আপনি বাবাকে টেলিফোন দিন।
একটু দাড়াও, ওস্তাদ জগলু ভাইকে জিজ্ঞেস করে দেখি তিনি পারমিশন দেন। কি না। লিডারের পারমিশন ছাড়া টেলিফোন দিতে পারব। উনি আমাদের লিডার।
জগলু ভাই চোখের ইশারায় অনুমতি দিলেন। আমি টেলিফোন মনসুর সাহেবের কানো ধরলাম। তিনি কোনো কথা বলতে পারলেন না। হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগলেন। ওপাশ থেকে মেয়ের কথা শোনা যাচ্ছে, কে, বাবা? বাবা? হ্যালো। প্লিজ কুল ডাউন। তোমাকে রিলিজ করার জন্যে যা করার করব। কুল ডাউন বাবা। কুল ডাউন।
আমরা আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে গেছি। চৌবাচ্চা সামনে রেখে দুজন বসে আছি। আমার দৃষ্টি চৌবাচ্চার দিকে। মনসুর সাহেব তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ, তবে দরজার ফাঁক দিয়ে আলো আসছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই অন্ধকারে আছি বলে চোখ সয়ে আছে। আমি মনসুর সাহেবের মুখ পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। আমেরিকার এক বিখ্যাত প্রেসিডেন্টের চেহারার সঙ্গে তাঁর চেহারার সুসাদৃশ্য আছে। প্রেসিডেন্টের নাম আব্রাহাম লিংকন ৷
মনসুর সাহেবের মনে হয়। হাঁপানি নামক ব্যাধি ভালোভাবেই ধরেছে। নিশ্বাসই নিতে পারছেন না। অবস্থা যা তাকে পানিতে চোবানোর আগেই তিনি মারা যাবেন। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম, হাঁপানির জন্যে আপনি কি কখনো লোকজ কোনো চিকিৎসা করিয়েছেন?
কী চিকিৎসা?
লোকজ চিকিৎসা। শিয়ালের মাংস খেলে হাঁপানি সারে বলে শুনেছি। খেয়েছেন শিয়ালের মাংস?
মনসুর সাহেব বললেন, আমি চরম দুঃসময়ের মধ্যে যাচ্ছি, এর মধ্যে তুমি এরকম ঠাট্টা-ফাজলামি কথা বলতে পারছ?
যদি উদ্ধার পেয়ে যান তা হলে তো আর আপনার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হবে না। তখন মনে করে শিয়ালের মাংস খাবেন। মাটন বিরিয়ানি স্টাইলে বাবুর্চিকে রাধাতে বলবেন। আসলে জিনিসটা হবে ফক্স বিরিয়ানি। শিয়ালের গন্ধ মারার জন্যে বেশি করে এলাচি দিতে বলবেন।
তুমি কি দয়া করে চুপ করবে? হাঁপানির আরো একটা ভালো লোকজ চিকিৎসা আছে। এই চিকিৎসায় কোনোকিছু খেতে হবে না। চিকিৎসাটা বলব?
মনসুর সাহেব কঠিন চোখে তাকাচ্ছেন। আমি তাঁর দৃষ্টি অগ্রাহ্য করলাম।
এই চিকিৎসা যে আপনাকে করতেই হবে তা তো না। জানা থাকিল। আপনি কী করবেন শুনুন, একটা জীবন্ত ছোট সাইজের তেলাপোকা ধরবেন। হ্যা করে মুখের ভেতর রাখবেন। ঠোট বন্ধ করে দেবেন। তোলাপোকা মুখের ভেতর ফড়িফড় করতে থাকবে। মীরবে না। কারণ, তার অক্সিজেনের অভাব হবে না। প্রতিদিন এই চিকিৎসা যদি একবার করে চালিয়ে যান, আপনি হবেন সম্পূর্ণ রোগমুক্ত।
মনসুর সাহেব আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চৌবাচ্চার দিকে তাকালেন। চৌবাচ্চা থেকে পানি উপচে পড়ছে। ঝরনার মতো সুন্দর শব্দ হচ্ছে। মনসুর সাহেব চৌবাচ্চার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার নাম হি?
আমি বললাম, সংক্ষিপ্ত নাম হি। অনেকেই ডাকে হিমু। শুধু আমার বাবা আমাকে ডাকতেন হিমালয়।
হিমু শোনো। আমি তোমার কথাবার্তা, কর্মকাণ্ড কিছুই মিলাতে পারছি না। আমি জানতে চাচ্ছি। তোমার কী ধারণা, এরা কি আমাকে মেরে
ফেলবে?
আমি বললাম, এরা যদি বুদ্ধিমান হয় তা হলে মেরে ফেলবে। আর যদি বোকা হয় বাড়িতে ফেরত পাঠাবে।
জগলু বোকা না বুদ্ধিমান?
বুদ্ধিমান।
তা হলে সে আমাকে মেরে ফেলবে?
মেরে ফেলা উচিত, তবে বিরাট বুদ্ধিমানরা মাঝে মাঝে বোকামি করে। সেই বোকামিতে আপনি ছাড়া পেতে পারেন।
আর তোমাকে কী করবে?
আমাকে আপনার মেয়ের কাছে পাঠাবে সুটকেসভরতি টাকা নিয়ে আসতে।
তুমি এমনভাবে কথা বলছি যে, কী ঘটবে না-ঘটবে সবই তুমি জানো।
আমি হাসলাম। বিশেষ ধরনের হাসি— যে-হাসির নানান অর্থ করা যায়।
হিমু!
জি?
তোমার সঙ্গে কি ঘড়ি আছে, কয়টা বাজে বলতে পারে? আমি বললাম, আমার সঙ্গে ঘড়ি নাই, তবে কয়টা বাজে বলতে পারি। আটটা পঁচিশ।
তালা খোলার শব্দ হচ্ছে। জাগলু ভাই সঙ্গে এমন একজনকে নিয়ে ঢুকেছেন যাকে দেখামাত্র হার্টবিট বেড়ে একশো-একশো দশের মতো হওয়ার কথা। গামা পালোয়ান ধরনের কেউ না। সাধারণ স্বাস্থ্যের লম্বা একজন মানুষ। গায়ের রং ফরসা। ছোট ছোট চোখ। মাথার চুল সম্ভবত পাকা, মেন্দির রং দিয়ে লাল করা হয়েছে। মানুষটার চেহারার সবকিছুই স্বাভাবিক, কিন্তু সব স্বাভাবিকতার বাইরে এমন ভয়ঙ্কর কিছু আছে যা সরাসরি বুকে ধাক্কা দেয়।
জগলু ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, মেয়েটার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সে বলেছে আর সমস্যা হবে না। কাউকে পাঠালে টাকা দিয়ে দিবে। আমরা ঠিক করেছি। তুমি গিয়ে টাকা নিয়ে আসবে। আমার নিজের লোক কেউ যাবে না।
আমি বললাম, স্যার, আমি একা যাব?
হ্যাঁ একাই যাবে। দূর থেকে আমার লোকজন তোমাকে ফলো করবে। টালটুবাজি করার সুযোগ নেই।
মিতুর সঙ্গে একটু কথা বলে নেই। টেলিফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিন।
তার সঙ্গে তোমার কথা বলার কিছু নেই।
অবশ্যই আছে। আমার কিছু জিনিস জানতে হবে। আমি তাদের বাড়িতে ঢুকলাম আর ধরা খেয়ে গেলাম। এটা কি ঠিক হবে? তা ছাড়া এই বুড়া মিয়ার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মনসুর সাহেবের কথা বলছি।
তার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত?
তাকে আমরা কখন খুন করব? আমি রওনা হবার আগেই, না। টাকা নিয়ে ফিরে আসার পর?
এত চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। তোমার কাজ টাকাটা নিয়ে আসা।
জগলু ভাই, আমি ওই মেয়ের সঙ্গে কথা না বলে রওনাই হব না। আমি তিনি কথার মানুষ।
