কাঁপতে কাঁপতে বছির বলিল, “আমার নাম বছির।”
“বেশ, বেশ। আচ্ছা তোমার নাম কি বাপু?” মাষ্টার মহাশয় নেহাজদ্দীকে জিজ্ঞাসা করিলেন। ভয়ে নেহাজদ্দীন হামলাইয়া কাঁদিয়া ফেলিল।
আজাহের বলিল, “উয়ার নাম নেহাজদ্দীন।”
মাষ্টার আর নাম জানিবার জন্য পীড়াপীড়ি করিলেন না। তাহার খাতার মধ্যে বছির আর নেহাজদ্দীনের নাম লিখিয়া লইলেন। মাসে দুই আনা বেতন আর ভর্তির ফিস দুই আনা, দুইজনের একত্রে আট আনা দিতে হইবে। মাষ্টারের মুখে এই কথা শুনিয়া আজাহের পরিধানের কাপড়ের খোট হইতে সযত্নে বাধা আট আনার পয়সা বাহির করিয়া দুইবার তিনবার করিয়া গণিয়া মাষ্টার মহাশয়কে দিলেন। মাষ্টার মহাশয় আবার সেই পয়সাগুলি দুই তিনবার করিয়া গণিলেন। পয়সাগুলির মধ্যে একটি আনি ছিল! সেটিকে ভালমত পরীক্ষা করিয়া কোঁচার খুঁটে শক্ত করিয়া বাঁধিয়া লইলেন। তারপর আজাহেরকে বলিলেন “এবার তুমি যাইবার পার। উরা এহন থাক!”
যাইবার জন্য আজাহের পা বাড়াইতেছে এমন সময় বছির তাহার হাত ধরিয়া কাদিয়া। ফেলিল, “বাজান, আমাগো ছাইড়্যা যাইও না।”
মাষ্টার মহাশয় তার বেতখানা দিয়া সামনের মাটিতে একটা বাড়ি মারিয়া ধমক দিয়া বলিলেন, “বাপের হাত ছাইড়্যা দাও।” মাষ্টারের ধমকের সঙ্গে সঙ্গে সেই সুকোমল হাতের বন্ধনী তার বাপের হাত হইতে খসিয়া পড়িল।
বাপ ফিরিয়া মাষ্টারের দিকে চাহিয়া যেমন আর দশজন অভিভাবক মাষ্টারকে বলে, তেমনি চিরাচরিত প্রথায় তাহাকে বলিয়া গেল, “দ্যাহেন মাষ্টার-সাব! ছাওয়াল দিয়া গেলাম আপনারে। সেই সঙ্গে উয়ার চামও দিয়া গেলাম আপনারে কিন্তুক হাড্ডি রইল আমার। ছাওয়াল মানুষ করতি যত খুশী ব্যাতের বাড়ি মারবেন।” সেকালে অভিভাকদের ধারণা ছিল মাষ্টার ছেলেকে যত বেত মারিবে তাহার তত বিদ্যা বাড়িবে। একজন শিক্ষিত বাপের মতন এই অশিক্ষিত চাষাবাপও যে মাষ্টারকে তাহার ছেলেকে মারিবার জন্য এমন ভরসা দিতে পারিল তাহা শুনিয়া মাষ্টার মহাশয় বড়ই খুশী হইলেন। এই সব অশিক্ষিত লোকের ছেলেদের পড়ান সব সময় নিরাপদ নয়। একবার এক গ্রাম্য মোড়লের ছেলেকে মাষ্টার বেত মারিয়াছিলেন। মোড়ল হাটের মধ্যে মাষ্টারকে ধরিয়া যেভাবে প্রহার করিয়াছিল তাহা এদেশে প্রবাদ-বাক্য হইয়া আছে। মাষ্টার আজাহেরকে বলিলেন, “সে কতা আর কইতি অবিন্যা মিঞা! বুঝতি পারছি, তুমার মদ্দি গিয়ান আছে।” খুশী হইয়া মাষ্টারকে সালাম করিয়া আজাহের চলিয়া গেল।
বছির আর নেহাজদ্দীনকে সে যেন চিরজনমের মত বনবাস দিয়া গেল। ডাক ছাড়িয়া তাহাদের কাঁদিতে ইচ্ছা হইতেছিল। কিন্তু মাষ্টারের চোখের দিকে চাহিয়া তাহাদের সমস্ত কান্না যেন কোথায় উবিয়া গেল। আর কিন্তু মাষ্টার তাহাদের কিছু বলিলেন না। এতক্ষণ মাষ্টার আজাহেরের সঙ্গে কথা বলিতেছিলেন। এই অবসরে গণশা তাহার চৌদ্দ পোয়া অবস্থা হইতে কপালের চাড়াখানা হাতে লইয়া পাশের একটি ছেলের সঙ্গে কথা বলিতেছিল। তাহা লক্ষ্য করিবামাত্র মাষ্টার বেত লইয়া গণশার উপর ঝাপাইয়া পড়িলেন। চীৎকার করিয়া গণশা শুইয়া পড়িল। সেই অবস্থায়ই মাষ্টার তাহার সারা গায়ে সপাসপ বেতের বাড়ি মারিতে লাগিলেন। বাবারে মারে চীৎকার করিয়া গণশা আকাশ-পাতাল ফাটাইতেছিল। তাহার কান্না শুনিয়া স্কুলের সামনে বহুলোক আসিয়া জড় হইল। কিন্তু তাহারা মাষ্টারকে কিছু বলিল না। বরঞ্চ মাষ্টার যে গণশাকে এইরূপ। নির্মম ভাবে মারিতেছিলেন, সে গণশার ভালর জন্যই করিতেছিলেন, তাহাদের নীরব সমর্থনে ইহাই প্রমাণ পাইল। অনেকক্ষণ গণশাকে মারিয়া বুঝিবা হয়রান হইয়াই মাষ্টার তাহাকে ছাড়িয়া দিলেন। তারপর আর আর ছেলেদের পড়া লইতে লাগিলেন।
মাষ্টার ছেলেদের পড়াইতে লাগিলেন, না তাহাদের মারিতে লাগিলেন তাহা বুঝিয়া। উঠা বড়ই মুস্কিল। এই স্কুলের ছেলেরা প্রায় সকলেই গরীবের ঘর হইতে আসিয়াছে। তাহাদের অভিভাবকেরা কেহই লেখাপড়া জানে না। সেইজন্য বাড়িতে তাহাদের পড়া বলিয়া দিতে পারে এমন কেহই নাই। স্কুলে মাষ্টার পড়া দিয়া দেন, কিন্তু পড়া তৈয়ার করাইয়া দেন না। ছাত্রদের বাড়িতে কেউ লেখাপড়া জানে না। কে তাহাদের পড়া বলিয়া দিবে? সুতরাং পরের দিন মাষ্টার যখন পড়া ধরেন কেহই উত্তর করিতে পারে না। এই স্কুলে কোন কোন ছেলে সাত আট বৎসর ধরিয়া একাদিক্রমে একই ক্লাশে পড়িতেছে কিন্তু বর্ণ পরিচয়ের বইখানাও তাহারা ছাড়াইয়া যাইতে পারে নাই। স্কুল তাহাদের নিকট পীড়নের স্থান। শুধুমাত্র অভিভাবকদের তাড়নায়ই তাহারা এখানে আসিয়া সহ্যের অতীত নির্যাতন ভোগ করিয়া থাকে। এইভাবে ঘণ্টা খানেক ছেলেদের ঠেঙ্গাইয়া মাষ্টার তাহাদের ছুটি দিয়া দিলেন। গণশাও চৌদ্দপোয়া অবস্থা হইতে রেহাই পাইল। মহাকলবর করিয়া তাহারা স্কুল ঘর হইতে বাহির হইয়া পড়িল। বছির আর নেহাজদ্দীনও বাড়ি রওয়ানা হইল।
বছির বাড়ির কাছে আসিয়া দেখে, মা পথের দিকে চাহিয়া আছে। ছোট বোন বড় কলরব করিয়া দৌড়াইয়া আসিল। তাহার বাপ খেতে কাজ করিতেছিল, তাহাকে দেখিয়া সেও বাড়িতে আসিল। আজ সকলেই যেন তাহাকে কি একটা নূতন দৃষ্টি দিয়া দেখিতেছে। বছিরের নিজেরও মনে হইতেছিল, সে যেন আজ কি একটা হইয়া আসিয়াছে। সেই সুখের চেতনায় সে স্কুলের সকল অত্যাচারের কাহিনী ভুলিয়া গেল। মা আজ নতুন চাউলের পিঠা তৈরী করিয়াছে। তাই খাইতে খাইতে বছির তাহার স্কুলের সকল কাহিনী বলিতে লাগিল। মা ও বাপ সামনে বসিয়া অতি মনোযোগের সঙ্গে শুনিতে লাগিল। এ যেন কত বড় মহাকাব্য তাহারা শুনিতেছে।
