না।
বাড়িতে ফিরছেন। আগেভাগে জানলে উনি খুশি হতেন।
মনসুর সাহেব জবাব দিলেন না। একবার বিদ্যুৎ চমকাল। বিদ্যুতের আলোয় দেখলাম তার চোেখ-মুখ শক্ত। দাঁত দিয়ে তিনি নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে আছেন। সমুদ্রবিদ্যার বইয়ে আছে, যে-লোক দাত দিয়ে ঘনঘন ঠোঁট কামড়ায় সে বরাহ প্ৰজাতির মানুষ। সুযোগ পাইলেই সে অন্যের অনিষ্ট করিবার চেষ্টায় থাকে।
আমার তেমন কোনো অনিষ্ট হলো না। টাকাভিরতি সুটকেস নিয়ে আমি সহজভাবেই গেট থেকে বের হয়ে এলাম। মনসুর সাহেবের মেয়েটাকে দেখলাম সুচিত্ৰা-উত্তমের যুগের নায়িকাদের মতো বিরহী-বিরহী চেহারা। গলার স্বর অসম্ভব মিষ্টি। দুই মিনিট তার কথা শুনলে যে-কোনো পুরুষের উচিত ধপাস করে তার প্রেমে পড়ে যাওয়া। তার গলার অস্বাভাবিক মিষ্টির ব্যাপারটা মনে হয় মেয়েটা জানে। কারণ, সে বড়ই স্বল্পভাষী।
আমি বললাম, মিস, টাকা গোনা আছে? না আমি আরেকবার গুনাব? যদি কম থাকে তা হলে দেখা যাবে জগলু ভাই আমার আঙুল অফ করে দিলেন। দশ আঙুল নিয়ে গেলাম, নয়। আঙুল নিয়ে ফিরলাম।
টাকা হিসাবমতো আছে।
মিস, আপনার শরীর ভালো তো? দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে জুর। চোখও সামান্য লাল হয়ে আছে।
আপনার সঙ্গে স্বাস্থ্যবিষয়ক কথা আমি বলতে চাচ্ছি না।
একটা শুকনা টাওয়েল কি দিতে পারেন? মাথা ভিজে গেছে। চুল শুকাব। পরে একদিন এসে ফেরত দিয়ে যাব।
আপনি যেভাবে এসেছেন সেইভাবে ফেরত যাবেন। এবং এক্ষুনি বিদায় হবেন।
এক কাপ কফি খেয়ে কি যেতে পারি?
না। প্লিজ, লিভ দিস হাউজ।
আপনি কিন্তু বলেছিলেন গরম কফি খাওয়াবেন, স্ন্যাকস খাওয়াবেন।
দয়া করে বিদায় হোন।
রিকশায় উঠেই জগলু ভাইকে টেলিফোন করলাম, ওস্তাদ মাল ডেলিভারি পেয়ে গেছি, এক ঘণ্টার মধ্যে চলে আসব।
জগলু ভাই বললেন, আপাতত তোমার কাছে রাখো, পরে ব্যবস্থা করব।
আমার কাছে কোথায় রাখব? আমার নিজেরই থাকার জায়গা নাই।
একটা ব্যবস্থা করো। এই মুহুর্তে আমাকে এটা নিয়ে যন্ত্রণা করবে না। বিরাট ঝামেলায় পড়ে গেছি।
জগলু ভাই কট করে টেলিফোন লাইন কেটে দিলেন। তিনি যে বিশেষ ধরনের বড় কোনো ঝামেলায় পড়েছেন তা তাঁর গলার স্বরেই বোঝা যাচ্ছে। গলা শেষের দিকে কেঁপে যাচ্ছে।
রিকশাওয়ালা বৃষ্টিতে রিকশা টানছে। সে বেছে বেছে বড় বড় খানাখন্দে রিকশা টেনে নিয়ে প্রায় হুমড়ি খাওয়ার মতো করে পড়ছে। কাজটা করে সে আনন্দ পাচ্ছে বলেও মনে হচ্ছে। একেকবার পড়ছে। আর দাঁত বের করে বলছে, এইটা দেখি পুশকুনি!
আমি আপাতত বাদলের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। আজ রাতটা বাদলের সঙ্গে থাকাই ভালো।
কলিংবেলের প্রথম শব্দেই দরজা খুলে গেল। খোলা দরজায় ক্লিপিং গাউন পরা খালুসাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর ঠোঁটে পাইপ।
স্লিপিং গাউন এবং পাইপ
স্লিপিং গাউন এবং পাইপ এই দুটি বস্তু বাংলাদেশ থেকে উঠে গেছে বলে আমার ধারণা। এই দুই বস্তু এখন শুধু সিনেমায় দেখা যায়।
নায়িকার বড়লোক বাবারা ক্লিপিং গাউন পরে ঠোঁটে পাইপ নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে ড্রাইভার জাতীয় কারো সঙ্গে কথা বলেন (যে তার মেয়ের প্রেমে পড়েছে)– তুমি কি জানো আমার বংশৰ্গৌরব? তুমি বামন হয়ে চাঁদে হাত দিতে চাও, এত তোমার স্পর্ধা? তুমি আমার খানদান ধুলায় লুটিয়ে দিতে চাও…ইত্যাদি ইত্যাদি।
খালুসাহেব খানদানি বংশের একজনের মতোই আমার সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন, কী চাও?
আমি বিনীতভাবে বললাম, কিছু চাই না খালুসাহেব।
কিছু চাও না, এদিকে বিছানা-বালিশ নিয়ে উপস্থিত হয়েছ?
বিছানা-বালিশ না খালুসাহেব। শুধু একটা সুটকেস।
সুটকেসটা নিয়েই-বা এসেছি কেন? আমি তো তোমাকে বলেছি, এবাড়ি তোমার জন্যে আউট অব বাউন্ড এরিয়া। বলেছি না?
জি, বলেছেন।
তুমি আমার ছেলের মাথা সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিয়েছ, এটা জানো?
আমি জবাব দিলাম না। খালুসাহেবের রাগ বাড়ছে। কারোর রাগ যখন চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে, তখন চুপ করে থাকলে চক্রবৃদ্ধিটা কেটে যায়।
তুমি যেভাবে সুটকেস বগলে নিয়ে ঢুকেছ ঠিক সেইভাবে সুটকেস বগালে নিয়ে চলে যাবে। ডাইনে-বামে তাকাবে না।
রিকশা ছেড়ে দিয়েছি যে খালুসাহেব। বাইরে বৃষ্টি, এখন যাই কীভাবে!
রোদ-বৃষ্টি তোমার জন্যে কোনো ব্যাপার না। তুমি ভিজতে ভিজতে চলে যাবে, এবং এখনই তা করবে। দিস ইজ অ্যান অর্ডার।
বাদলের কাছে সুটকেসটা রেখে চলে যাই। সুটকেসে দামি কিছু জিনিস আছে।
তোমার সুটকেসে যদি কোহিনুর হীরাও থাকে আই ডোন্ট কেয়ার, গো গো।
আমি খালুসাহেবের দিকে তাকিয়ে মধুর ভঙ্গিতে বললাম ঠিক আছে খালুসাহেব, আমি চলে যাচ্ছি, যাবার আগে আপনার সম্পর্কে একটা প্ৰশংসাসূচক কথা বলে যেতে চাই যদি অনুমতি দেন।
খালুসাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, প্রশংসাসূচক কী কথা?
আপনি আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললেন, রাগােরাগিও করলেন। কিন্তু সবই করলেন পাইপ মুখে রেখে। একবারও ঠোঁট থেকে পাইপ পড়ে গেল না। এটা কীভাবে করলেন? ভালো প্র্যাকটিস ছাড়া এটা সম্ভব না।
খালুসাহেব মুখ থেকে পাইপ হাতে নিলেন। গলার স্বর এক ধাপ নামালেন। সেইসঙ্গে চোখের দৃষ্টি কিছুটা শাণিয়ে নিয়ে বললেন, হিমু, তোমার স্বভাব আমি জানি। তুমি জটিল কথাবার্তার সময় উদ্ভট কিছু কথা বলে বক্তার কনসেন্ট্রেশন নষ্ট করে দাও। তাকে কনফিউজ করো। আমাকে নিয়ে এই খেলাটা খেলবে না।
জি আচ্ছা।
