তোকে এখনই গুলি করে মেরে ফেলব, হারামজাদা।
এখন মেরে ফেললে সুটকেস কে এনে দেবে?
শুয়োরের বাচ্চা, চুপ।
আমি জগলু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, তুই চুপ।
জগলু ভাই হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকালেন। তিনি মনে হয় তার সমস্ত জীবনে এত বিস্মিত হননি। আমি ঠিক আগের মতো ভঙ্গিতে বললাম, মোরগপোলাও আসছে, সোনামুখ করে মোরগপোলাও খাবি। বুঝেছিস? তেড়িবেড়ি করলে থাপ্পড় খাবি।
জিতু মিয়া খাবার নিয়ে আসছে। তার মুখ হাসিহাসি। আমি জগলু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, খাওয়ার পর পান খাওয়ার অভ্যাস আছে?
তোর জন্যে পান আনিয়ে রাখব? এরকম করে তাকাচিচ্ছস কেন? তোকে এর আগে কেউ তুই করে বলে নাই?
জগলু ভাই মোরগপোলাও খাচ্ছেন। আগ্রহ করেই খাচ্ছেন। তাঁর চেহারা থেকে হতভম্ব ভাবটা অনেকখানি কেটেছে। আমি বললাম, মোরগপোলাওটা ভালো না জগলু ভাই?
তিনি বললেন, হুঁ।
আমি বললাম, আপনার ছেলেরও তো মোরগপোলাও পছন্দ।
জগলু ভাই বলল, তুমি জানলে কীভাবে?
আমার সঙ্গে কথা হয়। সে জন্মদিনে মোরগপোলাও খাবে বলে বলেছে। আমরা এই বাবুর্চিকেই অর্ডার দিয়ে রাখি?
জগলু ভাই বললেন, ওর সঙ্গে তোমার আর কী কথা হয়েছে?
জন্মদিনে সে কী উপহার চায় সেটা আপনাকে বলতে বলেছে।
কী উপহার চায়?
একটা ছেলে-ভূতের বাচ্চা চায়। খেলনা না। আসল জিনিস।
ছেলে-ভূতের বাচ্চা আমি পাব কোথায়? এটা তার মাথায় আসলো কেন? তোমার সঙ্গে কি তার প্রায়ই কথা হয়।
মাঝে মাঝে হয়। আপনার সঙ্গে কথা হয় না?
না।
টেলিফোন করেন না কেন? টেলিফোন করলেই তাকে দেখতে যেতে বলবে। সেটা কখনো পারব না।
পারবেন না কেন?
পুলিশের ইনফরমার সবসময় নজর রাখছে। ফোন করলেই ধরা পড়ব। মতিকে পাঠিয়েছিলাম। পুলিশ তাকেও ধরে নিয়ে গেছে। কোথায় নিয়ে গেছে। জানি না। মনে হয় মেরেই ফেলেছে।
খাওয়া শেষ করে জগলু ভাই পান খেলেন। সিগারেট ধরালেন, তার চেহারায় কিছুক্ষণের জন্য হলেও একটা সুখী-সুখী ভাব চলে এল। আমি বললাম, জগলু ভাই একটা কাজ করুন লম্বা হয়ে বেঞ্চীতে শুয়ে পড়ুন।
কেন?
জিতু মিয়া আপনার মাথা মালিশ করে দেবে। মাথা মালিশে ডিগ্ৰী দেবার ব্যবস্থা থাকলে এই বিষয়ে সে Ph.D. পেয়ে যেত। জিতু আপনার মাথা মালিশ করবে। আপনি পাঁচ-দশ মিনিটের তোফা ঘুম দেবেন। দুপুরের ঘুমটাকে কি বলে জগলু ভাই?
সিয়াস্তা!
আপনি সিয়াস্তায় চলে যাবেন। আমি আপনার কানের কাছে রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা আবৃত্তি করব।
তুমি রবার্ট ফ্রস্ট জান?
কয়েকটা জানি। আপনি শুনলে অবাক হবেন আমার বাবা আপনার মতই ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। আপনাকে কি দুই-এক লাইন রবার্ট ফ্রস্ট শুনাব?
না। তুমি জিতু মিয়াকে সামনে থেকে যেতে বল।
সে তো আপনার সামনেই বসে আছে।
জগলু ভাই জিতু মিয়ার দিকে তাকিয়ে কঠিন ধমক দিলেন— যা ভাগ লাথি দিয়ে কোমড় ভেঙ্গে ফেলব।
জিতু মিয়া মুখ শুকনা করে উঠে চলে গেল। আমি বললাম, জগলু ভাই জনগণের সঙ্গে আপনার ব্যবহার তো খুবই ভাল।
তিনি আড়াচোখে আমার দিকে তাকিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরালেন। আমি বললাম, জগলু ভাই টপ টেরার হতে হলে কি কি গুণাবলী লাগে একটু বলবেন?
কেন?
কৌতূহল। এর বেশি কিছু না। আমি নিজে চিন্তা করে কয়েকটা পয়েন্ট বের করেছি। আপনার সঙ্গে মিলে কি-না বুঝতে পারছি না। বলব?
বল শুনি।
প্রথমেই লাগে খারাপ বাবা-মা। একটা ভাল বাবা এবং একটা খারাপ মা কখনো-সন্ত্রাসী ছেলের জন্ম দিতে পারেন না।
জগলু ভাই হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে বললেন, তুমি তোমার স্বভাব মত আমার সঙ্গে ফাইজলামী করছ। এটা আর করবে না।
জ্বি আচ্ছা করব না।
আমার বাবা-মা আদর্শ মানুষ ছিলেন। বাবা ছিলেন নান্দিনা হাই স্কুলের অংকের শিক্ষক। বাবার যে কোন একজন ছাত্রকে ডেকে তুমি যদি বল— অংক বদরুলকে চোন? সেই ছাত্র চোখের পানি ফেলে দেবে।
উনার নাম অংক বদরুল?
হুঁ। বাবা কি রকম মানুষ ছিল শুনতে চাও?
চাই।
বাবাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করত। আপনার ছেলে-মেয়ে কি? বাবা বলত আমার দুই মেয়ে, পুত্র সংখ্যা কয়েক হাজার। বাবা তার সব ছাত্রকে পুত্ৰ মনে করত। পনেরো-বিশ বছরের পুরাতন ছাত্রদের নামও বাবার মনে থাকত। একটা ঘটনা বলি শোন— বাবার সঙ্গে নিউমার্কেট কাচা বাজারে গিয়েছি। এক লোক বিশাল সাইজের একটা কাতল মাছ কিনছে। সম্ভবত বাজারের সবচে বড় কাতল। তার চারদিকে ভিড় জমে গেছে। বাবা ভিড় ঠেলে লোকটার কাছে গিয়ে বললেন, তুই মাসুদ না? তোকে একবার চড়মেরেছিলাম মনে আছে? এক থাপ্পর খেয়ে তোর জ্বর এসে গেল। ঐ লোক সঙ্গে সঙ্গে বাবার পায়ে পড়ে গেল। তাকে টেনে তোলা যায় না। এমন অবস্থা।
আমি বললাম, তারপর ঐ লোক কি করল? কাতল মাছটা আপনাদের বাড়িতে দিয়ে গেল?
তুমি জান কিভাবে?
অনুমান করছি।
এখানে অনুমানের কোনো ব্যাপারই নাই। অবশ্যই এই ঘটনা তুমি জান। কিভাবে জান বল। এই মুহূর্তে বল।
ড্রাঙ্গালু ভাই আপনি খামাখা উত্তেজিত হচ্ছেন। আমি অনুমানে বলছি।
অনুমানটা করলে কিভাবে?
আপনার বাবার একজন ছাত্র আপনার বাবাকে দেখে তার পা ছয়ে সালাম করেছে এটা তো কোনো বড় ঘটনা না। একজন প্রিয় শিক্ষকের দেখা পেলে সব ছাত্ররাই এ রকম করবে। ঐ ছাত্র বিশাল কাতল মাছটা আপনাদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে এটাই ঘটনা। এই কারণেই আপনি ঘটনাটা মনে রেখেছেন।
তোমার যুক্তি ঠিক আছে।
আমি বললাম, আপনার বাবা কি আপনার উত্থান দেখে যেতে পেরেছেন?
