থানায় এসে মাতব্বর আলি হোসেনকে দেখতে না পেয়ে একজন পুলিশকে জিজ্ঞেস করলেন, আলি হোসেন দারোগা কোথায়?
পুলিশ মাতব্বরকে চেনে। বলল, ওনাকে হঠাৎ অন্য থানায় বদলী করা হয়েছে। ওনার জায়গায় অন্য একজন এসেছেন।
ওনার নাম কি?
হালিম।
উনি কোথায়?
উনি ভিতরের রুমে কাজ করছেন। আপনি বসুন আমি ডেকে নিয়ে আসছি।
এখন বসার সময় নেই। ছেলের অবস্থা দেখছেন না? হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ওনাকে তাড়াতাড়ি ডাকুন।
হালিম দারোগা এসে সালাম বিনিময় করে রসিদের অবস্থা দেখে বললেন, ওনার এরকম অবস্থা কে করল?
মাতব্বর বললেন, কে করেছে আপনি খুঁজে বের করবেন। সেইজন্য তো কেস করতে এলাম। যা কিছু করার তাড়াতাড়ি করুণ, ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
হালিম দারোগা কেস লিখে জিজ্ঞেস করলেন, কাকে আপনার সন্দেহ হয়?
মাতব্বর বললেন, আমার ছেলের গায়ে হাত তোলার সাহস গ্রামের কোনো লোকেরই নেই। এখন আমি কারো নাম বলতে পারব না। ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি, ফিরে এসে আপনাকে খবর দেব, আপনি আসবেন। তখন বিস্তারিত আলাপ করব। এর মধ্যে আপনি তদন্ত শুরু করুন, কার দ্বারা এই কাজ হয়েছে। এখন আসি বলে লোকজনদের বললেন, রশিদকে ভ্যান গাড়িতে তোল, হাসপাতালে যেতে হবে। তারপর নিচু স্বরে বললেন, আসামীকে ধরতে পারলে মোটা পুরস্কার পাবেন।
.
০৪.
সাফিয়া দবিরের বড় মেয়ে। দবিরের আরো তিন চারটে ছেলেমেয়ে আছে। সে খুব গরিব। অন্যের খেতে খামারে কাজ করে সংসার চালায়। যেদিন কাজ হয় না, সেদিন সবাইকে নিয়ে উপোস থাকে। পাঁচ ছয় বছর আগে গ্রামে প্রাইমারী স্কুল হলেও অভাবের কারণে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর কথা ভাবতেই পারে নি। সাফিয়া দেখতে শুনতে ভালো, স্বাস্থ্যও ভালো। বয়স প্রায় বিশ বছর। দবির অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে বছর দেড়েক আগে পাশের গ্রামের হারেসের ছেলে হান্নানের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল। বিয়ের সময় জামাইকে পাঁচ হাজার টাকা যৌতুক দেয়ার কথা থাকলেও সব টাকা দবির দিতে পারে নি। বলেছিল, কিছু দিনের মধ্যে বাকিটা দিয়ে দেবে। কিন্তু এক বছর হয়ে যাওয়ার পরও যখন দিতে পারল না তখন জামাই ও তার মা-বাবা বৌকে মারধর করে বাপের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসার জন্য পাঠায়। সাফিয়া জানে, বাবা দিতে পারবে না। তবু কয়েকবার এসেছে। দবির মেয়ের উপর অত্যাচারের কথা জেনেও দিতে পারে নি। সাফিয়া বাপের দুবরস্থার কথা জেনে শ্বশুর বাড়ির অত্যাচার সহ্য করে স্বামীর ঘর। করছিল। শেষে যখন তারা মারধর করে ঘর থেকে বের করে দিয়ে বলে দেয় টাকা যদি না নিয়ে আসিস, তা হলে তোকে তালাক দিয়ে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে ছেলের আবার বিয়ে দেব। সেই থেকে আজ চার পাঁচ মাস হল মা বাপের সংসারে রয়েছে।
সাফিয়া লেখাপড়া না করলেও বেশ চালাক চতুর। সাবালক হওয়ার পর বাইরে বেরোলে সবাই যে তার দিকে তাকিয়ে থাকে বুঝতে পারে। তাই খুব। দরকার না হলে ঘরের আশপাশ ছাড়া দূরে কোথা যায় না।
দবির ও তার বৌ হাজরা মাতব্বরের ছেলে রশিদের স্বভাব চরিত্রের কথা জানে। তাই তারাও মেয়েকে বড় একটা বাইরে যেতে দেয় না। তবু একদিন সাফিয়া রসিদের সামনে পড়ে গিয়েছিল। সে দিন হাজেরার খুব জ্বর থাকায় সাফিয়াকে মাতব্বরের পুকুরে থেকে পানি আনতে পাঠিয়েছিল। পানি নিয়ে ফেরার সময় রসিদের সামনে পড়ে যায়।
রশিদ তখন বাইরে থেকে ঘরে ফিরছিল। সাফিয়াকে দেখে পথ আগলে বলল, তুই দবিরের মেয়ে না?
রশিদকে দেখে সাফিয়ার বুক ভয়ে ধুকধুক করতে লাগল। কোনোরকমে বলল, হ্যাঁ।
রশিদ বলল, বিয়ের পর তুই আগের থেকে আরো বেশি সুন্দরী হয়েছিস। তারপর জিজ্ঞেস করল, তুই রোজ আমাদের পুকুর থেকে পানি নিতে আসিস?
সাফিয়া বলল, না, মা নিয়ে যায়। আজ তার খুব জ্বর, তাই আমি এসেছি।
রশিদ বলল, তোর মা পানি নিতে আসে। তার কষ্ট হয় না? এবার থেকে তুই আসবি বুঝলি?
সাফিয়া কিছু না বলে পাশকেটে চলে এসেছিল। তারপর থেকে সে আর কোনো দিন মাতব্বরের পুকুর থেকে পানি আনতে যায় নি।
মেয়ে স্বামীর ঘর থেকে চলে আসায় দবির খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে। মাতব্বরের ছেলে রশিদের কথা ভেবে। তাই তাকে বাইরে কোথাও যেতে নিষেধ করে দিয়েছে।
গত দুদিন দবির কাজ পাই নি। তাই তার ঘরে দুদিন হাঁড়িও চড়ে নি। আজ খা পড়ায় একজনের কাজে গেছে।
দুপুরের দিকে ছোট ছেলেমেয়েদের কান্না সহ্য না করতে পেরে হাজেরা সন্ধ্যের সময় দিয়ে যাবে বলে পাড়ার সুবেদ আলি চাচার বৌ-এর কাছ থেকে এক কেজি চাল ধার নিয়ে এসে সাফিয়াকে বলেছিল, যাতো মা, মাতব্বরের পুকুর পাড় থেকে কিছু কলমী শাক নিয়ে আয়। শুধু নুন ভাত কি করে তোরা খাবি।
সাফিয়ার তখন রশিদের কথা মনে পড়তে বলল, সেদিন পানি আনতে গিয়ে মাতব্বরের ছেলের সামনে পড়ে গিয়েছিলাম। তাকে দেখলে আমার খুব ভয় করে।
অন্য সময় হলে হাজেরা মেয়ের কথা বুঝতে পারত। তাকে না পাঠিয়ে নিজেই যেত, কিন্তু দু’দিন পেটে কিছু পড়েনি তার উপর গায়ে জ্বর। তাই বুঝতে না পেরে রাগের সঙ্গে বলল, মাতব্বরের ছেলে কি তোকে গিলে খেয়ে ফেলবে? যা বললাম কর।
সাফিয়া মাকে রেগে যেতে দেখে আর কিছু না বলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও শাক তুলতে গিয়েছিল।
