কেউ আমার খোঁজ করেছিল, হানিফা?
জ্বি-না।
চা বানিয়ে আন।। দুধ-চিনি ছাড়া।
হানিফা চলে গেল। তার শরীর বোধ হয় খানিকটা সেরেছে। মুখের শুকনো ভাবটা কম। ঘরে ওজন নেবার কোনো যন্ত্র নেই। যন্ত্র থাকলে দেখা যেত, ওজন কিছু বেড়েছে কি না।
মিসির আলি ইজি চেয়ারে শুয়ে জিম ম্যাকার্থির বইটির পাতা ওল্টাতে লাগলেন। কত বিচিত্ৰ কেইস হিষ্টিই-না ভদ্রলোক জোগাড় করেছেন!
কেইস হিষ্টি নাম্বার সিক্সটি
মিস কিং সিলভারস্টোন
বয়স পাঁচিশ।
কম্পুটার প্রোগ্রামার
দি এনেক্স ডিজিটাল্স্ লিমিটেড
ডোভার। ক্যালিফোর্নিয়া
মিস কিং সিলভারষ্টোন থ্যাংকস গিভিংয়ের দু দিন আগে দি এনেক্স ডিজিটাল্স্ লিমিটেডের তিনতলার একটি ঘরে কাজ করছিলে,। সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে। অফিসের এক জন গার্ড ছাড়া দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই। গার্ড একতলায় কফিরুমে। সে বলে গেছে মিস সিলভারস্টোন যেন কাজ শেষ করে যাবার সময় তাকে বলে যান।
কাজেই মিস সিলভারাষ্টোন রাত আটটার সময় কাজ শেষ করে কফিরুমে গেলেন। অবাক কাণ্ড, কফিরুম অন্ধকার। কেউ কোথাও নেই। তিনি ভয় পেয়ে ডাকলেন——মুলার। কেউ সাড়া দিল না।
তিনি ভাবলেন, মুলার হয়তো-বা সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছে। কাজেই তিনি ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন–মুলার নেই, তবে সোফায় এক জন অস্বাভাবিক লম্বা মানুষ বসে আছে। মানুষটি নগ্ন। তিনি চেঁচিয়ে ওঠার আগেই লোকটি বলল, ভয় পেও না। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
তুমি কে? আমি এসেছি। সিরাস আমি পৃথিবীর আমি এই গ্রহের মানুষ নই। আমি এ রাস নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে। একটি রমণীর গর্ভে সন্তানের সৃষ্টি করতে চাই।
মিস সিলভারষ্টোন পালিয়ে যেতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। তাঁর পা যেন মেঝের সঙ্গে আটকে গেছে। তিনি চিৎকার করতে চেষ্টা করলেন–গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হল না। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, একে-একে তাঁর গায়ের কাপড় আপনা-আপনি খুলে যাচ্ছে। দেখতে-দেখতে তিনি সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে গেলেন। এই লোকটি তখন উঠে দাঁড়াল। তিনি লক্ষ করলেন, লোকটির গায়ের চামড়া ঈষৎ সবুজ, এবং তার গা থেকে চাপা এক ধরনের আলো বেরুচ্ছে।
লোকটি এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। আপনা-আপনি বাতি নিভে গেল।
এই হচ্ছে মিস কিং সিলভারষ্টোনের গল্প। তিনি পরবতী সময়ে গর্ভবতী হয়ে পড়েন এবং ডাক্তারের কাছে জানতে চান, তাঁর বাচ্চাটির গায়ের রঙ সবুজ হবার সম্ভাবনা কতটুকু।
ম্যাকার্থির একুশ পৃষ্ঠার বিশ্লেষণ আছে কেইস হিস্ট্রির সঙ্গে। তিনি অভ্রান্ত যুক্তিতে প্রমাণ করেছেন, এটি ইলিউশনের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। মিস সিলভারষ্টোন সেখানে দেখেছেন মুলারকে। সিরাস নক্ষত্রপুঞ্জের কোনো আগন্তুককে নয়।
মিসির আলি একটির পর একটি কেইস হিস্ট্রি গভীর আগ্রহে পড়তে শুরু করলেন। তাঁর নিজেরও এ-রকম একটি বই লেখার ইচ্ছা হতে লাগল। সেখানে রানু, নীলু, ফিরোজের কেইস হিস্ট্রি এবং অ্যানালিসিস থাকবে। কিন্তু তা করতে হলে এদের সমস্ত রহস্য ভেদ করতে হবে। তা কি সম্ভব হবে? কেন হবে না? অসম্ভব। আবার কী? নোপোলিয়নের কী-একটি উক্তি আছে না। এ প্রসঙ্গে–Impossible is the word…? উক্তিটি কিছুতেই মনে পড়ল না।
হানিফা চা বানিয়ে এনেছে। সুন্দর লাগছে তো মেয়েটিকে। মেয়েটির ব্যাপারে খোঁজ নিতে হবে। তিনি কি অলস হয়ে যাচ্ছেন? বোধহয়। বয়স হচ্ছে। আগের কর্মদক্ষতা এখন আর নেই। মিসির আলি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
আপনের চা।
হানিফা চ্যায়ের কাপ সাবধানে নামিয়ে রাখল। তিনি লক্ষ করলেন, মেয়েটি নখে নেলপালিশ লাগিয়েছে। নেলপালিশ তিনি তাকে কিনে দেন নি। সে নিজেই তার জমানো টাকা থেকে কিনেছে। তাঁর নিজেরই কিনে দেয়া উচিত ছিল।
হানিফা বস। তোর সঙ্গে গল্পগুজব করি কিছুক্ষণ।
হানিফা বসল। মিসির আলি বললেন, আমি তোর বাবা-মাকে খুঁজে বের করবার চেষ্টা করছি, বুঝলি?
হানিফা কিছু বলল না। জানোলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। তিনি কি পারবেন। এর কোনো খোঁজ বের করতে? না-পারার কী আছে? এটি এমন জটিল কাজ নিশ্চয়ই নয়। সাজ্জাদ হোসেন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁকে তিনি বলেছেন, মেয়েটির নাম ইমা হবার সম্ভাবনা। এই নামের কোনো নিখোঁজ মেয়ের তথ্য আছে কি না দেখতে।
সে চোখ-মুখ কুঁচকে বলেছে, বুঝলি কি করে, ওর নাম ইমা? তিনি সে-প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন নি। দিতে পারেন নি বলাটা ঠিক হল না, বলা উচিত–দিতে পারতেন, কিন্তু দেন নি। সব প্রশ্নের উত্তর সবাইকে দেয়া যায় না। ইমা নামটি কোথেকে পাওয়া, সেটা কাউকে না বলাই ভালো, বিশেষ করে পুলিশকে। পুলিশরা এজাতীয় আধিভৌতিক ব্যাপার সাধারণত বিশ্বাস করে না।
পুলিশের ওপর পুরোপুরি নির্ভরও তিনি করেন নি। তাঁর এক ছাত্রকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। তার কাজ হচ্ছে প্রতিদিন পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে পুরনো পত্রিকা ঘাঁটা। দেখবে, ইমা নামের নিখোঁজ মেয়ের কোনো খবর ছাপা হয়েছে কি না। এই কাজের জন্য সে ঘন্টায় পঞ্চাশ টাকা করে পাবে দশ ঘন্টার জন্যে পাঁচ শ টাকা তিনি তাকে আগেই দিয়ে দিয়েছেন। কাজে যাতে উৎসাহ আসে, তার জন্যে এক হাজার টাকার একটি পুরস্কারের কথাও বলেছেন। যদি সে ইমা নামের কোনো নিখোঁজ বালিকার খবর বের করতে পারে, তাহলে এককালীন টাকাটা পাবে।
এই ব্যাপারে মিসির আলির মন খুঁতখুঁত করছে। ইমা নামটির ওপর এতটা গুরুত্ব দেয়া ঠিক হয় নি। যে-কোনো নিখোঁজ বালিকার সংবাদ সংগ্ৰহ করতে বলাটাই যুক্তিযুক্ত ছিল। এক জনের অতীন্দ্ৰিয় ক্ষমতার ওপর এতটা আস্থা রাখা ঠিক নয়। তিনি নিজে এক জন যুক্তিবাদী মানুষ। তাঁর জন্যে এটা অবমাননাকর।
সাজ্জাদ হোসেন
রাত আটটা।
