বেশ তো, তাই করা যাবে।
মোসারেফ হোসেন ক্লিনিক থেকে ফিরে আসার পরের দিন মাগরিবের নামাযের পর জাহেদা স্বামীকে বললেন, চলো আসমার বাবার সঙ্গে কথাটা আলাপ করা যাক। মুনসুর আলী বললেন, বেশ তাই চলো।
মোসারেফ হোসেন নামায শেষ করে বসে বসে তসবিহ পড়ছিলেন। ওদের দেখে তসবিহ পকেটে রেখে বললেন, আসুন, বসুন।
বসার পর বললেন, আর কতদিন আপনাদের বিরক্ত করব? এবার দু’একদিনের মধ্যে যাওয়ার অনুমতি দিন।
মুনসুর আলি বললেন, বিরক্ত হব কেন? বরং আমরা ভাবছি এখানে আপনাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা।
কি যে বলেন ভাই সাহেব, যে সেবা-যত্ন আপনাদের কাছে পেয়েছি তা কোনোদিন কল্পনাও করিনি।
ওসব কথা থাক ভাই, যদি কিছু মনে না করেন, তা হলে আমরা একটা কথা আলাপ করতে চাই।
একটা কেন? হাজারটা করুন, মনে কিছু করব না। আপনারা নিশ্চিন্তে বলুন।
আমরা আসমাকে বৌ করতে চাই। আপনি রাজি থাকলে কথাবার্তা বলে বিয়ের দিন ধার্য করব।
মোসারেফ হোসেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। আনন্দে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললেন। বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। একসময় তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।
মুনসুর আলি বললেন, কী হল ভাই সাহেব, কথাটা শুনে কী খুব দুঃখ পেলেন? যদি তাই হয়, তা হলে মাফ…….।
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে মোসারেফ হোসেন ভিজে গলায় বললেন, না ভাই সাহেব না, এতটুকু দুঃখ পাইনি। বরং এত বড় সুসংবাদ শুনে আনন্দ ধরে রাখতে পারছি না। এই কান্না দুঃখের নয়, আনন্দের। আসমার কী এত বড় ভাগ্য হবে যে, আপনাদের বৌ হবে? আমি যে ভাবতেই পারছি না। তারপর চোখ মুছে বললেন, আপনারা কথাটা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, রিয়াজুলের আব্বা ও আমি ওয়াদা করেছিলাম, আমাদের যারই ছেলে অথবা মেয়ে হোক না কেন, তাকে বৌ অথবা জামাই করব। কথাটা এতদিন ভুলে গিয়েছিলাম, আপনারা প্রস্তাব দিতে মনে পড়ে গেল। সে সময় হয়তো আল্লাহ আমাদের ওয়াদা কবুল করেছিলেন। তাই তিনি আপনাদের দ্বারা প্রস্তাব দেওয়ালেন।
মুনসুর আলি শোকর আল-হামদুলিল্লাহ বলে বললেন, সৌভাগ্যের কথা কি বলছেন ভাই, সবকিছু আল্লাহর ইশারা।
এতক্ষণ জাহেদা চুপ করেছিলেন। এবার বললেন, তা হলে শুভ কাজে দেরি করে কি লাভ। এখনই দিন ধার্য হয়ে যাক।
মোসারেফ হোসেন বললেন, তার আগে রিয়াজুলের মতামত জানা দরকার নয় কি?
আমাদের মতামতই তার মতামত। আমাদের কথা সে কখনো এতটুকু অমান্য করেনি।
আল-হামদুলিল্লাহ বলে মোসারেফ হোসেন বললেন, তবু ওর মতামত নিয়েই দিন ধার্য। করা উচিত।
জাহেদা বলল, ঠিক আছে আমি এক্ষুণী ওকে জিজ্ঞেস করে আসছি। তারপর স্বামীকে বললেন, তুমি গল্প কর, আমি যাই। কথা শেষ করে চলে গেলেন।
জাহেদা নিজের রুমে যাওয়ার সময় কাজের মেয়েকে ডেকে বললেন, রিয়াজুলকে আসতে বল।
কাজের মেয়ে রিয়াজুলের কাছে গিয়ে বলল, আম্মা আপনাকে ডাকছেন।
রিয়াজুল আসমার সঙ্গে মুফতী মাওলানা মুনসুরুল হক রচিত নারীর মান বইটা তার হাতে দিয়ে সংসারে নারীর ভূমিকা ও অধিকার সম্বন্ধে আলোচনা করছিল। কাজের মেয়ের কথা শুনে আসমাকে বলল, তুমি এটা পড়। আমি আসছি। তারপর মায়ের কাছে এসে বলল, তুমি নাকি ডেকেছ?
জাহেদা বললেন, হ্যাঁ ডেকেছি। বস।
রিয়াজুল মায়ের পাশে বসল।
জাহেদা বললেন, আমরা তোর বিয়ে দিতে চাই। মেয়েও পছন্দ করেছি। তোর মত পেলে মেয়ের বাবার সঙ্গে কথাবার্তা বলব।
বিয়ের কথা শুনে রিয়াজুলের সালেহার কথা মনে পড়ল। বলল, এত তাড়াহুড়া করছ কেন? আগে স্বাবলম্বী হয়ে নিই। তারপর যা করার করো।
দেশে তোর বাবার যে সম্পত্তি পেয়েছিস তার এক বছরের ফসলে দু’তিন বছর নবাবী হালে চলতে পারবি। সাবলম্বী হওয়ার কথা বলছিস কেন?
বাবার সম্পত্তির উপর ভরসা করে আমি বিয়ে করব না। তা ছাড়া শুধু নিজেদের কথা ভাবলে চলবে? ভবিষ্যৎ বংশধরদের কথা চিন্তা করতে হবে না?
বিয়ের পরেও তা করতে পারবি।
তা হয়তো পারব। তবু আমি কিছু করে সাবলম্বী হতে চাই।
তোর আব্বা আর কতদিন ব্যবসা চালাবে। তুই তাকে সাহায্য করবি না?
ভেবেছি, গ্রামের কিছু জমি বিক্রি করে ঐ ব্যবসাটাই বড় করব।
তা হলে বিয়েতে অমত করছিস কেন? সারাদিন আমি একা বাসায় যোবার মত থাকি। কাজের বুয়ার সাথে কি আর কথা বলব। বৌ হলে তার সঙ্গে গল্প করতাম। তুই অমত করিস না বাবা, যে মেয়ে আমি ও তোর আব্বা পছন্দ করেছি, তাকে তোরও পছন্দ হবে।
রিয়াজুল ভেবে রেখেছে, মোসারেফ চাচা সুস্থ হওয়ার পর একটা ভালো ছেলে দেখে আসমার বিয়ে দেবে। তারপর সালেহা এস.এস.সি. পাশ করার পর তাকে বিয়ে করবে। তাই মা-বাবার পছন্দ করা মেয়ের কথা শুনে কিভাবে সালেহার কথা বলবে চুপ করে ভাবতে লাগল।
জাহেদা বললেন, কি রে, চুপ করে কি ভাবছিস? তুই কী কোন মেয়েকে পছন্দ করিস?
রিয়াজুল লজ্জায় কিছু বলতে না পেরে চুপ করে রইল।
বল না লজ্জা করছিস কেন? আমি তোর মা না? আমাকে বলতে লজ্জা কিসের।
তোমরা যে মেয়েকে পছন্দ করেছ, তার পরিচয় আগে বল।
আসমাকে আমরা পছন্দ করেছি।
রিয়াজুল চমকে উঠে একবার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে নিল।
জাহেদা বললেন, আসমার মতো মেয়ে আজকাল হয় না। তোর আব্বা বলছিল, ওর মতো মেয়েই এ বাড়ির বৌ হওয়ার উপযুক্ত। আমারও তাই মনে হয়। তুই যদি না করিস, আমার চেয়ে তোর আব্বা বেশি মনে ব্যথা পাবে।
