আসমা এক কাপ চা ও একটা পিরিচে খান চারেক বিস্কুট এনে রিয়াজুলকে বলল, নিন চা খান। তারপর আব্বাকে উদ্দেশ্য করে বলল, তুমিই তো বলেছ হাদিসে আছে, সংসারের অভাব অনটনের কথা কাউকে জানাতে নেই।
মোসারেফ হোসেন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, হাদিসটা মনে ছিল না মা। তা ছাড়া রিয়াজুলকে ঘরের ছেলে মনে করে বলে ফেলেছি।
আসমা রিয়াজুলের দিকে চেয়ে বলল, দীর্ঘ দিন অসুখে ভুগে আব্বার মাথা ঠিক নেই। আপনি কিছু মনে করবেন না।
মোসারেফ হোসেনের কথা শুনতে শুনতে রিয়াজুলের চোখে পানি এসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সামলে নিয়ে বলল, না কিছু মনে করিনি। বন্ধুর ছেলে নিজের ছেলের মতো। সেই কথা ভেবে বলেছেন। ওঁর দোষ ধরা তোমার উচিত হয়নি। তারপর চা খেয়ে বলল, এখন আসি চাচা। অনেক বেলা হয়ে গেছে। ছোট চাচা তাড়াতাড়ি ফিরতে বলেছেন।
মোসারেফ হোসেন বললেন, আবার এস।
জ্বি আসব। তারপর সালাম বিনিময় করে রিয়াজুল সেখান থেকে বেরিয়ে এল।
আসমাও যে তার পিছন পিছন পুকুর পাড় পর্যন্ত এল, তা রিয়াজুল জানতে পারল না। যতক্ষণ তাকে দেখা গেল ততক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঘরে ফিরে এল।
.
০৪.
ফেরার পথে হঠাৎ রিয়াজুলের মনে হল, আসমার মায়ের সঙ্গেও পরিচয় করা উচিত ছিল। ভেবে রাখল, আবার যখন যাবে তখন করবে।
ঘরে এলে সামসুদ্দিন মিয়া বললেন, এত দেরি করলে কেন? তোমাকে নিয়ে ব্যাংকে যাব বলে অপেক্ষা করছি।
রিয়াজুল বলল, এত তাড়া কিসের? কাল যাওয়া যাবে।
সামসুদ্দিন মিয়া বললেন, কাল ব্যাংকের কাজ সেরে তোমার ফুফুর বাড়ি যাব। সেটেলমেন্ট অফিসে খোঁজ নিয়ে জেনেছি দু’চার দিনের মধ্যে আমাদের এলাকার জমি রেকর্ড করা হবে। এর মধ্যে তোমার ফুফুর সঙ্গে পরামর্শ করে তার বড় ছেলে রফিককে নিয়ে তোমরা ঐদিন অফিসে থাকবে।
রিয়াজুল বলল, তার আগে আপনাকে নিয়ে আমি বড় চাচার সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাই। আপোষে মিমাংসা হলে শুধু শুধু বিবাদ করা কি উচিত হবে? তা ছাড়া মানি লোকের মান নষ্ট করতে আমাদের নবী (দঃ) নিষেধ করেছেন। আর একটা কথা চিন্তা করেছেন? আমি যদি সবার সামনে বড় চাচাকে অপমান করি, তা হলে উনি ভাববেন, এর পিছনে আপনি আছেন। তখন আপনার সঙ্গেও বিবাদ হবে। আমি আপনাদের মধ্যেও বিবাদ বাধাতে চাই না।
আমি বড় ভাইকে বলেছিলাম; কিন্তু তিনি আমার কথা নেননি। তবু তোমার প্রস্তাবে আমি রাজি।
আমার মনে হয় ফুফা-ফুফু সঙ্গে থাকলে আরো ভালো হবে।
রিয়াজুলের ধর্মীয় জ্ঞান ও বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে সামসুদ্দিন মিয়া খুশি হলেন। বললেন, তুমি খুব ভালো কথা বলেছ। কালই আমরা তোমার ফুফুদের ওখানে যাব।
একসময় খায়রুন্নেসা স্বামীকে বললেন, আমিও বড় ভাসুরের সঙ্গে মনোমালিন্য চাই না। রিয়াজুলের সব কথা আমার খুব পছন্দ, তুমি ওর কথামতো কাজ করো।
সামসুদ্দিন মিয়া বললেন, তাতো করবই। ও মেজ ভাইয়ের মতো খুব বুদ্ধিমান হয়েছে।
পরের দিন সামসুদ্দিন মিয়া রিয়াজুলকে নিয়ে ব্যাংকে গেলেন। পঁচিশ বছরের ফসল বিক্রির টাকা অনেক জমে ছিল। তার নামে একাউন্ট খুলে সেখানে পুরো টাকাটা ট্রান্সফার করে দিলেন।
ব্যাংকের কাজ সারার সময় রিয়াজুল বেশ কিছু টাকা তুলল। ঘরে এসে বলল, আচ্ছা ছোট চাচা, আপনি বললেন, মোসারেফ হোসেন পঙ্গু হয়ে কয়েক বছর বিছানায় পড়ে আছেন, ফসলি জমি বিক্রি করে দিয়েছেন, তা হলে সংসার চলে কি করে?
সামসুদ্দিন মিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, সংসার তো আর থেমে থাকে না বাবা! যেভাবেই হোক চলে যায়। তবে খুব কষ্টের সঙ্গে চলছে। ওঁর স্ত্রী খুব পর্দানশীন। কারও সামনে বার হন না। বড় মেয়েটা খুব চৌকোষ। পুকুরের মাছ বিক্রি করে, পুকুর পাড়ে গাছপালার ফল-পাকাড়ি বিক্রি করে, ওঁর বড় মামাও কিছু কিছু সাহায্য করেন। এছাড়া দু’বেলা কয়েকটা ছেলে-মেয়েকে প্রাইভেট পড়িয়ে কিছু আয় করে। এইভাবেই কোনোরকমে ঐ মেয়েটাই চালাচ্ছে।
আব্বার সঙ্গে উনার খুব ভাব ছিল, তাই না?
হ্যাঁ বাবা, তা ছিল। দু’জনের গলায় গলায় ভাব ছিল। যা কিছু করতেন একসঙ্গে করতেন! যেখানে যেতেন একসঙ্গে যেতেন। মেজ ভাই মারা যাওয়ার সময় মোসারেফ হোসেনের কান্না দেখে গ্রামের লোকজন তো অবাক। আমার মনে হয়েছে আপন ভাই হয়ে আমরা যতটা না দুঃখ পেয়েছি, তার থেকে বেশি উনি পেয়েছেন। তাই মেজ ভাইয়ের কথা স্মরণ করে আমি মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেখা করি। তিনিও আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করেন। পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর অমিও তাকে কিছু কিছু সাহায্য করি।
হাদিসে পড়েছি, পিতার বন্ধু পিতার মতো সম্মানীয়। পিতার বন্ধুকে সম্মান করা মানে পিতাকে সম্মান করা। তাই তার এই দুর্দিনে আমি তাকে সাহায্য করতে চাই।
এটা তো খুব ভালো কথা। এমনি তো যে কোনো অসহায় মানুষকে সাহায্য করলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (দঃ) খুশি হন। আর উনি তোমার আব্বার বন্ধু।
আমি কাল মোসারেফ হোসেন চাচার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সবকিছু দেখে শুনে আমার খুব দুঃখ লাগল। তারপর এক হাজার টাকা ছোট চাচার হাতে দিয়ে বলল, এটা আপনি আজই তাঁকে দেবেন।
তুমি নিজের হাতে দিলে ভালো হত না? উনি খুশি হতেন।
তা হতেন, তবু এই টাকাটা আপনি দেবেন। এই টাকায় তো ওঁদের অভাব দূর হবে। তাই আমি চিন্তা ভাবনা করে এমন কিছু করতে চাই, যাতে এক বেলা এক সন্ধ্যে খেয়ে পরে ওঁদের চলে যায়। ছোট ছেলেটাও লেখাপড়া করে মানুষ হয়।
