তোমার কথা শুনে খুশি হলাম। কিন্তু বাবা, তুমি যা করতে চাচ্ছ তা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমন প্রচুর টাকা পয়সারও দরকার।
তা আমি জানি। তবু আব্বার বন্ধু হিসাবে আমি কিছু করবই ইনশাআল্লাহ। আর ভালো কাজে ঝুঁকি তো থাকবেই। আল্লাহ ও রাসুল (দঃ) কে খুশি করার জন্য বিপদকে আমি ভয় করি না। হাদিসে পড়েছি এরকম কাজে বিপদে পড়লে আল্লাহ সাহায্য করেন। আপনার কাছ থেকে শুধু সহযোগিতা পেতে চাই।
ইনশাআল্লাহ আমি তোমাকে নিশ্চয় সহযোগিতা করব। একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করে পারছি না, আমি তো জানি তুমি মাদ্রাসায় পড়নি স্কুল কলেজে পড়েছ কোরআন হাদিসের এত জ্ঞান তোমার হল কি করে?
রিয়াজুল মৃদু হেসে বলল, কলেজে পড়ার সময় একটা ছেলের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। সে তাবলীগ করত। এখনো করে। কয়েকটা চিল্লাহ্ দিয়েছে। তার সঙ্গে মিশে আমি ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ি। লেখাপড়ার সাথে সাথে কোরআন হাদিসের ব্যাখ্যা পড়তে শুরু করি। দু’তিনটে চিল্লাও দিয়েছি। চিল্লাতে গিয়ে বুঝতে পেরেছি, কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা পড়লে শুধু ধর্মীয় জ্ঞান বাড়ে এবং তা মেনে চলার প্রেরণাও আসে, কিন্তু জামাতের সঙ্গে চিল্লাতে গেলে সেই প্রেরণা হাজার গুণ বেড়ে যায়। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত, সময় সুযোগ করে চিল্লাতে যাওয়া। আপনি কি কখনও গিয়েছেন?
না বাবা যাইনি, তবে তাবলীগ জামাতের সঙ্গে ওঠা বসা করে বুঝতে পেরেছি, চিল্লাতে গেলে চরিত্রের সংশোধন হয়। ধর্মের পথে, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার প্রেরণা পাওয়া যায়।
খায়রুন্নেসা বিবি এতক্ষণ রান্না করছিলেন। রান্নার কাজ শেষ করে তাদের কাছে এসে বললেন, তোমরা এখনও কথা বলছ? কত বেলা হয়েছে খেয়াল আছে? এক্ষুণি যোহরের আজান হবে। যাও গোসল করে এস।
মাগরিবের নামায পড়ে সামসুদ্দিন মিয়া মোসারেফ হোসেনের বাড়িতে গেলেন।
বছর দুই আগে গ্রামে বিদ্যুৎ এলেও মোসারেফ হোসেন নিতে পারেননি। হমুদা বিবি লম্ফ জ্বালিয়ে রান্নাঘরে রান্না করছেন। সালেহা মাকে সাহায্য করছে। আসমা বারান্দায় পাটি বিছিয়ে হারিকেনের আলোতে দুই ভাই বোনকে পড়াচ্ছে।
সামসুদ্দিন মিয়া উঠোনে এসে বললেন, কই গো আসমা, তোমরা কি করছ?
হারিকেনের আলোর কাছ থেকে দূরের কিছু দেখা যায় না। আসমা গলা শুনে বুঝতে পারল, সামসুদ্দিন চাচা এসেছেন। উঠোনের দিকে তাকিয়ে বলল, এদের পড়াচ্ছি, আপনি আসুন চাচা। তারপর এগিয়ে এলে সালাম দিল।
সামসুদ্দিন মিয়া সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, কয়েক দিন আসতে পারিনি। তোমার আব্বা কেমন আছেন?
ঐ একই রকম, আসুন বলে আসমা তাকে সঙ্গে করে রুমে এসে বলল, আব্ব মিয়া বাড়ির ছোট চাচা এসেছেন। তারপর চেয়ারটা খাটের কাছে এগিয়ে দিয়ে সামসুদ্দিন মিয়াকে বলল, বসুন চাচা।
সামসুদ্দিন মিয়া মোসারেফ হোসেনের সঙ্গে সালাম বিনিময় করে বললেন, চিকিৎসা তো অনেক করালেন, আগের থেকে কিছু উন্নতি হচ্ছে বলে মনে হয়?
মোসারেফ হোসেন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, কই আর উন্নতি হল, এখনও নিজে উঠে বসতে পারি না। আমার কথা বাদ দিন, আপনারা কেমন আছেন বলুন?
আল্লাহর রহমতে আমরা ভালো আছি। তারপর টাকাটা পকেট থেকে বার করে বালিশের নিচে রেখে বললেন, এখানে এক হাজার টাকা আছে। মেজ ভাইয়ের ছেলে রিয়াজুল পরশু এসেছে। রাত্রে আমার কাছে আপনার ও মেজ ভাইয়ের বন্ধুত্বের কথা ও আপনার ভাগ্য বিপর্যয়ের কথা শুনে সকালের দিকে আপনাকে দেখতে এসেছিল। এই টাকাটা আপনার চিকিৎসার জন্য সে-ই দিয়েছে। রিয়াজুল কলেজ ভার্সিটিতে পড়লেও ধর্মীয় জ্ঞানও অর্জন করেছে। টাকাটা দিয়ে আমাকে বলল, আব্বার বন্ধু আব্বার মতোই সম্মানের পাত্র। তার বিপদে সাহায্য করা আমার কর্তব্য। আমি বললাম, টাকাটা তুমি দিলে উনি খুশি হবেন। বলল, পরে না হয় আমি দেব। আজ আপনি দিয়ে আসুন।
মোসারেফ হোসেনের কান্নায় গলা বুজে এল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভিজে গলায় বললেন, এমনই ত্বকদিরের লিখন, আপনাদের দয়ার উপর বেঁচে থাকতে হচ্ছে। তার ভেদ তিনিই জানেন। কথা শেষ করে চোখ মুছলেন।
হ্যাঁ ভাই আল্লাহর ভেদ বোঝা মানুষের অসাধ্য। কার তকদিরে কি আছে তা তিনিই জানেন। আপনি ধৈর্য ধরুন, কাঁদবেন না। তাঁরই ইশারায় ইনশাআল্লাহ আপনার বিপদ একদিন দূর হবে। আপনি সুস্থ হয়ে উঠে আবার সংসারের হাল ধরবেন। আল্লাহর উপর ভরস করে তাঁর দরবারে ফরিয়াদ করুন। তিনি বিপদ দিয়েছেন আবার তিনিই উদ্ধার করবেন। আল্লাহ তাঁর নেককার বান্দাদের কঠিন বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। ধৈর্যহারা হলে পরীক্ষায় উত্তির্ণ হতে পারবেন না।
হা ভাই রিয়াজুলও কোরআন পাকের ঐ কথা বলে বুঝিয়ে গেছে। আমি আল্লাহর উপরই ভরসা করে সব সময় ফরিয়াদ করি। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, রিয়াজুল দেখতে ঠিক ওর আব্বার মতো হয়েছে তাই না ছোট মিয়া?
আপনার কথা ঠিক। শুধু দেখতেই নয়। মনটাও মেজ ভাইয়ের মতো। আল্লাহ ওকে কামিয়াব করুন। আপনিও ওকে দোয়া করবেন।
নিশ্চয় করব ভাই নিশ্চয় করব। মাঝে মাঝে আসতে বলবেন, ওকে দেখলে মনে হয়। আমার বন্ধুকে দেখছি।
ঠিক আছে বলব। তবে আমার মনে হয় আমি না বললেও আসবে। এবার আসি হলে?
আসমা তাকে বসতে দিয়ে রান্নাঘরে চা করতে গিয়েছিল। চা নিয়ে ফিরে এসে বলল, চা খেয়ে যাবেন চাচা।
