শুরুতেই হৈচৈয়ে যাবে না বুবু। ঠাণ্ডা মাথায় ক্রস এগজামিন করবে।
সুলতানা বললেন, যে অবস্থা এই লোক করেছে তারপর কি আর মাথা ঠাণ্ডা থাকবে?
রঞ্জু বলল, কথাবার্তা কী হবে তা কাজের মেয়ে দুটির শোনা ঠিক হবে। না। আমি এই দুজনকে নিয়ে যাচ্ছি।
তোর যা ভালো মনে হয় কর।
অনিকা থাকুক তোমার সঙ্গে। তোমার মনের যে অবস্থায় একা না থাকাই ভালো। ডিসকাশন যখন শুরু হবে তখন অনিককে পাশের ফ্ল্যাটে পাঠিয়ে দিলেই হবে। তোমাদের পুরো কথা বার্তার একটা অডিও রেকর্ড থাকা দরকার। আমার এই মোবাইলে চার ঘণ্টা অডিও রেকর্ড হয়। তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। তুমি সময় বুঝে বোতাম টেপে দিও।
জোয়ার্দার অফিস ক্যানটিনে বসে আছেন। তার সামনে হাফ প্লেট কাচি বিরিয়ানি। তিনি অর্ডার দিয়েছেন পাবদা মাছ, সবজি, ডাল। ক্যানটিনের বয় তাঁর সামনে কাঁচ্চি বিরিয়ানি রেখেই চলে গেছে। সে চরকির মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।
খালেক এগিয়ে এল। তাঁর সামনের চেয়ারে বসতে বলল, স্যার আছেন।
কেমন?
ভালো।
একটা কথা বলেন তো স্যার। গত রাতে ড্রাইভার কি আপনাকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল? নাকি বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে?
জোয়ার্দার জবাব দিলেন না। তিনি ক্যানটিনের বয়কে খুঁজছেন। প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে। খাবারটা বদলানো দরকার।
খালেক বলল, আমার বাসায় এই নিয়ে বিরাট ক্যাচাল। আমার স্ত্রী একশ ভাগ নিশ্চিত ড্রাইভার আপনাকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে। ড্রাইভারের কোনো কথাই শামা শুনবে না। ড্রাইভারের চাকরি নষ্ট হয়ে গেছে।
তাই নাকি?
ভালো একজন ড্রাইভার পাওয়া আর গুপ্তধন পাওয়া একই ব্যাপার। ঐ জিনিস শামা বুঝবে না।
আপনার ড্রাইভার খুব ভালো?
অবশ্যই ভালো। গাড়িটাকে সে নিজের সন্তানের মতো যত্ন করে। এক বছর হয়েছে গাড়ি কিনেছি, এখনো গাড়িতে দাগ পড়ে নাই। এখন আপনি কি স্যার দয়া করে আমার স্ত্রীকে বলবেন ড্রাইভার আপনাকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। তাহলে গরিব কেচারার চাকরিটা থাকে, আমাকেও একজন ভালো ড্রাইভার হারাতে হয় না।
আচ্ছা আমি বলব।
আমি মোবাইলে শামাকে ধরে দিচ্ছি, আপনি একটু কথা বলুন। আমি জানি ড্রাইভার আপনাকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে। শ্যামা যখন বলছে তখন ঘটনা এটাই। শামা একটা কথা বলেছে আর কথাটা ঠিক হয় নাই তা হবে। না। পীর নিয়ে সংসার করি। যন্ত্রণার সীমা নাই। একজন পুরুষ মানুষের স্ত্রী প্রয়োজন, মহিলা পীর না। মহিলা পীর দিয়ে আমি কি করব? সকাল বিকাল কদমবুসি করব?
খালেক মোবাইলে ফোনে তাঁর স্ত্রীকে ধরে ফোন জোয়ার্দারের দিকে এগিয়ে দিলো। জোয়ার্দার ইতস্তত করে বললেন, শামা। একটা কথা।
শামা বলল, কি কথা বলতে চাচ্ছেন আমি জানি। আপনাকে কিছু বলতে হবে না। ড্রাইভারের চাকরি থাকবে। স্যার আপনি ভালো আছেন?
আমার ধারণা আপনি ভালো নেই। এক দিন আমার বাসায় আসবেন। আপনার সঙ্গে আলাদা কথা বলব।
আচ্ছা।
আজ কি আসতে পারবেন?
না।
জোয়ার্দার টেলিফোন রেখে দিলেন। খালেক বলল, স্যার আপনি তো মূল কথাটাই বলেন নাই।
জোয়ার্দার বললেন, বলেছি। ড্রাইভারের চাকরি থাকবে।
খালেক আনন্দিত গলায় বলল, বলেন কী? বড় বঁচা বঁটাচলাম।
জোয়ার্দার বাসায় ফিরেছেন। বাসা আগের মতোই লণ্ডভণ্ড অবস্থায় আছে।
মেঝেতে তুলা উড়ছে। সুলতানার প্রেসার অতিরিক্ত বেড়েছে বলে ডাক্তার এসে ঘুমের ওষুধ দিয়ে তাকে শুইয়ে রেখেছেন। অনিকা আতংকে অস্থির হয়ে বিড়াল কোলে মায়ের পাশে বাসা।
রঞ্জু দুই কাজের মেয়েকে নিজের বাড়িতে রেখে আবার ফিরে এসেছে। এর মধ্যে তার পোষাকের পরিবর্তন হয়েছে। সে পরেছে প্রিন্স কোটি। গলায় বো টাই। তাকে হোটেলের বেয়ারার মতো লাগছে।
রঞ্জু বসার ঘরে। তার মুখ থমথম করছে। জোয়ার্দার বললেন, কেমন আছে রঞ্জ?
রঞ্জু বলল, আমি ভালো আছি। যদিও ভাল থাকার মতো অবস্থা আমাদের কারোরই নেই। আপনি এখানে বসুন।
বিচার সভা নাকি?
বিচার সভা হবে কি জন্যে? আপনার বিচার করার আমি কে? ঘটনা। কী বলুন তো। ঘর ভর্তি তুলা কেন?
বালিশ ছিঁড়ে তুলা বের হয়েছে।
বালিশ ছিঁড়েছে কে?
পুফি ছিঁড়েছে। অবশ্যি আমি তার নাম দিয়েছি কুফি। কুফি। একটা বিড়াল।
দুলাভাই! আপনি তো মানসিক রোগীর মতো কথা বলছেন। আপনার কথাবার্তা যে অসংলগ্ন এটা বুঝতে পারছেন?
হুঁ।
আপনি কিছু গোপন করতে চাইলে করবেন। আমাদের সবারই গোপন করার মতো কিছু না কিছু থাকে। বুবু বলেছিল। শায়লা নামের এক ডাক্তার মেয়েকে বাসায় নিয়ে রাত কাটিয়েছেন। শ্যামলা রঙ। কথাটা কি সত্যি?
জোয়ার্দার কিছু বলার আগেই সুলতানা ঝড়ের মতো উপস্থিত হলেন। অনিক এল তার পিছু পিছু। অনিক দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। বাবার জন্যে তার খুব খারাপ লাগছে। সে জানে, বাবাকে মা বের করে দেবে। তার মা অনেকবার এই কথা অনিককে বলেছে। বাবা যাবে কোথায়?
রঞ্জু বলল, বুবু যা বলার ঠাণ্ডা গলায় বলে। তোমার শরীর খুবই খারাপ। প্রেসার অনেক হাই-এটা মনে রাখতে হবে।
সুলতানা বলল, আমি ওই বদমাইশ লোকের সঙ্গে কথাই বলব না। তুই বদমাইশটাকে চলে যেতে বল। এ বাড়িতে সে থাকতে পারবে না।
জোয়ার্দার বললেন, আমি যাব কোথায়?
সুলতানা বললেন, রঞ্জু তুই ওই বদমাইশটাকে বল সে কোথায় যাবে এটা তার ব্যাপার। তাকে এই মুহূর্তে ঘর থেকে বের হতে বল।
