গাড়ির মধ্যে বসে যেতে যেতে মনে পড়ে গেল পুরনো কথা।
তখন তাঁর কিশোর বয়স।
পড়তেন নবগ্রাম মাইনর স্কুলে। সেইবারই তার মাইনর স্কুলে শেষ বৎসর। সে আমলে জমিদারত্বের একটা উত্তাপ ছিল। যে জমিদারি কিনেছে সেকালে তারই মেজাজ পাল্টেছে। জমিদারি কিনলেই লোকে মনে করত-লক্ষ্মী বাধা পড়লেন। সে আমলের প্রসিদ্ধ যাত্ৰাদলের অধিকারী কণ্ঠমহাশয়ের গানে আছে—আগে করবে জমিদারি তবে করবে পাকাবাড়ি। তারই স্বজাতি জ্ঞাতি ঘোষগ্রামের রাধাকৃষ্ণ মিত্র ওই নবগ্রাম মাইনর স্কুলে পড়ত। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা নবগ্রামের প্রতিপত্তিশালী জমিদারের ভাইয়ের সঙ্গে চলত তার অবিশ্রাম প্রতিযোগিতা। লেখাপড়ায় নয়, জমিদার-বংশধরত্বের। প্রায়ই খিটিমিটি বাঁধত। বাবার মূলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থাকত রাধাকৃষ্ণ। বলত, He is a Zaminders son, I am also a Zaminders son; এখন ঝগড়া হচ্ছে, বড় হলে দাঙ্গা হবে।
তাঁর বাবা জগদ্বন্ধু জমিদারি কেনার পর তার মনে এ উত্তাপ কিছুটা সঞ্চারিত হয়েছিল। লোকে সহপাঠীরা—বলেছিল, গুলবাঘা এবার ডোরাবাঘা হল! সাবধান!
সহপাঠীরা তাঁকে বলত–গুলবাঘা।
সেই কিশোর বয়সে তাঁর নিজের রূপের কথা মনে পড়ছিল। রূপ—যে রূপ সুকুমারকোমল-উজ্জ্বল—সে রূপ তার কোনোকালে ছিল না। কিন্তু রূপ তাঁর ছিল। সবল পরিপুষ্ট দেহ-গোল মুখ, ঝকঝকে চোখ, নির্ভীক দৃষ্টি, শ্যামবর্ণ দুর্দান্ত কিশোর। হাড়ু-ড়ু-ড়ু খেলবার সময় মালকোচা মেরে জীবন ডাক দিতে ছুটলে প্রতিপক্ষ দল খানিক পিছিয়ে থোল অর্থাৎ স্থল নিত। বলত-হাঁ গুলবাঘা ছুটেছে।
এধার থেকে ওধার মুহূর্তে ছুটে ঘুরবার ভান করে একেবারে মাঝের দাগের কাছে পর্যন্ত এসে বোঁ করে আবার ঘুরে আক্রমণ করতেন। কাউকে না কাউকে মেরে আবার ঘুরতেন।
বাড়ির পিছনে কুস্তির আখড়া ছিল। ল্যাঙট পরে নরম মাটির উপর দেহ ঠুকে আছাড় খেতেন শরীর শক্ত করবার জন্য। এর ওপর মুগুর ছিল, সে দুটো আজও আছে।
গুলবাঘ হিংস্রতর নরঘাতী ডোরাবাঘই হয়ে উঠত যদি না জগদ্বন্ধু মশায় মাথার উপরে থাকতেন। জগদ্বন্ধু মশায়ের চিত্ত এতে বিন্দুমাত্র উত্তপ্ত হয় নি। মশার বংশের মহাশয়ত্বই ছিল তার কাছে সবচেয়ে বড়। দম্ভের মোহে তিনি জমিদারি কেনেন নি। জমিদারির ওপর কোনো মোহ তার ছিল না। জমিদারি তিনি কিনেছিলেন জমিদারের দম্ভের উত্তাপ থেকে বাঁচবার জন্য। যেদিন জমিদারি কেনা হয় সেদিনের একটা কথা মনে পড়ছে।
জগদ্বন্ধু মশায়ের বন্ধু, পেশায় গোমস্তা ঠাকুরদাস মিশ্ৰ যে চিকিৎসালয়ের দেওয়ালে লিখেছিল লাভানাং শ্ৰেয় আরোগ্যম্, সে-ই তাঁকে শ্লেষ করে বলেছিল—তা হলে এবার জমিদার হলে। আশয়ের চেয়ে বিষয় বড় হল। আগে লোকে সম্ভ্রম করত—মশায় বলে, এবার লোক প্রণাম করবে জমিদার মশায় বলে! বাবুমশায় বলে! ঠাকুরদাস বাতের যন্ত্রণা এবং আরোগ্যের আনন্দ তখন একেবারেই ভুলে গেছে। অনেক দিন হয়ে গেছে তখন।
জগদ্বন্ধু বলেছিলেন—ভাই, ঢাল আর তরোয়াল দুটোই হল অস্ত্র। ওর একটা থাকলেই সে যোদ্ধা। কিন্তু তরোয়াল না নিয়ে তরোয়ালের চোট থেকে মাথা বাঁচাতে শুধু ঢালটা যে রাখে তাতে আর তরোয়ালধারীতে তফাত আছে। আছে কি না আছে—তুমিই বল। ঠাকুরদাস, ওটা আমার ঢাল, শুধু ঢাল। নবগ্রামের তরোয়ালধারী জমিদারদের উঁচানো তরেয়ালের কোপ থেকে আশয়ের মাথা বাঁচানো দায় হয়ে উঠেছিল। তাই ঢাল অস্ত্র হলেও ধরতে ল। কথাটা তোকে খুলেই বলি ঠাকুরদাস। নবগ্রামের জমিদারদের কাছে মান বজায় রাখা দায় হয়ে উঠেছে ভাই। সদাই ওঁরা শস্ত্ৰপাণি। নবগ্রামের রায়চৌধুরী বংশের তরোয়াল ভঙেছে, ওঁরা এখন বাট ঘুরিয়ে তারই ঘায়ে লোকের মাথা ভাঙতে চান। আবার নতুন ধনী ব্ৰজ লালবাবু এখন আমাদের গ্রামের আট আনা অংশের জমিদার। তাদের হল চকচকে ধারালো তরোয়াল। আজ মাসছয়েক থেকে দেখছি, ব্ৰজবাবুদের বাড়িতে অসুখবিসুখ হলে ডাক আসছে চাপরাসী মারফত। সেলাম অবিশ্যি করে। বলে—সালাম গো ডাক্তারবাবু বাবুদের বাড়ি একবার যেতে হবে যে। ওদের দেখাদেখি রায়চৌধুরীরা পথে-ঘাটে দেখা হলে হেঁকে বলতে শুরু করেছে—মশায় হে, একবার আমাদের বাড়ি হয়ে যাবে যেন। তবু তো বড়বাবুরা দর্শনী দেন, এরা আবার তাও দেয় না। বুঝেছ না, অনেক ভেবে ঢাল কিনলাম। এ আমার তরোয়াল নয়। এক হাতে ঢাল থাকল অন্য হাতে খলনুড়ি। ওটা ছাতার বদল।
কথাটা তিনি তার জীবনে সত্য বলেই প্রমাণিত করেছিলেন। তার ওই ঢালের আড়ালে এ গ্রামের অনেক জনকে তিনি আশ্রয় দিয়েছেন। এবং ওই ঢাল দেখিয়ে এ গ্রামের কাউকে কখনও অস্ত্রধারীর ঔদ্ধত্য অপমানিত করেন নি।
কথাগুলি জীবন দত্ত নিজের কানে শুনেছিলেন। পাশের ঘরেই তিনি বসে পড়ছিলেন সেদিন।
তবুও জীবন মশায়ের মনে বিষয়-বৈভবের দম্ভের উত্তাপ সঞ্চারিত হয়েছিল। কী করবেন তিনি? উত্তাপ লাগলে উত্তপ্ত হওয়া যে প্রকৃতি-ধর্ম। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া তো সহজ নয়। নইলে তিনি ডাক্তার হতেন না। বাপের কাছে কবিরাজিই শিখতেন। উত্তপ্ত বস্তু সহজ ধর্মে আয়তনে বাড়তে চায়। জমিদারের এবং বড়লোকের ছেলে তার বৈভব ও অহঙ্কারের উত্তপ্তচিত্ত তখন বাপপিতামহের জীবনপরিধিকে ছাড়িয়ে বাড়তে, বড় হতে চাচ্ছে! তাই জগদ্বন্ধু ছেলের মাইনর পড়া শেষ হওয়ার পর তাকে টোলে ভর্তি করতে চাইলেন। ব্যাকরণ শেষ করার পর আয়ুৰ্বেদ পড়বে। কিন্তু জীবন মশায় বলেছিলেন আমার ইচ্ছে ডাক্তারি পড়ি।
