বলে কী! তোমার কথাবার্তা শুনে তো মনে হচ্ছে না। তুমি ভয় পাচ্ছি।
আমি বললাম, ভয় পেলে যদি কোনো লাভ হতো তা হলে ভয় পেতাম। লাভ যখন হবে না, শুধু শুধু ভয় পাওয়ার দরকার কী? স্যার, আপনি পানিতে ড়ুব দিয়ে কতক্ষণ থাকতে পারেন?
কেন?
কিছুই তো বলা যায় না, ধরেন আমাকে বাদ দিয়ে আপনাকে পানিতে চুবানো শুরু করল।
আমি তো তোমাকে বলেছি তারা যা চেয়েছে সেটা দিতে বলেছি। আমি এখন রিলিজ নিয়ে চলে যাব। আমি আর দেশেই থাকিব না। কানাডায় ইমিগ্রেশন নেওয়া আছে, মেয়েকে নিয়ে চলে যাব। কানাডা।
আপনার মেয়ের নাম কী?
স্যার, আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন?
তুমি ফালতু কথা বলছি কেন?
ঠিক আছে স্যার, আর কথা বলব না, একটা ছোট্ট উপদেশ দেই? বিপদে উপদেশ কাজে লাগতে পারে।
ফাজিল! চুপ, উপদেশ দিতে হবে না।
গালাগালি করছেন কেন স্যার? আমার উপদেশটা শুনে রাখুন— পানিতে যখন মাথাটা চুবাবে নিশ্বাস নিবেন না, হাঁ করবেন না, নড়াচড়া করবেন না। ভয়ে যদি নিশ্বাস নিয়ে ফেললেন, বিরাট বিপদ হবে। নাক দিয়ে পানি ঢুকলে সমস্যা। পানি ঢুকে যাবে ফুসফুসে। জীবন-সংশয় হবে। দেড়-দুই মিনিট নিশ্বাস বন্ধ করে থাকা খুবই কষ্টকর, তবে অসম্ভব না। গিনেস বুক অব রেকর্ডসে তিন মিনিট পানিতে ড়ুব দেবার কথা আছে।
ভদ্রলোক ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, চুপ বললাম, চুপ।।
আমি মধুর ভঙ্গিতে বললাম, চেষ্টা করবেন। শান্ত থাকতে। শান্ত থাকলে শরীরের অক্সিজেনের প্রয়োজন কিছুটা কমে।
তুই শান্ত থাক। তুই অক্সিজেনের পরিমাণ কমা।
তুইতোকারি করছেন কেন স্যার? আমরা দুইজন একই পথের পথিক। জলচিকিৎসার রোগী। আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা…
চুপ।
ভদ্রলোক হয়তো আরো হইচই করতেন। সুযোগ পেলেন না, দরজা খুলে গেল। মতি মিয়া ঢুকল। চৌবাচ্চার পানি পরীক্ষা করল। চৌবাচ্চা এখনো ভরতি হয়নি। আমি প্রৌঢ়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, চৌবাচ্চাটা ৬রতি হতে এতক্ষণ লাগছে কেন বুঝলাম না। মনে হয় কোনো ফুটো আছে। স্যার, আপনি কি চৌবাচ্চার অঙ্ক জানেন-একটা নল দিয়ে পানি ঢুকে আরেকটা দিয়ে চলে যায়?
প্রৌঢ় আগের মতো গলাতেই ধমক দিলেন, চুপ!
আমি চুপ করলাম। মতি মিয়া এখন প্রৌঢ়ের দড়ির বাঁধন খুলছে। খুলতে খুলতেই বলল, আপনার জন্যে সুসংবাদ। এখন চলে যাবেন। ওস্তাদ আপনাকে ছেড়ে দিতে বলেছে। চাউখ বান্দা অবস্থায় মাইক্রোবাসে তুলব। দূরে নিয়ে ছেড়ে দিব। রিকশা নিয়ে চলে যাবেন।
প্রৌঢ় বললেন, থ্যাঙ্ক য়ু।
মতি মিয়া বলল, আপনার তকলিফ হয়েছে, কিছু মনে নিবেন না।
কোনো অসুবিধা নেই, ঠিক আছে।
আপনার ভাগ্য ভালো, আপনে অল্পের ওপর পার পাইছেন।
প্রৌঢ় আমার দিকে শেষ তাকানো তাকিয়ে ঘর থেকে বের হলেন। একে অবিশ্যি তাকানো বলা যাবে না। তিনি তীরনিক্ষেপের মতো দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন বলা চলে।
আকাশে মেঘ ডাকছে। যে-মেঘের নামার কথা ছিল সেই মেঘ তা হলে এখনো নামেনি। বৃষ্টি নামার আগের মেঘের ডাকের সঙ্গে বৃষ্টি নামার পরের মেঘের ডাকের সামান্য পার্থক্য আছে। রূপা নামের এক তরুণী আমাকে ৷ ই পার্থক্য শিখিয়েছিল। আমি শিখিয়েছি আমার খালাতো ভাই বাদলকে। মেV|বিদ্যা পুরোপুরি নষ্ট হতে দেওয়া ঠিক না। বাদল এই বিদ্যার চর্চা করছে কি না জানি না। অনেক দিন তার সাথে দেখা হয় না। ইদানীং সে কিছু ঝামেলার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কী-একটা গান তার মাথায় ঢুকে (গছে। সে যেখানে যায়, যা-ই করে তার মাথায় একটা গানের লাইন লাজে। বড়ই অদ্ভুত গানের কথা। প্রথম লাইনটা হচ্ছে, নে দি লদ বা রয়াওহালা গপা। সমস্যা হচ্ছে এই গান নাকি সে আগে কখনো শোনেনি। যে গান সে কোনোদিন শোনেনি সেই গান কী করে তার মাথায় ঢুকল কে জানে!, তার মাথা থেকে কি গান দূর হয়েছে? একটা টেলিফোন হাতের কাছে থাকলে বাদলকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম। থানাওয়ালাদের হাতে যখন ধরা খেয়েছি তখন তারা মাঝেমধ্যে টেলিফোন করতে চাইলে দিত। বেশির ভাগ সময়ই অবিশ্যি দেখা যেত তাদের টেলিফোন কাজ করে না। ডায়ালটোন আসে না, আর যদিও আসে শোশো আওয়াজ হয়। বাংলাদেশে বেশির ভাগ সময় দুই জায়গার টেলিফোন নষ্ট থাকে—পুলিশের টেলিফোন এবং হাসপাতালের টেলিফোন। এদেরকে কি জিজ্ঞেস করে দেখব। একটা টেলিফোন করতে দিবে কি-না।
বন্ধ দরজা ধড়াম করে খুলে গেল। চার-পাঁচজনের একটা দল প্রবেশ করল। দলের পুরোভাগে জগলু ভাই আছেন। এবং আমাদের প্রৌঢ়—মনসুর গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মনসুর খাঁ সাহেবও আছেন। তার মুখ ঝুলে পড়েছে। এবং তিনি হাঁপানি রোগীদের মতো টেনে টেনে শ্বাস নিচেছন।
ঘটনা আঁচ করতে পারছি। বিশ লক্ষ টাকা জায়গামতো পৌঁছেনি। মনসুর সাহেবের মেয়ে হয়তো পুলিশে খবর দিয়েছে। সাদা পোশাকের পুলিশ একটা বেড়াছেড়া বাধিয়েছে। কিংবা টাকার বদলে সুটকেসভরতি পুরনো খবরের কাগজ পাঠিয়ে দিয়েছে। তার বাবা যে কত বড় বিপদে আছে সে বোধহয় আঁচ করতে পারছে না।
জগলু ভাইয়ের হাতে সিগারেট। তিনি ঘনঘন সিগারেট টানছেন। যতবারই টানছেন ততবারই আড়াচোখে তার রিস্টওয়াচের দিকে তাকাচ্ছেন। এই প্রথম তার মধ্যে উত্তেজনা লক্ষ করলাম। উত্তেজনায় তার নাক ঘামছে। সমুদ্রবিদ্যা বইয়ে আছে, মানসিক উত্তেজনাকালে যে-পুরুষের নাক ঘামে সে স্ত্রী-সোহাগী হয়। জগলু ভাই কি স্ত্রী-সোহাগী?
জগলু ভাই বললেন, বুড়ার মাথা পানিতে চুবাও। তার আগে বদমাইশের মেয়েটাকে মোবাইল টেলিফোনে ধরো। বুড়ার মাথা পানি থেকে তোলার পর টেলিফোনটা বুড়ার হাতে দাও। বুড়া মেয়ের সঙ্গে কথা বলুক। ঘুঘু দেখেছে, ফাঁদ দেখেনি। আমার সঙ্গে টালটুবাজি?
