তোর জন্যে খালুসাহেব সাইকিয়াট্রিস্টের ব্যবস্থা করছেন। সাইকিয়াট্রিস্ট গান বের করে দেবেন। সাইকিয়াট্রিস্টদের হাতে নানান কায়দাকানুন আছে।
তাদের চেয়ে অনেক বেশি কায়দাকানুন তোমার হাতে আছে। তুমি ইচ্ছা করলেই আমাকে উদ্ধার করতে পার।
তোকে উদ্ধার করলে লাভ কী?
কোনো লাভ নেই?
না। তোকে এক জায়গা থেকে উদ্ধার করলে আরেক জায়গায় পড়বি।
তখন তুমি আবারও উদ্ধার করবে।
ধারাবাহিক পতন এবং ধারাবাহিক উৎখান?
হুঁ।
তোর গানটা কী আরেকবার বল তো—
নে দি লদ বা রয়াওহালা গপা…
শেষ শব্দ গপা?
হ্যাঁ গপা।
শুধু গপা না হয়ে গপাগপ হলে ভালো হতো।
ভাইজান, প্লিজ, হেল্প মি। এই গানের জন্যে আরাম করে আমি ঘুমাতে পর্যন্ত পারি না।
তোর গানের অর্থ বের করে ফেললেই গানটা মাথা থেকে দূর হবে বলে আমার ধারণা। তবে দূর হলেও লাভ হবে না, আবার অন্য কোনো গান তোর মাথায় ঢুকে পড়বে।
যখন ঢুকবে তখন দেখা যাবে। আপাতত এটা দূর করো।
তোর মাথায় একটা গানের প্রথম লাইন উলটো করে বাজছে। লাইনটা হলো, পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে। মিলিয়ে দ্যাখ।
বাদল বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল। তারপর ঘোরলাগা গলায় বলল, আরো তা-ই তো! এটা তুমি কখন বের করলো? এখন?
না। যেদিন বলেছিস সেদিনই বের করেছি।
এতদিন বলনি কেন?
দরকার কী?
হিমু ভাইজান, তুমি অদ্ভুত একজন মানুষ। শুধু অদ্ভুত না, অতি অতি অদ্ভুত।
আমরা সবাই অতি অতি অদ্ভুত। তুই নিজেও অতি অতি অদ্ভুত, আবার জগলু ভাইজানও অতি অতি অদ্ভুত!
জগলু ভাইজান কে?
তুই চিনবি না। আছে একজন। নিশি মানব। মাথা থেকে গানটা গেছে?
হুঁ।
ঘুমিয়ে পড়।
আজ খুবই আরামের একটা ঘুম হবে ভাইজান।
বাদল সোফায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমন্ত বাদলকে দেখতে ভালো লাগছে। পৃথিবীর সব ঘুমন্ত মানুষ একরকম। একজন ঘুমন্ত মানুষের সঙ্গে আরেকজন ঘুমন্ত মানুষের কোনো প্ৰভেদ নেই। জাগ্ৰত মানুষই শুধু একজন আরেকজনের কাছ থেকে उञाब्लाग्र হা च।
মোবাইল টেলিফোনের রিং বাজছে। জগন্নু ভাই টেলিফোন করেছেন। তিনি ঘুমিয়ে থাকলে তাঁর সঙ্গে বাদলের কোনো প্ৰভেদ থাকত না। জেগে আছেন বলেই তিনি এখন আলাদা।
জগলু ভাই, স্লামালিকুম।
জিনিস কি ঠিকঠাক আছে?
জিনিসের চিন্তায় আপনার কি ঘুম হচ্ছে না?
যা জিজ্ঞেস করেছি। তার জবাব দাও।
জিনিস ঠিকঠাক আছে, ওই যে সুটকেস দেখা যায়। ডালা খুলে দেখিব?
দরকার নাই। কাল সকালে তোমার সামনে ডালা খুলব।
জগলু ভাই, আপনি এখন আছেন কোথায়?
তা দিয়ে তোমার দরকার কী?
ঝুম বৃষ্টি পড়ছে তো, এই সময় পুত্রের পাশে শুয়ে থাকার আলাদা আনন্দ। বজ্ৰপাতের সময় বাচারা ভয় পায়। তখন হাত বাড়িয়ে বাবামাকে ছুয়ে দেখতে চায়। আপনার ছেলে নিশ্চয়ই অনেক দিন আপনাকে ছয়ে দেখে না।
আমার ছেলে আছে তুমি জানো কীভাবে?
অনুমান করে বলছি জগলু ভাই। আমি কিছুই জানি না। আপনার যেবয়স এই বয়স পর্যন্ত আপনি চিরকুমার থাকবেন, তা হয় না। বিয়ে করলে ছেলেমেয়ে হবার কথা। জগলু ভাই, আপনার কি একটাই ছেলে?
হ্যাঁ।
যদি একটাই ছেলে হয়, তা হলে অবশ্যই তার নাম বাবু।
এক ছেলে হলে তার নাম বাবু হবে কেন?
হবেই যে এমন কোনো কথা নেই, তবে বেশির ভাগ সময় হয়। অতিরিক্ত আদর করে। সারাক্ষণ বাবা বাবা ডাকা হয়। সেই বাবা থেকে
বাবু।
হিমু!
জি ভাইজান?
আমার সঙ্গে চালাকি করবে না। আমি জানে শেষ করে দেব।
জি আচ্ছা।
আমার ছেলের নাম বাবু তুমি কোত্থেকে জেনেছ?
অনুমান করেছি।
আবার চালাকি! আমার সঙ্গে চালাকি? আমার ছেলের নাম কি তোমাকে মতি বলেছে?
জি না।
তোমাকে যে মোবাইল টেলিফোন দেয়া হয়েছে। সেখানে কি তার নাম এন্ট্রি করা আছে? থাকার কথা না, তার পরেও কি আছে?
জানি না জগলু ভাই।
দ্যাখো, এক্ষুনি চেক করে দ্যাখো।
কীভাবে চেক করতে হয় এটাও তো জানি না। আমি শুধু মোবাইল অন-অফ করতে জানি। আমার খালাতো ভাই বাদল এইসব ব্যাপারে খুবই পারদর্শী, তবে সে এখন ঘুমুচ্ছে।
তাকে ডেকে তোলো।
সে খুবই আরাম করে ঘুমুচ্ছে, তাকে ডেকে তোলা যাবে না।
আমি ডেকে তুলতে বলছি, তুমি তোলো।
আচ্ছা জগলু ভাই শুনুন, মনে করুন। আপনার ছেলে অসুস্থ। অনেক দিন সে আরাম করে ঘুমায় না। একবার দেখা গেল অসুখ কমেছে। সে আরাম করে ঘুমুচ্ছে। তখন কি আপনি তাকে ঘুম থেকে তুলবেন?
আমার ছেলে যে অসুস্থ এটা তুমি জানো কীভাবে?
জগলু ভাই, আমি কথার কথা বলেছি।
অবশ্যই কথার কথা না। তুমি যা বলেছ জেনেশুনেই বলেছ। এইসব তথ্য তুমি কোথায় পেয়েছ তোমাকে বলতে হবে। এক্ষুনি বলতে হবে…
জগলু ভাই হয়তো আরো অনেক কিছু বলত, হুট করে লাইন কেটে গেল। আমি টেলিফোন সেট মাথার কাছে রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। বাকি রাতে জগলু ভাই আর টেলিফোন করলেন না। আমি আর বাদল সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুমালাম।
ঘুমের মধ্যে বাদল কোনো স্বপ্ন দেখল কি না। আমি জানি না, তবে আমি নিজে দীর্ঘ স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নে আমার বাবা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কিছুক্ষণ পরপর আমার মাথা একটা চৌবাচ্চায় ড়ুবাচ্ছেন। চৌবাচ্চার পানি নাকমুখ দিয়ে ঢুকছে। ফুসফুস ফেটে যাবার মতো হচ্ছে। এর মধ্যেও তিনি অতি মধুর গলায় আমার সঙ্গে কথা বলছেন। আমার মাথা পানিতে ডোবানো। এই অবস্থায়ও আমি বাবার কথার জবাব দিতে পারছি। স্বপ্নে সবই সম্ভব।
বাবা বললেন, হিমালয় বাবা! কষ্ট হচ্ছে?
