উপমহাদেশের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ‘শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে এই উপলব্ধি স্পষ্টতই সোভিয়েট ইউনিয়নের আগে থেকেই ছিল। কাজেই ৫ই ডিসেম্বরে সকল রাষ্ট্রকে পাকিস্তান বা ভারতের সক্রিয় পক্ষাবলম্বন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো ছাড়াও তা যাতে সংশ্লিষ্ট শক্তিসমূহ কর্তৃক গ্রাহ্য হয় তজ্জন্য সোভিয়েট সরকার তাদের নৌবাহিনীকে সতর্ক রাখে। মার্কিন নৌবহরের যাত্রারম্ভের আগেই সোভিয়েট পূর্ব উপকূল থেকে আগত রুশ যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন তাদের ভারত মহাসাগরীয় নৌবহরের শক্তি বৃদ্ধি শুরু করে এবং মার্কিন নৌবহর যখন বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী হয় তখন পাঁচটি সাবমেরিনসহ মোট ষোলটি যুদ্ধ ও সরবরাহ জাহাজ বঙ্গোপসাগরে বা তার আশেপাশে সমবেত হয়েছিল বলে জানা যায়। ১০ই ডিসেম্বর মার্কিন সপ্তম নৌবহর চীন সাগর ও ভারত মহাসাগর সংযোগকারী পাঁচ শ মাইল দীর্ঘ মালাক্কা প্রণালীর ওপারে; ভারত মহাসাগরে সোভিয়েট নৌবহরের সমাবেশও তখন পূর্ণতাপ্রাপ্ত নয়। এই অবস্থায় জানা যায়, সপ্তম নৌবহরের গতিবিধি জানার জন্য সোভিয়েট ইউনিয়ন ‘কসমস ৪৬৪’ পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে। তার চারদিন আগে সম্ভবত উপমহাদেশের রণাঙ্গন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ‘কসমস ৪৬৪’ উপগ্রহটি উৎক্ষেপিত হয়। ১০ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক থেকে সপ্তম নৌবহরের যাত্রা-সংক্রান্ত প্রথম যে সংবাদ দিল্লী এসে পৌঁছায় তদনুযায়ী কেবল বঙ্গোপসাগরে শক্তি প্রদর্শন নয়, বাংলাদেশের উপকূলের সাথে সংযোগ প্রতিষ্ঠাও ছিল মার্কিন নৌবহরের প্রধান লক্ষ্য। ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যে প্রথম যাদের কাছে এই সংবাদ এসে পৌঁছায়, তাঁরা মুহূর্তেই ধারণা করে নেন যে, এর পরে যুদ্ধের গতিধারা যে কোন দিকে মোড় নিতে পারে।
রাত্রিতে দিল্লীর সর্বোচ্চ সামরিক মন্ত্রণাসভায় গভীর সঙ্কটের আবহাওয়া বিরাজমান ছিল। প্রত্যাসন্ন বহিঃহস্তক্ষেপের সমুচিত প্রতিবিধান নির্দেশের প্রশ্নে ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীর উচ্চতর নেতৃবর্গের অধিকাংশ ছিলেন প্রায় নিরুত্তর। পাকিস্তানী বাহিনীর শেষ প্রতিরক্ষার স্থল ঢাকাকে মুক্ত করার আগেই বাংলাদেশের উপকূল ভাগে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী নৌবহর সমাবেশের আয়োজন এবং সিকিম ভুটানের উত্তর সীমান্তে চীনা সামরিক বাহিনীর অগ্রবর্তী অবস্থানের ফলে বাংলাদেশের যুদ্ধের পরিধি অসামান্যভাবে বিস্তৃত এবং এর পরবর্তী গতিধারা জটিল, অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এই বৃহত্তর সংঘাত থেকে ভারতের পিছিয়ে যাবার পথ উন্মুক্ত রাখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র “নিশ্চল স্থিতাবস্থা এবং ‘সঙ্কটের রাজনৈতিক মীমাংসা’র প্রস্তাব উত্থাপন করে। এই সম্মানজনক পশ্চাদপসরণের সঙ্গে পরাজয়ের উপাদান প্রচ্ছন্ন থাকলেও উদ্ভত সামরিক পরিস্থিতিতে তা প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে যে অদম্য সাহস ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্ন জড়িত ছিল, সেই দুরূহ পরীক্ষায় ইন্দিরা গান্ধী সমুত্তীর্ণ হন। সপ্তম নৌবহরের বর্ণিত উদ্দেশ্য ব্যর্থ করার জন্য ভারতের দুর্বল নৌশক্তির সর্বাত্মক ব্যবহার, ঢাকা অভিমুখে সামরিক অভিযানের গতি বৃদ্ধি এবং মৈত্রীচুক্তি অনুযায়ী বহিরাক্রমণের বিরুদ্ধে সর্বাধিক সোভিয়েট সামরিক সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ডি. পি, ধরকে মস্কো প্রেরণ-এই তিনটি সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা একে একে ঘোষণা করেন। এর আগে ঐ দিন বাংলাদেশের প্রত্যাসন্ন মুক্তির পটভূমিতে ভারত ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মিলিত অভিযানের জন্য যুগ্ম-কমান্ডব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। কিন্তু দিবাবসানে যখন দেখা যায় যুদ্ধের পরিধি প্রায় সীমাহীনভাবে বিস্তৃত হওয়ার পথে, তখন ভারতের জন্য মস্কোর পূর্ণাঙ্গ সামরিক সহযোগিতা এবং উচ্চতর পর্যায়ে মস্কোর সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগের সমন্বয় সাধনই মূল প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।
পরদিন ১১ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় শত্রুমুক্ত যশোরের পূর্ব নির্ধারিত সফর থেকে কোলকাতা ফিরে আসার আগে পর্যন্ত তাজউদ্দিন জানতেই পারেননি, মার্কিন হস্তক্ষেপের আশঙ্কা সত্যই বাংলাদেশের আকাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন করতে চলেছে। ডি. পি. ধর দিল্লী থেকে মস্কোর উদ্দেশে রওনা হন সে দিনই। স্পষ্টতই ইসলামাবাদের নয়া নির্দেশ অনুযায়ী, জেনারেল নিয়াজী পুনরায় ঢাকা রক্ষার জন্য আমৃত্যু যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সংকল্প প্রচার করতে শুরু করেন। কিন্তু ঢাকা রক্ষার জন্য না ছিল তাদের কোন আয়োজন, না ছিল উদ্যম। নদীমাতৃক এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা অনুযায়ী ঢাকা প্রতিরক্ষার জন্য ব্যুহ রচনার সম্ভাবনা দু’টি। একটি দূরবর্তী, অন্যটি ঢাকা নগরীর নিকটবর্তী। আরিচা-কালিয়াকৈর-নরসিংদী-বৈদ্যেরবাজার-নারায়ণগঞ্জ ঘিরে ঢাকার জন্য দূরবর্তী প্রতিরক্ষা বৃত্ত রচনার যে সুযোগ ছিল স্পষ্টতই তা সদ্ব্যবহারের উদ্যোগ পাকিস্তানীদের ছিল না। ঢাকার নিকটবর্তী প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলার সুযোগ ছিল মিরপুর ব্রীজ, টঙ্গী ব্রীজ, ডেমরা ফেরী ও নারায়ণগঞ্জে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে। কিন্তু সর্ববিষয়ে বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভর করার দীর্ঘ মনোবৃত্তির ফলেই হয়ত পাকিস্তানী নেতৃত্ব নিজেদের শেষ আত্মরক্ষার জন্যও আমেরিকা ও চীনের সাহায্যের উপর মানসিকভাবে নির্ভরশীল ছিল এবং সে কারণে ঢাকার নিকটবর্তী প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাকে জোরদার করার মত কোন ব্যবস্থা তারা অবলম্বন করে ওঠেনি। ১১ই ডিসেম্বরে ঢাকা শহরে ইপিকাফ, পুলিশ, রাজাকারসহ পাকিস্তানী সশস্ত্রবাহিনীর সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজারের অনধিক। কোন কোন অঞ্চল থেকে–এমনকি নিকটবর্তী ভৈরব বাজার থেকে–ঢাকার জন্য সৈন্য পুনর্সমাবেশের পাকিস্তানী প্রচেষ্টা মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বিমান আক্রমণের ফলে দুরূহ হয়। উত্তরে ময়মনসিংহ থেকে পাকিস্তানের ৯৩ এ্যাডহক ব্রিগেড ঢাকা আসার কালে প্রথমে কাদের সিদ্দিকী পরিচালিত মুক্তিযোদ্ধা এবং পরে ভারতীয় প্যারাস্যুট ব্যাটালিয়ান কর্তৃক আক্রান্ত হয়। ১১ই ডিসেম্বর বিকেলে ভারতের প্যারাস্যুট বাহিনীর মাত্র ৭০০ জন সৈন্য কাদের সিদ্দিকীর বাহিনী অধ্যুষিত মধুপুর এলাকায় অবতরণ করে এবং পাকিস্তানী ব্রিগেডের পশ্চাত্বর্তী ইউনিটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ব্রিগেড দলপতি ব্রিগেডিয়ার কাদিরকে পিছনে ফেলে রেখে, ক্ষয়িত শক্তি নিয়ে পাকিস্তানী ব্রিগেড ঢাকা ফিরে আসে। বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলি ভারতের প্যারাস্যুট বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা পাঁচ হাজার বলে উল্লেখ করায় পাকিস্তানীদের মনোবল আরও হ্রাস পায়।
