আজাহের বলে, “দেহ! আমার এহানে তোমার বড়ই কষ্ট অবি। কিন্তু জাইনো আমাগো দিন এই বাবেই যাবি না। আশ্বিন মাসে পাট বেইচা অনেক টাহা পাব। সেই টাহা দিয়া তোমার জন্য জেওর গড়ায়া দিব। তুমি দুক্ষু কইর না, আমি না খায়া তোমারে খাওয়াব, ঠোঁটের আধার দিয়া তোমারে পালব–তোমারে খুব ভাল জানব–আমার কলজার মধ্যে তোমারে ভইরা রাখপ।”
বউ একটু হাসিয়া আঁচলের বাতাসে কেরোসিনের কুপিটি নিবাইয়া আজাহেরের মুখে, একটি মৃদু ঠোক্কা মারিয়া বিছানার উপর যাইয়া শুইয়া পড়িল। আজাহের বউ-এর সমস্ত দেহটি নিজের দেহের মধ্যে লুকাইয়া তার বুকে মুখে ঘাড়ে সমস্ত অঙ্গে মুখ রাখিয়া কেবলই বলিতে লাগিল, “আমার একটা বউ ঐছে–সোনা বউ ঐছে–লক্ষী বউ ঐছে–মানিক বউ ঐছে। তোমারে আমি বুকে কইরা রাখপ–তোমারে আমি কলজার মধ্যে ভইরা রাখপ–আমার মানিক, আমার সোনা, তোমারে মাথায় কইরা আমি মাঠ ভইরা ঘুইরা আসপ নাকি? তোমারে বুকে কইরা পদ্মা গাঙ সঁতরাইয়া আসপ নাকি? আমার ধানের খ্যাতরে, আমার হালের লাঠিরে–আমার কোমরের গোটছড়ারে–আমার কান্ধের গামছারে। তোমারে আমি গলায় জড়ায়া রাখপ নাকি?”
আজাহের পাগলের মত এমনই আবল তাবল বকিয়া যাইতেছিল। বউটি হাসিয়া কুটি কুটি হইতেছিল। মাঝে মাঝে আজাহেরের মুখে এক একটি মৃদু ঠোকনা দিতেছিল।
ভালবাসার অনেক কথা ওরা জানে না। বউ-এর হাতের মৃদু ঠোনায় আজাহেরের সমস্ত অঙ্গ পুলকে ভরিয়া যায়। আজাহের যেন আজ ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। বউ এর সুন্দর নরম দেহটিকে সে যেন আজ লবঙ্গ এলাচির মত শুকিয়া শুকিয়া নিজের বুকে ভরিয়া লইবে।
এমনই করিয়া কখন যে রাত শেষ হইয়া গেল তাহারা টেরও পাইল না। প্রভাতের মোরগ ডাক দিতেই বউ তাড়াতাড়ি উঠিয়া উঠান ঝাট দিতে আরম্ভ করিল। ঘরের দরজার ফাঁক দিয়া আজাহের দেখিতে পাইল, পূব আকাশের কিনারায় পূব-ঘুমানীর বউ জাগিয়া উঠিয়াছে।
মুখ হাত ধুইতে ধুইতে সমস্ত আকাশ সোনালী রোদে ভরিয়া গেল। ঘর-গেরস্থালীর কাজে বউ এখানে সেখানে ঘুরিয়া ফিরিতেছিল। আজাহের ঘরের দরজার সামনে বসিয়া গান ধরিল
বাড়িতে নতুন বহু আসিয়া,
কথা কয় রাঙা মুখে হাসিয়া;
আমার বাঁশী বাজে তারিয়া নারিয়া নারিয়ারে।
পাড়ায় পাড়ায় বেড়ায় বহু লাল শাড়ী পরিয়া,
লাল মোরগের রঙীন পাখা নাড়িয়া নাড়িয়া;
ও ভাইরে ঝলমল কি চলমল করিয়া।
একাজ ওকাজে যাইতে চোখাচোখী হইতেই বউ-এর মুখখানা কৌতুক হাসিতে ভরিয়া যায়। আজাহের আরো উৎসাহের সঙ্গে গান ধরে–
বউ ত নয় সে হলদে পাখি এসেছে উড়িয়া
সরষে খেত নাড়িয়া
হয়ত বা পথ ভুলিয়া;
আমার মনে বলে রাখি তারে পিঞ্জিরায় ভরিয়া হৃদয়ে পুরিয়া
নইলে যাবে সে উড়িয়া।
ও ভাইরে ফুরপুর কি তুরতুর করিয়া।
গানের শেষ লাইনটি আজাহের বারবার ঘুরাইয়া ফিরাইয়া গাহিতে লাগিল। গান থামিলে ঘোমটার তল হইতে অতি মিহি সুরে বউ বলিল–”বাড়িতে আগুন নাই। ও-বাড়ির ত্যা আমাগো উনি আগুন আনুক গিয়া।”
এই কথা কয়টি আজাহেরের মনে সুধা বর্ষণ করিল। তার নিজের হাতে গড়া সারিন্দা যেন আজ প্রথম বোল বলিল। ব্যস্ত সমস্ত হইয়া সে মোড়লের বাড়িতে আগুন আনিতে ছুটিল। পথে যাইতে যাইতে বউ-এর সেই ছোট্ট কথা কয়টি যেন তাহার কানে ঘুরিয়া ঘুরিয়া বাজিতে লাগিল।
এমনই করিয়া আরো দুই তিনদিন কাটিয়া গেল। আজাহেরের নিকট তার বউকে যতই ভাল লাগিতেছিল, ততই সে মনে মনে ভাবিয়া অস্থির হইয়া উঠিতেছিল, কি করিয়া সে বেশী করিয়া উপার্জন করিবে? কি করিয়া সে বউকে আরো খুশী করিতে পারিবে?
দিনের বেলা আজাহের পৈড়াত বেচিতে ভিন গায়ে যায়। বাড়ি ফিরিতে সন্ধ্যা পারাইয়া যায়। তখন বাঁশের কঞ্চি বাঁকাইয়া ঝুড়ি তৈরী করিতে বসে। প্রায় অর্ধেক রাত বসিয়া বসিয়া কাজ করে। বউ তার সঙ্গে সঙ্গে পাট দিয়া সরু তাইতা পাকাইতে থাকে। হাটের দিন এগুলি বিক্রি করিয়া তাহারা দুপয়সা জমা করিবে।
পৈড়াত বেচিয়া আজাহের যাহা উপার্জন করে, তাহাতে দুজনের খাওয়া খরচই কুলাইয়া উঠিতে চাহে না! আলীপুরের শরৎ সাহার কাছ হইতে আজাহের পনর টাকা কর্জ করিয়া আনিয়াছে। প্রতি টাকায় মাসে এক আনা করিয়া সুদ। যেমন করিয়াই হোক আজাহের ছয় মাসের মধ্যে সেই টাকা শোধ করিয়া দিবে। দুইজনে মুখামুখি বসিয়া পরামর্শ করে, কি করিয়া আরো বেশী উপার্জন করা যায়। মোড়লের কাছ হইতে আজাহের দুই বিঘা জমি বরগা লইয়াছে। বউ এর বাপের বাড়ি হইতে কয়েক দিনের জন্য বলদ দুইটি সে ধার করিয়া জমিটুকু চষিয়া ফেলিবে। সেই জমিতে আজাহের পাট বুনিবে। খোদা করিলে দুই বিঘা জমিতে যদি ভাল পাট জন্মে, তবে ভাদ্র মাসেই সে তার বরগা ভাগে। এক বিঘা জমির পাটের মালিক হইবে। এক বিঘা জমিতে কমসেকম পনর মণ পাট জমিতে পারে। আগামী বারে যদি পাটের দাম পাঁচ টাকা করিয়াও হয়, পনের মন পাটে সে পাঁচ কম চার কুড়ি টাকার মালিক হইবে! বউ তুমি অত ভাবিও না। শরৎ সাহার দেনাটা শোধ করিয়া যে টাকাটা থাকিবে সেই টাকা দিয়া আজাহের দুইটি ভালো বলদ কিনিবে, আর বউ এর জন্য একখানা পাছাপেড়ে শাড়ী কিনিয়া আনিবে।
বউ বলে, “শাড়ী কিন্যা কি অবি। শাড়ীর টাকা দিয়া তুমি একটা ছাগল কিন্যা আইন। কয় মাস পরে ছাগলের বাচ্চা অবিবাচ্চাগুলান বড় ঐলে বেইচা আরো কিছু জমি অবি।”
