধুর লাগছে। আজ। মমতায় যেন বর্ষার অভিষিক্ত ধরিত্রীর মত কোমল।
আতর-বউ ঈষৎ উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে প্রশ্ন করেন—তুমি আজ চা খাও নি?
–ভুলে গিয়েছি।
–ভুলে গিয়েছ? হাসলেন আতর-বউ।–চা খেতে ভুলে যায় মানুষ! নন্দ ছোঁড়া গিয়ে বললে—তামাক পর্যন্ত খাও নি। এসে ডেকেছে, সাড়া দাও নি। শরীর ভাল আছে তো? না–মন ভাল নাই? কী হল তোমার?
অপ্রতিভের মত হেসে জীবনমশায় বললেন–হয় নি কিছু। এমনি ভাবছিলাম। নবগ্রাম রতন মাস্টারের ছেলেকে দেখে এলাম; পথে নিশি-ঠাকরুন ডেকে দেখালে তার ভাইঝিকে। রতন মাস্টারের ছেলের রোগ খুবই কঠিন, তবে জোর করে কিছু বলা যায় না। কিন্তু এই মেয়েটি-এর আর–।
ঘাড় নাড়লেন ডাক্তার। আবার বললেন,—এই কচি মেয়ে-বড়জোর পনের বছর বয়স এরই মধ্যে দুটি সন্তান হয়েছে। নিশি দেখিয়ে বললে–চাঁদের মত ছেলে। আমি দেখলাম চাঁদ নয়, যম। মাকে খেতে এসেছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল।
