বামপন্থা গত আশি বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর একটা বিরাট জনগোষ্ঠীকে উন্নতির পথে যেতে সহায়তা করেছিলো। কিন্তু উনিশ শতকের মার্কসীয় দর্শন দিয়ে বিশ শতকের সমস্যার সমাধান করা গেলো না বলে, বিশ শতক শেষ হবার আগেই কমিউনিস্ট অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক দর্শন ব্যৰ্থ বলে স্বীকৃত হলো। এখন নানা দেশেই ধর্মীয় উন্মাদনা এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ মানুষকে যে-পথে নিয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে আধুনিক মূল্যবোধের কোনো মিল নেই। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি, রেনেসন্স, সংস্কারবাদ, যুক্তিবাদ, উদারনৈতিকতা, শিল্প বিপ্লব, শিক্ষা প্রসার, মুদ্রণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অসাধারণ উন্নতি–সবই ধর্মীয় উগ্ৰবাদের মুখে হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। বর্ন এগেইন ক্রিশ্চিয়ান হোক, জিহোবাস উইটনেস হোক, মর্মন হোক, ইভ্যানজেলিকাল হোক, উগ্ৰবাদী হিন্দুত্ব হোক, অথবা জঙ্গী ইসলামী জাতীয়তাবাদ হোক–সবই আধুনিক কালের প্রাচীনপন্থী আন্দোলন। সভ্যতার অর্জনকে অস্বীকার করার আন্দোলন। বস্তুত, এসব দেখে ফরাসী দার্শনিকের সেই কথাই মনে হচ্ছে। যে-ধর্ম আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না, সে ধর্ম ধর্মীই নয়। সত্যি সত্যি আধুনিকতার জন্যে চাই নতুন ধর্ম, নতুন দর্শন, নতুন বিপ্লব। সর্বোপরি চাই, নতুনকে দু বাহু বাড়িয়ে স্বাগত জানানোর মুক্ত মানসিকতা।
(যুগান্তর, ২০০৬)
১৮. রবীন্দ্রনাথ ও পূর্ববাংলার মুসলিম সমাজ
বিশ্বজয় করে নোবেল পুরস্কার পেলেও, পড়শি মুসলমানদের জয় করতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথ। মুসলিম সমাজে জীবিত রবীন্দ্রনাথ ছিলেন। কার্যত মৃত্য। তবে তিনি যে মুসলমানদের জয় করতে পারেননি, সেই অক্ষমতা তাঁর নয়, সম্ভবত মুসলমানদেরও নয়। এর সত্যিকার কারণ নিহিত ছিলো তখনকার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে। আবার, দেশবিভাগের পর মৃত রবীন্দ্রনাথ যে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজের কাছে হঠাৎ জীবন্ত হয়ে দেখা দিলেন, তারও কারণ খুঁজতে হবে তখনকার সমাজ এবং রাজনীতিতে। কিন্তু যে-কারণেই হোক, বিভাগোত্তর পূর্ববাংলায় মৃত রবীন্দ্রনাথ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জীবিত রবীন্দ্রনাথের চেয়ে।
বিশ শতকের গোড়ায় মুসলমানদের মধ্যে কেবল উচ্চশিক্ষা নয়, সাধারণ শিক্ষার বিকাশও ঘটেছিলো খুবই সামান্য। তাঁরা ছিলেন প্রধানত গরিব কৃষিজীবী। সমাজের ওপর তলার দিকে তাকিয়ে তাঁরা সর্বত্রই দেখতে পেয়েছেন হিন্দু জমিদার, হিন্দু মহাজন, হিন্দু সরকারী কর্মকর্তা, এমন কি, হিন্দু রাজনীতিক। এই হিন্দুরা যে মুসলমানদের ভাই বলে সোহাগ করতেন, তা নয়। বরং ঐদের হাতে নিচের তলার মুসলমানরা অনেক সময়েই শোষিত এবং নিগৃহীত হয়েছেন। তার চেয়েও গুরুতরমুসলমানরা মাঝেমধ্যে অপমানিতও বোধ করেছেন ছোয়াছুয়ির কারণে। কাজেই শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বাস করলেও হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে-সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো, তাকে ভ্ৰাতৃত্বের পরাকাষ্ঠী বলে বিবেচনা করা যায় না।
তদুপরি, শিক্ষার অত্যন্ত সীমিত বিকাশের ফলে মুসলমানরা যে নিজেদের বাঙালি বলে চিহ্নিত করবেন, সে রকম মানসিকতাও তাদের গড়ে ওঠেনি। সত্যি বলতে কি, তাদের পরিচয় কী, এটা নিয়ে ভাববার মতো সচেতনতাও তাদের মধ্যে দানা বেঁধেছিলো কিনা, সন্দেহ হয়। লিখিত যেসব প্রমাণ মেলে তাতে মনে হয়, আঠারো শতকের কবি আবদুল হাকিমের পর আধুনিক যুগে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেনই সম্ভবত প্ৰথম ব্যক্তি যিনি নিজের স্বরূপ সম্পর্কে নিজের কাছে প্রশ্ন করলেন। কিন্তু তাঁর মতো মুসলমান সেকালে কমই ছিলেন। উল্টো, তারা এবং তাদের চোদ পুরুষ বাংলায় কথা বললেও তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা কিনা, তা নিয়ে বিশ শতকের গোড়ায়ও তারা রীতিমতো বিতর্ক করেছেন। এই পরিবেশে ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামধারী একজন কবিকে অর্থাৎ একজন হিন্দু কবিকে ভালোবাসা দূরে থাক, চিনতে পারাও তাদের পক্ষে সহজ ছিলো না। সে জন্যেই, তাদের হাতে রাখী পরানো সত্ত্বেও তার তাৎপর্য যদি তাঁরা বুঝতে না-পারেন, তা হলে আশ্চর্য হবার কারণ নেই। আশ্চর্য হবার কারণ নেই, হিন্দু-মুসলমান এক হোক বলে গান গাওয়া সত্ত্বেও, তার মর্ম উপলব্ধি করতে না-পারা।
রবীন্দ্রনাথেরও সীমাবদ্ধতা ছিলো বৈকি! মুসলমান প্রজাদের মধ্যে থেকেছেন দীর্ঘকাল, ঘুরে বেরিয়েছেন মুসলমান-প্রধান পূর্ববাংলার গ্রামের পথে, হোক না বোটে চড়ে। কিন্তু সমাজের উচ্চমঞ্চে সংকীর্ণ বাতায়নে বসে তিনি তাদের ঠিক ঠাহর করতে পারেননি। মাঝেমাঝে তিনি ও পাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে গেলেও, ভেতরে প্রবেশ করার সাধ্য তাঁর ছিলো না। অন্তর মিশিয়ে নিচতলার মানুষদের অন্তরের পরিচয় তিনি যথার্থভাবে পাননি। সে জন্যেই তাঁর কবিতা সর্বত্রগামী হতে পারেনি। কিন্তু জীবিত রবীন্দ্রনাথ যা পারেননি, মৃত রবীন্দ্রনাথ সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন। তবে তার জন্যে অকৃপণভাবে তাকে সাহায্য করেছিলো সাতচল্লিশের দেশবিভাগ।
দেড় হাজার মেইল দূরের বিভাষাঈ এক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কেবল ধর্মের নামে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন পূর্ববাংলার মুসলমানরা। তাঁরা আশা করেছিলেন যে, পাকিস্তান হবে তাদের সাব-পেয়েছির দেশ। কিন্তু তাদের মোহমুক্তি ঘটতে দেরি হয়নি। দেশের রাজনীতি, প্রশাসন এবং অর্থনীতিতে তাদের ন্যায্য হিস্যা তারা পাননি। বরং দেশবিভাগের পর রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পাকিস্তানের প্রতি তাদের আনুগত্যকেই বিপুলভাবে বিচলিত করেছিলো। মাতৃভাষা নিয়ে বিতর্ক শেষে মোটামুটি ১৯৩০ সাল নাগাদ যে-ভাষাকে তারা নিজেদের ভাষা বলে গ্রহণ করেছিলেন, সেই ভাষা ভুলিয়ে দিয়ে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার হুকুম যখন এলো পাকিস্তানের নেতাদের তরফ থেকে, সেটাকে তারা মেনে নিতে পারলেন না; এমন কি, দেশের ঐক্যের নামেও নয়। আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব, বাংলা ভাষায় যথেচ্ছভাবে অপ্রচলিত আরবিফারসি শব্দের আমদানি–এর কোনোটাই তাদের খুশি করেনি। কিছু সময় লেগেছিলো তাদের অসন্তোষ ধূমায়িত হতে, কিন্তু বিশাল এক বিস্ফোরণের সঙ্গে তা ছাড়া পেয়েছিলো ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি।
