রিয়াজুল খুব চিন্তায় পড়ে গেল। বড় বোন থাকতে ছোট বোনের কথা কি করে বলবে? আবার না করলে মা-বাবা মনে ব্যথা পাবে। মনে মনে আল্লাহকে বলল, তোমার কালাম পাকে ও নবী (দঃ) হাদিসে পড়েছি মা-বাবার মনে কষ্ট দেওয়া কবিরা গোনাহ। তা হলে কী সালেহাকে তুমি আমার জোড়া করনি?
তাকে চুপ করে থাকতে দেখে জাহেদা ভাবলেন, রাজি থাকলেও লজ্জায় বলতে পারছে না। বললেন, আসমাকে বৌ করার জন্য আমরা মোসারেফ ভাইকে প্রস্তাব দিয়েছি। উনি খুব আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে বললেন, তোর আব্বা ও তার সঙ্গে নাকি কথা হয়েছিল, ছেলে মেয়ে যার যাই হোক না কেন তাদের বিয়ে দেবেন। আমরা দিন ধার্য করতে চাই। তোর কিছু বলার থাকলে বল।
রিয়াজুলের মনের অবস্থা খুব খারাপ। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও একরকম বাধ্য হয়ে বলল, এ ব্যাপারে আপনারা যা করবেন তাতে আমার আপত্তি নেই। তবে বিয়েটা গ্রামের বাড়িতে হবে। আমি গিয়ে ছোট চাচাকে আপনাদের মতামত জানাব। তারপর চিঠি দিয়ে আপনাদেরকে যেতে বলব। আপনারা গিয়ে ছোট চাচার বাড়িতে উঠবেন। তারপর তাকে নিয়ে সবকিছু করবেন। নচেৎ তিনি মনে খুব কষ্ট পাবেন। তারপর সেখান থেকে চলে গেল।
জাহিদা ফিরে এসে বললেন, রিয়াজুল বিয়েতে রাজি আছে। তারপর বিয়ে কোথায় ও কিভাবে হবে সে কথাও বললেন।
মুনসুর আলি বললেন, সে খুব ভালো কথা বলেছে। তারপর মোসারেফ হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তা হলে এটাই পাকা কথা?
মোসারেফ হোসেন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বললেন, আপনাদের মতামতই আমার মত।
৯-১০. প্রায় একমাস পর
প্রায় একমাস পর রিয়াজুল মোসারেফ হোসেন ও আসমাকে নিয়ে জয়নগরে ফিরে এল। মোসারেফ হোসেন ঢাকায় চিকিৎসা করিয়ে ভালো হয়ে ফিরে এসেছে জেনে গ্রামের লোকজন। এসে দেখা করে যেতে লাগল। মোসারেফ হোসেন তাদের কাছে রিয়াজুলের গুণাগুণের কথা বললেন। ফলে রিয়াজুলের সুনাম আরো বেশি ছড়িয়ে পড়র। আসমার মামা-মামীরাও এসে দেখা করে যাওয়ার সময় রিয়াজুলকে অনেক দোয়া করে গেলেন।
ভাইপো রিয়াজুল যে মোসারেফ হোসেনকে সাহায্য করছে তা জেনে নূরুদ্দিন মিয়া বড় ছেলে আলাউদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করে বললেন, খুন-খারাবি করলে ঝামেলা হওয়াই স্বাভাবিক। তাই ভাবছি রিয়াজুল তো পঙ্গু মোসারেফ হোসেনের ঘরে ঘন ঘন যাওয়া আসা করছে। তার বড় মেয়ে আসমার সঙ্গে দুর্নাম রটিয়ে বিচারের ব্যবস্থা কর। আর প্রমাণের জন্য তাদেরকে কুকীর্তি করতে দেখেছে এমন দু’জন সাক্ষী জোগাড় করার ব্যবস্থাও কর। বিচারে রিয়াজুলকে এমন অপমানজনক শাস্তির ব্যবস্থা করব যাতে ঢাকা ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
কিন্তু পরামর্শ মত কাজ করার আগেই রিয়াজুল মোসারেফ হোসেন ও আসমাকে নিয়ে ঢাকা চলে যায়। ফিরে আসার খবর পেয়ে আলাউদ্দিনকে বললেন, এবার আর দেরি না করে কাজে লেগে পড়।
আলাউদ্দিন বলল, আপনি বলার আগে সোরাব ও খলিলকে রিয়াজুলের গতিবিধি লক্ষ্য রাখতে বলেছি।
.
মোসারেফ হোসেনের বিশ্বাস রিয়াজুলের মতো ছেলের সঙ্গে বিয়েতে আসমা অরাজি হবে না বরং নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে করবে। তাই ঢাকাতে মেয়েকে কথাটা জানান নি। বাড়িতে এসে ঐদিন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর প্রথমে স্ত্রীকে জানালেন।
মাহমুদা বিবি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বললেন, এত বড় ভাগ্য আসমার হবে?
মোসারেফ হোসেন বললেন, আল্লাহর ইচ্ছা থাকলে কি না হয়। মা আমার রাজকপাল নিয়ে জন্মেছে। তারপর রিয়াজুলের বাপের সঙ্গে ওয়াদার কথা বলে বললেন, তোমাকেও তো কথাটা বলেছিলাম, মনে আছে?
ভুলে গিয়েছিলাম, তুমি বলতে মনে পড়ল।
আসমাকে ডেকে আন, শুনলে সেও নিশ্চয় খুশি হবে।
মাহমুদা বিবি মেয়ের নাম ধরে ডেকে আসতে বললেন।
আসমা পাশের রুমে ছোট দু’ভাই বোনকে নিয়ে একটা বড় খাটে ঘুমায়। তাদের ঘুমাতে বলে মতির কথা চিন্তা করছিল। আজ একমাস তাকে দেখেনি। এমন সময় মায়ের। ডাক শুনে তাদের কাছে এল।
মোসারেফ হোসেন মেয়েকে পাশে বসতে বললেন। বসার পর তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, রিয়াজুলের মা-বাবা তোকে দেখে খুব পছন্দ করেছেন। তারা তোকে বৌ করতে চান। শুনে আমি তো প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। মনে হয়েছিল স্বপ্ন দেখছি। পরে তাদের কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে বুঝতে পারলাম স্বপ্ন নয়, বাস্তব। রিয়াজুলের মতামত নেওয়া হয়েছে, সে রাজি আছে। কিছুদিনের মধ্যে তারা এসে রিয়াজুলের ছোট চাচাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে বিয়ের ব্যবস্থা করবেন।
আব্বার কথা শুনে আসমার মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রাঘাত পড়ল। মাথা বনবন করে ঘুরতে লাগল। বাড়ি-ঘর দুলতে লাগল। মুখ নিচু করে ও চোখ বন্ধ করে সামলাবার চেষ্টা করল। তার মনে হল, রিয়াজুল ভাই তা হলে এইজন্যই আমাদেরকে সাহায্য করছে। তখন রিয়াজুলের প্রতি তার প্রচণ্ড রাগ হল।
মোসারেফ হোসেন মনে করলেন, মেয়ে লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে আছে। বললেন, রিয়াজুল খুবই চরিত্রবান ও সৎ ছেলে। তুই সুখি হবি মা। ওর মা-বাবাও যে খুব ভালো মানুষ, তা তো তুই নিজেই দেখেছিস।
আসমা খুব স্পষ্টবাদী ও একরোখা মেয়ে। তবু এ বিয়েতে মত নেই বলতে গিয়ে সামলে নিল। কারণ তখন তার ডাক্তারের কথা মনে পড়ল। কোনো কারণেই উত্তেজিত হতে দেবেন না। নচেৎ আবার পঙ্গু হয়ে যাবেন অথবা হার্টফেল করে মারা যাবেন, কোনো রকমে বলল, আমার বড় মাথা ধরেছে, আমি এখন যাই।
