এমনি ছবির পরে ছবি–তারপর ছবি। ভাবিতে ভাবিতে আজাহের কখন যে ঘুমাইয়া পড়িল টেরও পাইল না। অনেক দেরীতে ঘুম ভাঙ্গিয়া আজাহের দেখিতে পাইল বাড়িঘর সমস্ত ঝাট দেওয়া হইয়াছে। উঠানের একধারে তেঁতুল গাছটির তলায় ভাঙা চুলাটিকে পরিপাটি করিয়া লেপিয়া তাহার উপরে রান্না চড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। সামনের পালান। হইতে বেতে-শাক তুলিয়া আনিয়া কুলার উপর রাখা হইয়াছে। তারই পাশে একরাশ ঘোমটা মাথায় দিয়া বউটি হলুদ বাটিতেছে। রাঙা হাত দুটি হলুদের রঙে আরো রাঙা হইয়া উঠিয়াছে।
অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া আজাহের দেখিল। তারপর তিন চারবার কাশিয়া গলাটাকে যথাসম্ভব মুলাম করিয়া কহিল, “বলি আইসাই তোমার এত কাম করনের কি দরকার ছিল? সকালে উইঠাই চুলা লেপতাছাও। তোমার ত কাল লাইগা জ্বর অবি।”
ঘোমটার তল হইতে কোন উত্তরই আসিল না। আজাহের কোলকেয় তামাক ভরিয়া যেন আগুন আনিতেই চুলার কাছে যাইয়া বসিল। এবার বউটির গায়ের সঙ্গে তাহার। ঘেঁসাঘেঁসি হইল। কোলকেয় আগুন দিয়া ফুঁ পাড়িতে পাড়িতে আজাহেরের ইচ্ছা করে এইখানে এই উনানের ধারে বসিয়া বউ-এর সঙ্গে সে অনেক রকমের গল্প করে। খেত-খামারের কথা, তার ভবিষ্যৎ জীবনের ছোটখাট কথা, আরো কত কি।
আজাহের বলে, “সামনের ভাদ্র মাসে পাট বেইচা তোমার জন্যি পাছা পাইড়া শাড়ী কিন্যা আনব। খ্যাতের ধান পাকলি তুমি মনের মত কইরা পিঠা বানাইও, কেমন?”
বউ কোন কথাই বলে না। নিরুপায় হইয়া আজাহের এবার সোজাসুজি বউকে প্রশ্ন করে, “বলি তোমাগো বাড়ির বড় গরুড়া কেমন আছে! শুনছি তোমার বাপ তোমাগো ছোট বাছুরডা বেচপি? আমারে কিন্যা দিতি পার?”
তবু বউ কথা কহিল না। আজাহেরের মন বড়ই অস্থির হইয়া পড়িল। ওই ছোট্ট রাঙা টুকটুকে মুখখানা হইতে যদি কথা বাহির হইত। রাঙা টুকটুকে কথা। কেন সে কথা বলে না!
এই রঙীন শাড়ীর অন্তরালে কি যে অদ্ভুত রহস্য লুকাইয়া রহিয়াছে! কে যেন কুয়াপের মন্ত্র পড়িয়া আজাহেরকে সেই রহস্যের দিকে টানিতেছে। সে যতই বউটির কথা ভাবিতেছে ততই সে এই রহস্য জালে জড়াইয়া পড়িতেছে।
স্নান করিতে আজাহের নদীতে আসিল। এতদিন স্নান করিতে তার দুইমিনিটের বেশী লাগে নাই, আজ প্রায় একঘন্টা ধরিয়া আঠাল-মাটি দিয়া সমস্ত গা ঘসিয়া সে স্নান করিল। তবু মনে হয় গায়ের সমস্ত ময়লা যেন তার পরিষ্কার হয় নাই। মাথার উস্কখুস্কু চুলগুলিতে আজ ছমাস নাপিতের কচি পড়ে নাই। যদি সময় থাকিত আজাহের এখনই যাইয়া নাপিত বাড়ি হইতে সুন্দর করিয়া ঘাড়ের কাছে খাটো করিয়া চুল কাটাইয়া আসিত।
স্নান করিয়া ভালমত মাথা মুছিয়া থালার উপরে পানি লইয়া রৌদ্রে বসিয়া তাহারই ছায়ায় নিজের মুখখানা সে বার বার করিয়া দেখিল। তারপর ঘরের বেড়া হইতে একখানা কাঠের ভাঙা চিরুণী আনিয়া মাথার অবাধ্য চুলগুলির সঙ্গে কসরৎ করিতে প্রবৃত্ত হইল। এই চিরুণীখানা সে চার বৎসর আগে কুড়াইয়া আনিয়াছিল। এতদিন তাহা কাজে লাগাইবার অবসর হয় নাই। আজ তাহা কাজে আসিল। অনেকক্ষণ চুলের সঙ্গে এই রকম কসরৎ করিয়া আজাহের বিস্ময়ে চাহিয়া দেখিল, বউ তার দিকে চহিয়া মৃদু হাসিতেছে। আজাহেরের চোখে চোখ পড়িতেই তাড়াতাড়ি বউ ঘোমটায় মুখখানা ঢাকিয়া ফেলিল।
বেড়াইতে বেড়াইতে বিকাল বেলা রহিমদ্দী কারিকর আজাহেরের বাড়ি আসিল। আজাহের তাকে বড় আদর করিয়া বসাইল। নিজে তামাক সাজিতে যাইতেছিল। বউ তাড়াতাড়ি আজাহেরের হাত হইতে কলিকাটি লইয়া তামাক সাজিয়া আনিয়া দিল। রহিমদ্দী তামাক টানিতে টানিতে বলিল, “বড় ভাল বউ পাইছসরে আজাহের। বউ বড় কামের অবি।”
রহিমদ্দীর মুখে বউ-এর তারিফ শুনিয়া আজাহের বড়ই খুশী হইল। রহিমদ্দী আস্তে আস্তে আজাহেরের কানের কাছে মুখ লইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “বউ-এর সাথে কি কি কথা বার্তা ঐল তোর আজ?”
আজাহের রহিমদ্দীর গায়ের উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়া ফিসফিস করিয়া উত্তর দিল, “কি কব চাচা, বউ মোটেই কথা কয় না। বউর বুঝি আমারে পছন্দ অয় নাই।”
রহিমদ্দী বলিল, “দূর পাগলা, নতুন বউ, সরম করে না? একদিনেই কি তোর সঙ্গে কথা কবি?”
আজাহের যেন অকূলে কূল পাইল। সত্যই বউ তবে তাকে অপছন্দ করে না। নতুন বউ সরম করিয়াই তার সঙ্গে কথা বলে না। আজাহের এবার রহিমদ্দীকে একটি গান গাহিতে অনুরোধ করিল। রহিমদ্দী বলিল, “নতুন বউকে গান শুনাইবার চা নাকি?”
‘দূর’ বলিয়া আজাহের রহিমদ্দীকে একটা মৃদু ধাক্কা দিল। হাসিতে হাসিতে রহিমদ্দী গান আরম্ভ করিল,
“মাগো মাগো কালো জামাই ভাল লাগে না,–”
গান শুনিয়া আজাহের হাসিয়া গড়াইয়া পড়িতেছিল। সে যদি লক্ষ্য করিত দেখিতে পাইত নতুন বউ-এর ঘোমটার তল হাসিতে ভরিয়া টুবুটুবু হইয়াছে।
চারিদিকে অন্ধকার করিয়া আবার রাত্রি আসিল। কেরোসিনের কুপিটি জ্বালাইয়া বউ নিজেই বিছানা পাতিল। আজাহের অবাক হইয়া দেখিল তার সেই সাত-তালি দেওয়া ময়লা কাঁথাখানি একদিনেই পরিষ্কার হইয়া উঠিয়াছে। তাহার উপরে রঙীন সূতার দুই তিনটি ফুল হাসিতেছে। সেই বিছানার ফুলগুলিরই যেন সঙ্গী হইয়া বউ একপাশে যাইয়া বসিয়া রহিল। বউটির দিকে বার বার করিয়া যতবার আজাহের তাকায় তার কেবলই মনে হয়, এমন রূপ তার গরীবের কুঁড়েঘরে মানায় না। ভরা মাঠের সরষে খেত কে আজ জীবন্ত করিয়া তার ঘরে ফেলিয়া গেল। কত কষ্টই না তার হইবে। গরীব আজাহের এমন সুন্দর মেয়েটিকে সুখে রাখিতে সব কিছুই করিতে পারিবে। কিন্তু সে কি সুখী হইবে?
