নিক্সন প্রশাসনের জন্যেও সমস্যা তখন কম নয়। বস্তুত পাকিস্তানকে সাহায্য করার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা মার্কিন জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য করানো তখন এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। কি। মানবিকতার যুক্তিতে, কি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের বিবেচনা থেকে, মার্কিন প্রশাসনের পাকিস্তান নীতি নিয়ে মার্কিন গণপ্রতিনিধি ও সংবাদমাধ্যমগুলির সমালোচনা তখন তুঙ্গে। মার্কিন সিনেটে এবং হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে ডেমোক্র্যাট দলীয় কোন কোন সদস্য পাকিস্তানী জান্তার গণহত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী নীতির প্রতি মার্কিন প্রশাসনের সমর্থন এবং জাতিসংঘের বিলম্বিত ও একদেশদর্শী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। মানবতাবাদী কারণ ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরেট জাতীয় স্বার্থের হিসাব-নিকাশ থেকে উপমহাদেশের সংঘর্ষের জন্য ভারতকে এককভাবে দোষী করা, ভারতের উন্নয়ন বরাদ্দ বন্ধ করা প্রভৃতি বিষয়ে মার্কিন সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার যৌক্তিকতা সম্পর্কে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলি নানা প্রশ্ন তোলে। জনমতের এই প্রচণ্ড বিরুদ্ধতা দৃষ্টে ৭ই ডিসেম্বর কিসিঞ্জার নিজেই এক অজ্ঞাতনামা ‘সরকারী মুখপাত্র’ হিসাবে আস্থাভাজন কিছু সাংবাদিকদের কাছে পরিবেশিত এক সমীক্ষার দ্বারা মার্কিন জনমত পরিবর্তনের চেষ্টা করেন।
কিসিঞ্জারের এই বেনামী সমীক্ষা মার্কিন জনমতকে পরদিন কতটুকু বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হত তা অজ্ঞাত থাকলেও, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ উপমহাদেশের যুদ্ধ বন্ধ করার পক্ষে সে দিন যে রায় দেন, তা-ই মার্কিন সরকারের পরবর্তী কার্যক্রমের প্রধান মূলধনে পরিণত হয়। সাধারণ পরিষদ ৭ই ডিসেম্বর রাত্রিতে-উপমহাদেশে তখন ৮ই ডিসেম্বর-অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, উভয় পক্ষের সৈন্য প্রত্যাহার এবং শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের জন্য রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান সম্বলিত এক প্রস্তাব ১০৪-১১ ভোটে গ্রহণ করে। প্রত্যেক বক্তার জন্য সর্বাধিক দশ মিনিট বরাদ্দ করে উপমহাদেশের এই অত্যন্ত জটিল বিষয়কে অসম্ভব তাড়াহুড়ার মধ্য দিয়ে সাধারণ পরিষদে আলোচনা করার ফলে অধিকাংশ সদস্য দেশের জন্যই বাহ্যত যুক্তিসঙ্গত এই প্রস্তাবের প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জন্যই অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক অসন্তোষ এবং বিবদমান প্রতিবেশীর উপস্থিতি এক সাধারণ সমস্যা। ফলে বিপুল ভোটাধিক্যে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। সোভিয়েট ইউনিয়ন, সমাজতন্ত্রী কয়েকটি দেশ, ভারত এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানকারী দ্বিতীয় দেশ ভুটান বাংলাদেশের অভ্যুদয় রোধ করার জন্য এই আন্তর্জাতিক কূটবুদ্ধির বিজয়ের মুখেও অটল থাকে। উপমহাদেশের। সংঘাতের জটিলতা সম্পর্কে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের উপলব্ধি অপেক্ষাকৃত গভীর ছিল বলে মার্কিন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই দুই দেশ এবং আরো আটটি দেশ ভোট দানে বিরত থাকে।
৮ই ডিসেম্বরের রণক্ষেত্রের অবস্থা পাকিস্তানের জন্য আরও শোচনীয়। পশ্চিম পাকিস্তানে তাদের মূল ভরসার স্থল ছম্বে উপর্যুপরি চেষ্টা সত্ত্বেও পাকিস্তানের অগ্রগতি প্রায় থেমে যায়। অন্যত্রও অবস্থা বেশ খারাপ। রাজস্থান-সিন্ধু সীমান্তে বরং ভারতের প্রাধান্যই পরিলক্ষিত হয়, করাচীর উপর ভারতীয় নৌ ও বিমান আক্রমণ অব্যাহত থাকে। পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের অবস্থা ক্রমেই সঙ্গীন–যশোরের মত ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেও পাক সৈন্যরা পালিয়ে আসে। কুমিল্লার এক অংশের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং অন্য অংশের পাশ কাটিয়ে ভারত-বাংলাদেশ মিলিত বাহিনী এগুতে থাকে। কিন্তু পাক বাহিনী এই পশ্চাদপসরণের পর ঢাকার চারপাশে নিজেদের অবস্থানকে পুনর্গঠিত করতে সক্ষম হবে কিনা, তা তখনও অজ্ঞাত। সংক্ষেপে, পশ্চিম পাকিস্তানে তাদের কোন অগ্রগতি নেই; আর পূর্বে কেবল পশ্চাৎগতি। পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ডের সম্যক বিপর্যয় দৃষ্টে রাওয়ালপিন্ডির সামরিক কর্তারা নিয়াজীর মনোবল ফিরিয়ে আনার জন্য ‘চীনের তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে তাকে জানায়। এহেন শোচনীয় সামরিক পরিস্থিতির মাঝে ইয়াহিয়া খান বেসামরিক প্রতিনিধিদের হাতে তার শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের দীর্ঘ দিনের ‘ওয়াদা’ বাস্তবায়িত করতে শুরু করেন এবং পূর্ব পাকিস্তান থেকে নুরুল আমিন ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। অন্যত্র ভারতে একই দিন অর্থাৎ ৮ই ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় সর্বশেষ সামরিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থতির আলোকে ভারতের সরকারী মুখপাত্র ঘোষণা করেন, পাকিস্তান যদি পূর্ব বাংলায় তাদের পরাজয় স্বীকার করে নেয়, তবে অন্যান্য সকল অঞ্চলেই ভারত যুদ্ধ বন্ধ করবে; বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তানের কোন অঞ্চলেই কোন ভূখণ্ড দখল করার অভিপ্রায় ভারতের নেই।
এই ঘোষণা বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা বাদে ওয়াশিংটন সময় সকাল এগারটায় যখন WSAG-এর বৈঠক শুরু হয়, তখন JCS-এর জেনারেল রায়ান উপমহাদেশের সর্বশেষ সামরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন যে, পশ্চিমাঞ্চলে ভারতীয় বাহিনীর জোর এগুবার কোন লক্ষণ নেই, বরং পাকিস্তানের অগ্রাভিযান ঠেকিয়ে রেখেই তারা সন্তষ্ট রয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু WSAG-এর সভাপতি হেনরী কিসিঞ্জার রায়ানের কাছে জানতে চান পূর্ব রণাঙ্গন থেকে ভারতীয় সৈন্যদের পশ্চিম রণাঙ্গনে নিয়ে যেতে কত সময় লাগতে পারে। জেনারেল রায়ান জানান, বেশ কিছু দিন; তবে বিমানবাহিত ব্রিগেড তাড়াতাড়িই নিয়ে যাওয়া সম্ভব, পাঁচ বা ছ’দিনের মধ্যেই। তৎসত্ত্বেও এক সম্পূর্ণ নতুন আশঙ্কার অবতারণা করে কিসিঞ্জার বলেন, “মূল প্রশ্ন হল ভারত যদি আজাদ কাশ্মীর দখলের চেষ্টা চালায় এবং পাকিস্তানের বিমান ও সাঁজোয়া বাহিনীর ধ্বংস সাধনে প্রবৃত্ত হয়, তবে তা হবে পাকিস্তানকে ধ্বংস করার জন্য ভারতের ইচ্ছাকৃত উদ্যোগ। কিসিঞ্জার অতঃপর আবেগময় ভাষায় সমবেতদের জিজ্ঞাসা করেন, এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের এক মিত্রকে সম্পূর্ণ পরাভূত হতে দিতে এবং পাকিস্তানকে ‘প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রদান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে নিবৃত্ত রাখার জন্য ভারত যদি ভয় দেখায় তা কি আমরা মেনে নিতে পারি? স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধি সিস্কো বলেই বসেন, ভারতের এমনতর অভিপ্রায় রয়েছে কি না তা সন্দেহজনক। তথাপি কিসিঞ্জার পাকিস্তানের জন্য সামরিক সরবরাহ নিশ্চিত করার পক্ষে দৃঢ় অভিমত প্রকাশ করেন। সঙ্গে সঙ্গে আক্ষেপ করে বলেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সব কিছুই আমরা করেছি, কিন্তু সবই দু’সপ্তাহ বিলম্বে’।
