আমি বললাম, খালুসাহেব, গ্লাসে করে কী খাচ্ছেন?
গ্র্যাসে কী খাচ্ছি সেটা তোমার বিবেচ্য না। বাদলের প্রসঙ্গে বলে। ওর মাথায় কী গান?
বিশেষ একটা গান ক্রমাগত তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
ঘুরপাক খাচ্ছে মানে কী?
মানে হচ্ছে গানটা তার মাথায় বাজছে।
মাথায় গান বাজবে কীভাবে? মাথা কি গ্রামোফোন নাকি?
ব্যাপারটা অনেকটা সেরকম।
বুঝিয়ে বলো। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
মনে করুন। আপনি কোথাও যাচ্ছেন। হঠাৎ কোনো-একটা নাপিতের দোকান থেকে হিন্দি গান ভেসে এল, সঁইয়া দিল মে আনা রে… গানটা মাথায় খুট করে ঢুকে গেল। আপনি অফিসে চলে গেলেন— গান। কিন্তু বন্দ হলো না, বাজতেই থাকল। অফিস থেকে বিকেলে বাসায় ফিরেছেন। রাতে খাওয়াদাওয়া করে ঘুমুতে গেছেন, তখনো মাথায় গান বাজছে— সঁইয়া দিল মে আনা রে, আকে ফির না যান রে…। বাদলের এই ব্যাপারটাই ঘটেছে।
সাঁইয়া দিল মে আনা রে মানে কী?
মানে হচ্ছে, বন্ধু আমার হৃদয়ে এসো।
বাদলের মাথায় এই গান ঘুরছে?
এই গান না, তার মাথায় অন্য গান।
কী গান?
নে দি লদ বা রওয়াহালা গপা।
এটা কী ভাষা?
জানি না খালুসাহেব।
অর্থ কী?
অর্থও জানি না। অন্য কোনো গ্রহের ভাষা হতে পারে-এলিয়েনদের ভাষা।
বাদলের মাথায় এলিয়েনদের সঙ্গীত বাজছে?
সম্ভাবনা আছে। ভিন্ন গ্রহের অতি উন্নত প্ৰাণীদের মহান সংগীত হতে পারে।
হিমু, তোমার কি মনে হয় না বাদলের মাথাটা পুরোপুরি গেছে? সে এখন বদ্ধউন্মাদ?
খালুসাহেব! আপনি-আমি মনে করলে, তো হবে না। সামসুল আলম সাহেব যদি মনে করেন তা হলেই শুধু তাকে বদ্ধউন্মাদ বলা যাবে। বদ্ধউন্মাদের সার্টিফিকেট উনি দেবেন। আমরা দেব না।
সামসুল আলমটা কে?
যিনি বাদলের চিকিৎসা করছেন।
তার নাম তুমি জানো কীভাবে?
আপনিই তো বলেছেন।
ও আচ্ছা, আমি বলেছি? নিজেই ভুলে গেছি।
খালুসাহেব ইজিচেয়ার থেকে উঠলেন। বইয়ের র্যাকের কাছে গেলেন। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সেটের পেছন থেকে চ্যাপটা টাইপ একটা বোতল বের করে নিয়ে এলেন।
হিমু!
জি খালুসাহেব?
গানটা বাদলের মাথা থেকে দূর করার উপায় কী?
উপায় নিয়ে সামসুল আলম সাহেবকে ভাবতে হবে। তারা এই লাইনের বিশেষজ্ঞ।
তুমি তাঁর সঙ্গে কথা বলবে? উনাকে এলিয়েনদের গানের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবে?
আপনি চাইলে বলতে পারি।
থাক, দরকার নেই। আমিই বলব। গানটা কী যেন, সাইয়া দিল মে অনানা রে…
না, এই গান না, অন্য গান। দুর্বোধ্য গান–লে দি লদ…
এলিয়েন সঙ্গীত, তা-ই না?
পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছি না। তবে হতে পারে।
খালুসাহেব চ্যাপটা বোতলের জিনিস গ্লাসভরতি করে নিলেন।
তাকে খুবই চিন্তিত লাগছে। মাতালরা চিন্তা করতে ভালোবাসে।
খালুসাহেব এখন তার ছেলেকে নিয়ে চিন্তা করে আরাম পাচ্ছেন।
হিমু!
জি খালুসাহেব?
রাত কত হয়েছে দ্যাখে তো!
প্রায় বারোটা।
তোমার কি ধারণা রাত বেশি?
সাধারণ মানুষের জন্যে অনেক রাত। তবে সাধু-সন্ন্যাসী কিংবা জগলু ভাইয়ের জন্যে রাতের মাত্র শুরু।
জগলু ভাইটা কে?
আমার পরিচিত একজন। নিশি মানব।
নিশি-মানব মানে?
যারা নিশিতে ঘুরে বেড়ান।
হঠাৎ করে নিশি মানবের কথা এল কিভাবে?
আলোচনাটা আপনার কথার সূত্র ধরেই এসেছে। শুরুটা হয় আপনি যখন জানতে চান রাত বেশি কি-না।
ও আচ্ছা, তোমার কাছে জানতে চাচ্ছিলাম যে এত রাতে সামসুল আলম সাহেবকে টেলিফোন করা ঠিক হবে কি না।
পাগলের ডাক্তারদের মধ্যরাতে টেলিফোন করাই ভালো।
তার নাম্বারটা বলো।
নাম্বার তো খালুসাহেব আমি জানি না।
ভালো সমস্যা হলো তো! এখন কী করা যায়? আমি তো তার নাম্বার জানি না।
আপনি চিন্তা করে কোনো সমাধান বের করতে পারেন। কি না দেখুন। জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান সাধারণত খুব সহজ হয়। আমি এই ফাকে কিছু খেয়ে আসি।
তুমি রাতে কিছু খাওনি?
জি না।
যাও খেয়ে আসো।
খেয়ে আপনার এখানে আসব, না বাদলের সঙ্গে শুয়ে পড়ব?
খালুসাহেব জবাব দিলেন না। গভীর দুশ্চিন্তা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর বর্তমান দুশ্চিন্তা বাদলকে নিয়ে না। টেলিফোন নাম্বার নিয়ে। মাতালরা অতিদ্রুত এক দুশ্চিন্তা থেকে আরেক দুশ্চিন্তায় যেতে পারে। খেতে বসেছি। মেজো খালার বাড়িতে খাবার আয়োজন এমনিতেই ভালো থাকে, আজি আরো ভালো। বিশাল সাইজের পাবদা মাছ। ঝোল ঝোল করে রান্না করা হয়েছে। রান্নাও হয়েছে চমৎকার। ভুনা গোরুর মাংস আছে। ইলিশ মাছের ডিমের একটা ঝোলাও আছে। এই প্রিপারেশনটা দ্ৰৌপদীও জানতেন বলে মনে হয় না। খাবার মাঝখানে মোবাইল টেলিফোন বাজল। জগলু ভাইয়ের টেলিফোন। আমি টেলিফোন কানে নিয়ে বললাম, হ্যালো, জগলু ভাই।
জগলু ভাই ধমকের গলায় বললেন, তুমি কোথায়?
আমি বললাম, বাদলদের বাড়িতে।
সেটা কোথায়? অ্যাড্রেস কী?
কলাবাগানে। নাম্বার-টাম্বার তো বলতে পারব না। বাসা চিনি। অ্যাড্রেস জানি না।
আমার জিনিস কোথায়?
সঙ্গেই আছে। বাদলের খাটের নিচে রেখে দিয়েছি।
বাদল কে?
আমার খালাতো ভাই।
তুমি যেখানে আছ সেই অ্যাড্রেস জেনে নিয়ে আমাকে জানাও, আমি এসে জিনিস নিয়ে যাব।
নিজে আসবেন, না কাউকে পাঠাবেন?
একজনকে পাঠাব।
তার পাসওয়ার্ড কী?
তার মানে?
সাংকেতিক কোনো শব্দ। সে সেই শব্দ বললে আমি বুঝব যে সে আপনার নিজের লোক, তখন তার কাছে জিনিস ডেলিভারি দিয়ে দেব। যেমন পাবদা মাছ একটা পাসওয়ার্ড হতে পারে। সে গেটের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, পাবদা মাছ। ওমনি তাকে সুটকেস দিয়ে দিলাম।
