মোড়ল তাজ্জব হইয়া জিজ্ঞাসা করে, “আরে কও কি আজাহের বাই? মোছলমানের ছেলে লেহাপড়া জানে?”
“শুধু কি জানে মোড়লসাব? মোছলমানের ছেলে লেহাপড়া শিখ্যা হাকিম ঐছে। সারাদিন বয়া বয়া কলম দিয়া কাগজের উপর দাগ কাটে।”
“আমি ত জানি, আমরা মোছলমান জাত ছোট-জাত। আমাগো লেহাপড়া অয় না।”
“আমাগো মৌলবীসাব কন, আমরা গরীব ঐতে পারি কিন্তুক আমরা ছোট-জাত না। জানেন মোড়লসাব! একজন আমারে কইছে এক সময় আমরা এই দ্যাশের বাদশা ছিলাম। এহন লেহাপড়া জানি না বইল্যা আমরা ছোট অয়া গেছি।”
“এ কতাডা তোমার মানি আজাহের বাই। লেহাপড়া না জাইন্যা চোখ থাকতেও আমরা কানা হয়া আছি। আর যারা লেহাপড়া জানে তারা আমাগো মানুষ বইল্যাই মনে করে না। তা তুমার ছাওয়ালডারে যদি ইস্কুলি দিবা, তয় আমারডারেও লয়া যাই। দেহি কি অয়।”
“হেই কতাই ত কইবার চাইছিলাম। আপনার ছাওয়াল নেহাজদ্দী আর আমার পুলা। বছির কাইল ইস্কুলি দিয়া আসপ।”
“আইচ্ছা বাই নিয়া যাইও। কিন্তুক আর একটা কতা। সাত দিনের চাউল হেদিন তোমারে দিয়া গেছিলাম। আইজকা সাতদিন পুরা ঐল। তুমি আমার ওহান ত্যা দুই ছালা দান নিয়া আইস গ্যা। পুলাপান গো খাওয়াইবা ত।”
“দান আনতি লাগব না মাতবর সাব!”
“ক্যা? তয় খাইবা কি?”
“এই কয়দিন জঙ্গল ত্যা খড়ি নিয়া ফৈরাতপুর বেচছি। তাতে রোজ দেড় টাহা, দুই। টাকা ঐছে। তাতে আমাগো কুনু রকমে চইল্যা যায়?”।
“কও কি আজাহের? তয় ত তুমি খুব কামের মানুষ! কিন্তু বাই! যহন যা দরকার। আমার ওহানে যায়া চাবা, বুঝলা বাই? যাই দেহি, শরীরডা যেমুন জ্বর জ্বর করতাছে–শুইয়া থাকিগ্যা।”
মোড়ল চলিয়া গেল। আজাহেরের ছেলে বছির ইতিমধ্যে খাইয়া শুইয়া পড়িয়াছে। শুইয়া শুইয়া মোড়ল ও তার বাপের মধ্যে যেসব কতাবার্তা হইয়াছে সকল শুনিয়াছে। মোড়ল যে তাহার বাপের কাছে যুক্তিতে হারিয়া গেল সেজন্য সে বড়ই দুঃখিত হইল। হায়, হায়, কাল আর সে পালাইয়া যাইতে পারিবে না! তাহাকে স্কুলে যাইতে হইবে। সেই গুরু মহাশয়ের বেত যেন তাহার চোখের সামনে লকলক করিয়া নাচিতেছে।
বছির কিছুতেই ভাবিয়া পায় না, কাল হইতে সে জঙ্গলে জঙ্গলে ইচ্ছামত বেড়াইতে পারিবে না। বনের ভিতর হইতে মাকাল ফল পাড়িয়া আনিতে পারিবে না। এই দুঃখ সে কেমন করিয়া সহ্য করিবে। বাপের সহিত বহুবার শহরে যাইয়া সে বিদ্বান লোকদের দেখিয়াছে। তাহারা মোটা মোটা বই সামনে লইয়া সারাদিন বসিয়া থাকে। এই গরমের দিনেও জামা কাপড় গায়ে পরিয়া থাকে। দুনিয়ার বাদশা বানাইয়া দিলেও সে কখনো এমন জীবন যাপন করিতে পারিবে না। আধ ঘন্টা এক জায়গায় চুপ করিয়া থাকিলে তাহার দম আটকাইয়া আসিতে চায়। আর এই সব শহরের পড়ুয়া লোকেরা সারাদিন বই সামনে করিয়া বসিয়া থাকে। গরমের দিনেও জামা কাপড় গায়ে রাখে। সে হইলে দুঃখে গলায় দড়ি দিত। কিন্তু হায়! কাল হইতে তাহাকে সেই জীবনই বরণ করিয়া লইতে হইবে। আচ্ছা, আজকের রাতের মধ্যে এমন কিছু ঘটিয়া উঠিতে পারে না, যার জন্য তাহাকে স্কুলে যাইতে হইবে না। এমন হয়, খুব ঝড় হইয়া তাহাদের বাড়ি-ঘর উড়াইয়া লইয়া যায়, সকালে তার বাপ তাহাকে বলে, বছির! তুই আইজ ইস্কুলে যাইস ন্যা।
এমনও হইতে পারে তার খুব জ্বর হইয়াছে, জ্বরের ঘোরে বছির আবোলতাবোল বকিতেছে, তার বাপ আসিয়া বলে, বছির! কাজ নাই তোর স্কুলে যাইয়া।
স্কুলে যাওয়াটা বন্ধ হউক, তাহার জন্য যে-কোন ক্ষতি বা সর্বনাশ তার উপরে কিংবা তার বাড়ি-ঘরের উপরে হউক তাতে বছির কোনই পরোয়া করে না। এমনি করিয়া ভাবিতে ভাবিতে কখন সে ঘুমাইয়া পড়িল। ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া সে স্বপ্ন দেখিতে লাগিল : তাহার সামনে অনন্ত অন্ধকার, সেই আন্ধারের উপর একখানা লাঠি আগুনের মত ঝকঝক করিতেছে।
পরদিন কোরবানীর গরুর মত কাপিতে কাঁপিতে বছির আর নেহাজদ্দী ভাটপাড়া গায়ে সেন মহাশয়ের স্কুলের পথে রওয়ানা হইল। আজাহের আগে আগে যাইতে লাগিল। বছির আর নেহাজী পিছাইয়া পড়ে। আজাহের দাঁড়াইয়া তাহাদের জন্য অপেক্ষা করে। এইভাবে আধ ঘন্টার মধ্যে তাহারা সেন মহাশয়ের স্কুলে আসিয়া যাহা দেখিল তাহাতে দুইটি তরুণ বালকের মন ভয়ে শিহরিয়া উঠিল। স্কুলের বারান্দায় চার পাঁচজন ছেলে ‘নিল ডাউন’ হইয়া আছে। আর একজন ছেলেকে ‘হাফ নিল ডাউন’ করাইয়া তাহার কপালটা আকাশের দিকে উঠাইয়া সেখানে এক টুকরা ভাঙা চাড়া রাখিয়া দেওয়া হইয়াছে। সামনে মাষ্টার বেত হাতে করিয়া দাঁড়াইয়া আছেন। যদি কপাল হইতে চাড়া পড়িয়া যায় তখন মাষ্টার বেত দিয়া সপাসপ তাহার পায়ে বাড়ি মারিতেছেন। ছেলেটি চীৎকার করিয়া কাঁদিয়াআবার মাটি হইতে চাড়াখানা কুড়াইয়া কপালের উপর রাখিয়া দিতেছে। তাহার পা দুইটি কাঁপতেছে আর সে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলিতেছে।
এই অবস্থার মধ্যে আজাহের ছেলে দু’টিকে সঙ্গে লইয়া মাষ্টার মহাশয়ের সামনে যাইয়া খাড়া হইল।
মাষ্টার মহাশয় ছেলে দুটির দিকে চাহিয়া খুশী হইলেন। কারণ স্কুলের ছাত্রদের নিকট হইতে যাহা বেতন পাওয়া যায় তাহাই মাষ্টার মহাশয়ের একমাত্র উপার্জন। তিনি প্রসন্ন হাসিয়া বছিরের নাম জিজ্ঞাসা করিলেন। ভয়ে বছির কথা বলিতে পারিতেছিল না। আজাহের আগাইয়া আসিয়া তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিল, “কও বাজান! নামডা কয়া ফ্যালাও।”
