ফাহমিদার কথা শুনে শামীর মনে হল, তার মাথায় বিনা মেঘে বজ্রাঘাত হল। সে মুক ও বধির হয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। ফাহমিদা এরকম কথা বলবে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার মনে হল, সে স্বপ্ন দেখছে না তো? এক হাত দিয়ে অন্য হাতে চিমটি কেটে বুঝতে পারল, স্বপ্ন নয় বাস্তব। কিছুক্ষণ চুপ চাপ বসে থেকে নিজেকে সামলে নিল। তারপর দৃঢ়কণ্ঠে বলল, এতদিন সেকথা জানালে না কেন? আমি তো অনেক আগে তোমার মতামত জানার জন্য সুদীর্ঘ একটা পত্র দিয়েছিলাম। সেদিন তুমি কি উত্তর দিয়েছিলে, আর আজ আবার এসব কি বলছ, তা কি একবারও ভেবে দেখেছ? তোমার খালাত ভাইয়ের সাথে বিয়ের কথা নিশ্চয় অনেক আগে হয়েছে। তারপরও তোমার নিখুৎ অভিনয়ের জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু কেন এমন করলে ফাহমিদা? আমাকে গাছে তুলে মই কেড়ে নিলে কেন? তুমি নিশ্চয় জান, তোমাকে পাওয়ার জন্য নির্ঘাৎ মৃত্যু জেনেও আমি গাছ থেকে লাফ দিতে এতটুকু দ্বিধা বোধ করব না? তবু এমন কাজ করতে পারলে? তোমাকে নিয়ে কলেজে ও বন্ধু মহলে কত রকমের কথা হয়েছে। তোমার জন্য অনেকের কাছ থেকে অনেক অপমান। সহ্য করেছি। তবু আমি সেসব গায়ে মাখিনি। তোমার ভালবাসার পানিতে অবগাহন করে ধুয়ে মুছে ফেলেছি। তোমার খালাত ভাইকে যখন থেকে ভাল লাগল তখন যদি জানাতে, তা হলে আজ ডেকে পাঠাতাম না। যাই হোক, এতদিনে আল্লাহ তোমাকে। সুমতি দান করেছেন, সেজন্য তার দরবারে জানাচ্ছি শতকোটি শুকরিয়া। দোয়া করি, তিনি যেন তোমাকে প্রত্যেকটা কাজ করার পূর্বে চিন্তা করার তওফিক দান করেন। বিদায় লগ্নে একটা কথা বলে যাই, যেদিন থেকে তোমাকে ভালবেসেছিলাম সেদিন তোমাকে যে কথা বলেছিলাম, আজ আবার সেই কথাই বলছি; আমার ভালবাসার মধ্যে কোনো মোহ বা সার্থ নেই। যদি থাকত, তা হলে সে সব পূরণ করার সুযোগ অনেক পেয়েছিলাম। তোমার মন একাধিক হতে পারে। সেই জন্য তুমি একাধিক লোককে ভালবাসতে পার। কিন্তু আমার মন একটা। সেই মন সম্পূর্ণরূপে তোমাকেই দান। করেছি। অন্য মেয়েকে দেয়ার মতো আমার আর মন নেই। তুমি আমাকে বিদায় দিলে ভালো কথা কিন্তু আমি তোমাকে বিদায় দিতে পারব না। তোমার জন্য আমার মনের দুয়ার চিরকাল ভোলা থাকবে। আমার জীবদ্দশায় তুমি যে কোনো সময় আমার কাছে এলে, আমি তোমাকে সানন্দে গ্রহণ করব। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু জীবনে আর কোনো দিন এই ভগ্নহৃদয় নিয়ে তোমার কাছে ভালবাসার দাবি করব না। আল্লাহ যেন তোমাকে সুখ শান্তি দান করেন এবং তোমার সার্বিক সফলতা দান করেন, সেই কামনা করে বিদায় নিচ্ছি। আসি, আল্লাহ হাফেজ বলে শামী হন হন করে সেখান থেকে বেরিয়ে এল। তার মাথায় তখন তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। কি করে সে বাড়ি পর্যন্ত এল, তা সে বুঝতে পারল না। নিজের রুমে এসে বিছানায় শুয়ে চোখের পানিতে বালিস ভিজাতে লাগল।
ফাহমদিার এহেন কঠোর কথা এবং শামীর করুন কথাগুলো শুনে জোবেদার দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। শামী চলে যাওয়ার পর চোখ মুখ মুছে ঘরে ঢুকে ফাহমিদাকে বলল, আমি দরজার আড়াল থেকে তোদের সব কথা শুনেছি। তুই এত নিষ্ঠুর? তোর মন এত পাষাণ? সরলমনা শামী ভাইকে এই রকম কঠোর আঘাত করতে পারলি? তারমতো ভালো ছেলে আমি আর দ্বিতীয় দেখি নি। মনে করেছিলাম, শামী ভাই হয়তো তোর কাছে কোনো অন্যায় করেছে। কিন্তু এখন বুঝলাম, আমার ধারণা ভুল। তোর মনে যদি এই ছিল, তবে কেন আগে তাকে জানাস নি? কেন তার সঙ্গে এতদিন প্রেমের খেলা খেলে বিষাক্ত ছোবল মারলি? শামী ভাই কি তোর বিষাক্ত ছোবল সহ্য করতে পারবে? তুই পাষাণী। তুই মেয়েদের মধ্যে কলংকিনী। আজ থেকে তোর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। এক্ষুনি তুই এখান থেকে চলে যা। আর কোনোদিন আসবি না। তারপর সে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল।
ফাহমিদা বলল, ঠিক আছে, আজ থেকে তোর সাথে আমারও কোনো সম্পর্ক নেই। আর তোদের বাড়িতে আসারও প্রত্যাশী আমি নই। তবে যাবার আগে একটা কথা না বলে থাকতে পারছি না, বলি শামীর জন্য তোর এত দরদ কেন? তার কি হবে না হবে, তা নিয়ে তোর এত মাথা ব্যথা কেন? এত কান্নাকাটিই বা করছিস কেন? তা হলে কি বুঝবো, তুই তাকে ভালবাসিস? যদি তাই হয়, তা হলে তো তোর খুশী হবার কথা। আমি সরে গিয়ে তোর লাইন ক্লিয়ার করে দিলাম।
জোবেদা কান্না থামিয়ে কর্কশকণ্ঠে বলল, তোর মুখে আর ভালবাসার কথা শোভা পায় না। অমন কথা তোর মুখে আনা উচিতও হয় না। তারপর স্বর পাল্টে বলল, শামী ভাই তোকে মনপ্রাণ উজাড় করে ভালবেসেছিলেন। আর তুইও তাকে গরিব জেনে ভালবেসেছিলি। তোর খালাত ভাইকে দেখে মুগ্ধ হয়ে এবং তার অনেক টাকা পয়সা আছে জেনে শামী ভাইয়ের সঙ্গে তুই বেঈমানী করলি। এখন আবার নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাতে চাচ্ছিস। শামী ভাই তোকে ছাড়লেও আল্লাহ ছাড়বে না। তিনি ন্যায় বিচারক। বেঈমানী করার ফল তোকে একদিন না একদিন ভোগ করতেই হবে। তোর কথা শুনে বলতে বাধ্য হচ্ছি, শামী ভাই যদি তার জুতোর ধুলোর একটা কণার মত আমাকে ভালবাসত, তা হলে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করতাম। তুই যে কত বড় ভুল করলি, তা একদিন বুঝতে পারবি।
ফাহমিদা রাগের সঙ্গে বলল, শামীকে যদি তাই ভাবিস, তা হলে এবার প্রেম নিবেদন করে তার ভগ্নহৃদয় জোড়া লাগাবার চেষ্টা কর।
