স্যার কি ভালো আছেন?
হ্যাঁ, বাবা ভালো আছেন।
তোমরা চলে যাবে, তার আগে তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে না?
দেখা হবার কোনো প্রয়োজন কি আছে?
না, প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন ছাড়াও কিন্তু আমরা অনেক কিছু করি।
কী করি?
এই ধরো আমার টেলিফোন পাওয়ামাত্ৰই তুমি কিন্তু নিজের টেলিফোন অফ করে দিতে পারতে। তা করনি। প্রয়োজন ছাড়াই অনেকক্ষণ কথা বলেছি, এখনো বলছি।
এটা ভদ্রতা।
আমি যে স্যারের সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি এটাও ভদ্রতা। তুমি কি বাসায় আছ?
কেন?
তা হলে এখনই চলে আসি, ভদ্রতার ঝামেলা সেরে ফেলি। মঙ্গলবারের পর তোমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না। শেষ দেখাটা হোক।
ঠিক আছে, আসুন। এক ঘণ্টার মধ্যে আসবেন। আমি এক ঘণ্টা পর বাবাকে নিয়ে বের হব।
আমি একটা ক্যাব নিয়ে চলে আসি?
আপনার ব্যাপার।
আমার একার ব্যাপার না। তোমারও ব্যাপার।
আমার ব্যাপার কীভাবে?
ক্যাবেই আসি বাঁ হেলিকপ্টারেই আসি ভাড়া তো তোমাকেই দিতে হবে। আমার হাত খালি।
আবার রসিকতা! আবার!
আমি টেলিফোন অফ করে উঠে দাঁড়ালাম। আমার হাতে সুটকেস। সুটকেসে পঁচিশ লক্ষ টাকা। কোনো ছিনতাইকারী আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে সুটকেস নিয়ে দৌড় দিচ্ছে না কেন? দেশ থেকে কি ছিনতাই উঠে গেছে?
মেস থেকে বেরুবার সময় মেসের ম্যানেজার বদরুলের সঙ্গে দেখা। বদরুল বলল, হিমু ভাইরে সব সময় দেখি সুটকেস লইয়া ঘুরেন। সুটকেসে আছে কী?
আমি বললাম, টাকা।
কত টাকা?
পঁচিশ লক্ষ টাকা।
বদরুল শব্দ করে হাসা শুরু করল। তার হাসি দেখে মনে হচ্ছে এমন মজার কথা সে আগে কখনো শোনেনি। বদরুল আবার কাকে ডেকে যেন বলছে, হিমু ভাইয়ের সুটকেস–ভরতি টাকা। হা হা হা। পঁচিশ লক্ষ টাকা। হা হা হা।
মিতু সরু চোখে আমার সুটকেসের দিকে তাকিয়ে আছে। মনসুর সাহেবও তাকিয়ে আছেন। পিতা-কন্যা নিজেদের মধ্যে চোখাচোখিও করলেন। মিতু বলল, সুটকেসটা পরিচিত মনে হচ্ছে।
আমি বললাম, তোমার সুটকেস, পরিচিত মনে হবারই তো কথা।
সুটকেসটা কি ফেরত দিতে এসেছেন?
না। মঙ্গলবার পর্যন্ত তোমার কাছে রেখে যেতে এসেছি। তোমাদের ফ্লাইট কখন?
বিকালে।
আমি সকালে এসে সুটকেস নিয়ে যাব।
মনসুর সাহেব বললেন, ব্যাগে কি টাকা?
জি স্যার। জগলু ভাইকে টাকাটা এখনো দেওয়া হয়নি। আমি সুটকেস নিয়ে নিয়ে ঘুরছি। কয়েকটা দিন ঝাড়া হাত-পা হয়ে ঘুরতে চাই। সুটকেস-হাতে হাঁটা যায় না। রিকশা নিতে হয়। আমার কাছে রিকশা ভাড়া থাকে না।
পিতা-কন্যা দুজনই এখন একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। পিতার দৃষ্টিতে ভয়। কন্যার দৃষ্টিতে বিস্ময়। –
মনসুর সাহেব শান্ত গলায় বললেন, হিমু। আমি তোমার ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না।
আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, কোন ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না?
কিছুই বুঝতে পারছি না। বুঝতে চাচ্ছিও না। আমি খুব খুশি হব। তুমি যদি আমাদের জীবন থেকে অফ হয়ে যাও।
মঙ্গলবারের পর অফ হই স্যার? মঙ্গলবার পর্যন্ত সুটকেসটা রাখুন। এই কয়টাদিন আমি অত্যন্ত ব্যস্ত থাকব। নানান জায়গায় ছোটাছুটি করতে হবে। সুটকেস-হাতে ছোটাছুটি করা যাবে না।
কী নিয়ে ব্যস্ততা?
ভূতের বাচ্চা খুঁজতে হবে। ছেলে-বাচ্চা। একজনের ফরমায়েশ। তাকে একটা ছেলে–ভূতের বাচ্চা দিতে হবে।
পিতা-কন্যা। আবারও মুখ-চাওয়াচাওয়ি করছেন। আমি তাদের সামনে সুটকেস রেখে চলে এলাম। ঘাড় থেকে ভূত নামাবার জন্যে সিন্দাবাদকে নানান কায়দাকানুন করতে হয়েছিল। আমাকে কিছু করতে হয়নি। যাদের ভূত তাদেরকে দিয়ে এসেছি।
আমি লক্ষ করেছি। প্রকৃতি কাকতালীয় বিষয়গুলো পছন্দ করে। মনসুর সাহেব আমাকে বললেন, আমি খুব খুশি হব। তুমি যদি আমাদের জীবন থেকে অফ হয়ে যাও। ঠিক একই বাক্য কিছুক্ষণের মধ্যেই যদি আরো একজন বলে তাকে কি কাকৃতালীয় বলা যাবে না? বাক্যের কোনো শব্দ এদিক-ওদিক নেই।
মনসুর সাহেব আমাকে যা বলেছিলেন খালুসাহেব হুবহু তা-ই বললেন। মনসুর সাহেব শান্ত গলায় বলেছিলেন। খালুসাহেব বললেন সামান্য অস্থির ভঙ্গিতে। বেশিকম বলতে এইটুকুই।
হিমু, আমি খুব খুশি হব। তুমি যদি আমাদের জীবন থেকে অফ হয়ে যাও।
আমি বসে আছি। খালুসাহেবের অফিসে, ঠিক তার সামনে। খালুসাহেব মাসে মাসে আমাকে কিছু হাতখরচ দেন। একটাই শর্ত, আমি বাদলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব না। এই মাসে শর্ত পালন করা হয়নি। বাদলের সঙ্গে একই কামরায় একরাত কাটিয়েছি।
আমি কী বলছি শুনতে পেয়েছ?
জি খালুসাহেব।
তুমি আমাদের জীবন থেকে পুরোপুরি অফ হয়ে যাবে।
মাঝেমধ্যে অনা হতে পারব না? ধরুন ঈদের চান্দে অন্য হলাম। বাকি সময়টা অফ।
কখনো না। নেভার।
হাত খরচ নেবার জন্যেও কি আসিব না?
হাতখরচের কথা ভুলে যাও। তুমি যে-অপরাধ করেছ, তারপর হাতখরচ দেয়া দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষার চেয়েও খারাপ।
আমি কী করেছি?
তোমার ধারণা তুমি কিছু করনি?
জি না। বরং বাদলের মাথা থেকে গানটা দূর করে দিয়েছি। বাদল আপনাকে বলেনি?
বলেছে।
তা হলে আপনি আমার ওপর রাগ করছেন কেন?
তুমি বাদলের মাথা থেকে গান তুলে এনে আমার মাথায় পুতে দিয়েছ, কাজটা তুমি করেছ ইচ্ছা করে। কারণ, আমি তোমাকে চিনি। আমার চেয়ে ভাল করে তোমাকে কেউ চেনে না।
আপনার মাথায় কোন গান ঢুকিয়েছি? পাগলা হাওয়া?
হাওয়া-ফাওয়া না, হিন্দি গানটা। সঁইয়া দিল মে আনা… আমি এই গান জীবনে কোনোদিন শুনিনি। সেদিন অফিসে আসার সময় ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়েছি। এক রেস্টুরেন্টে গানটা বাজছিল। পুরোটা শুনলাম। তার পর থেকে গান মাথায় বাজছে।
