কিন্তু এই প্রশ্নে ওসমানীকে সম্মত করাতে তাজউদ্দিনকে অত্যন্ত বেগ পেতে হয়। ওসমানীর তীব্র বিরোধিতাকে অতিক্রম করে অক্টোবরের শেষ দিকে সীমান্ত যুদ্ধের জন্য অবশেষে যখন যুগ্ম-কমান্ড গঠিত হয়, তখন রণক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ ধারণ করে এবং ফলে যুগ্ম কমান্ড গঠনের মূল উদ্দেশ্যও অনেকাংশে অর্থহীন হয়ে পড়ে। প্রথমত, জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রথম ব্রিগেড কার্যকরভাবে ব্যবহৃত না হওয়ায় এবং নিকট ভবিষ্যতে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা না-থাকায় প্রধান সেনাপতি ওসমানী তাঁর নতুন ‘Ops plan’ অনুযায়ী সিলেটের চা বাগানে এই ব্রিগেডকে কোম্পানী/ পেটুন গ্রুপে ভাগ করে গেরিলা তৎপরতা চালাবার জন্য নিয়োগ করেন। ফলে তিনটি পুরাতন ব্যাটালিয়ানের বড় অংশই সীমান্ত যুদ্ধ থেকে বাদ পড়ে। দ্বিতীয়ত, সেপ্টেম্বরের শেষে ইন্দিরা গান্ধীর সাফল্যজনক মস্কো সফরের পর ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ড’কে যখন জানান হয় যে অতঃপর ভারতীয় বাহিনীকে কেবলমাত্র অবস্থান-অঞ্চল’ গঠনের লক্ষ্যে আবদ্ধ রাখার প্রয়োজন নেই, তখন বৃহত্তর ভূমিকার প্রস্তুতি হিসাবে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ভারতীয় বাহিনী নিজেরাই পাকিস্তানী অবস্থানের বিরুদ্ধে সীমান্ত সংঘর্ষে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করতে শুরু করে প্রথমে ব্যাটালিয়ান পর্যায়ে, পরে ব্রিগেড পর্যায়ে। ফলে তাদের কাছে বাংলাদেশের সেক্টর ইউনিটের গুরুত্ব দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করে।
পাশাপাশি, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বেড়ে ওঠায়, মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা দ্রুত বৃদ্ধি করে পাকিস্তানী বাহিনীকে যুদ্ধ-পরিশ্রান্ত করে তোলার জন্য ভারতীয় পক্ষের আগ্রহ অক্টোবর নাগাদ গভীরতর হয়। ওসমানী তাঁর পরিবর্তিত ‘Ops plan’ অনুযায়ী নিয়মিত বাহিনীর একাংশকে ‘গেরিলা যুদ্ধে’ দেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করার ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বৃদ্ধির ব্যাপারে ভারতীয় আগ্রহ সাহায্যপ্রাপ্ত হয়।
অধ্যায় ১৫: সেপ্টেম্বর – অক্টোবর
সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি মাসে কুড়ি হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে ট্রেনিং দানের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের প্রবাসী প্রশাসনের জন্য এক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম থেকেই বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর মধ্য থেকে স্বল্প সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাকে মনোনয়ন দেওয়া একটি জটিল সমস্যা ছিল। উপযুক্ত এই সব যুবকদের আলাদা আশ্রয় এবং তাদের দৈহিক সুস্থতা ও মানসিক উদ্দীপনা বজায় রাখার জন্য জুনের প্রথম সপ্তাহে ‘যুব শিবির স্থাপনের স্কীম অনুমোদিত হয়। জুনের শেষ সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা শুরুর অব্যবহিত পর দেশের যুব সম্প্রদায় যখন পাকিস্তানী বাহিনীর বিশেষ আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত হয়, তখন থেকে আরও অধিক সংখ্যায় তারা ভারতে পালিয়ে আসতে থাকে। ফলে ট্রেনিং প্রার্থী এই অতিরিক্ত যুবকদের সাময়িক আশ্রয়স্থল হিসাবে ২৪টি যুব শিবির প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করার প্রচেষ্টা ছাড়াও ‘যুব অভ্যর্থনা শিবির স্থাপনের কাজ চলতে থাকে। যুব শিবিরের বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি অধ্যাপক ইউসুফ আলীর ১লা আগস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, যুব শিবির স্থাপনের কাজ খুবই মন্থরগতিতে অগ্রসর হলেও, ঐ সময়ের মধ্যে প্রায় ৬৭টি ‘অভ্যর্থনা শিবির স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়। আর এক রিপোর্টে দেখা যায়, ১২ই আগস্ট পর্যন্ত স্থাপিত যুব শিবিরের সংখ্যা ছিল মাত্র ১১টি।
প্রয়োজনীয় স্ক্রীনিং-এর পর গড়পড়তা ৫০০ যুবককে ‘অভ্যর্থনা শিবিরে’ গ্রহণ করা হত, পরে তাদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে ১,০০০টি আসনবিশিষ্ট ‘যুব শিবিরে স্থানান্তরিত করা হত। সবশেষে এই ‘যুব শিবির থেকেই সশস্ত্র ট্রেনিংয়ের জন্য চূড়ান্তভাবে মনোনীতদের ‘ট্রেনিং শিবিরে পাঠানো হত। এই পর্যায়ক্রমিক স্ক্রীনিং এর মাধ্যমে দৈহিক ও চারিত্রিক যোগ্যতার ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করার যে সুযোগ ছিল তা পূর্ব বর্ণিত রাজনৈতিক কারণে বহুলাংশে ব্যর্থ হয়। রিক্রুটমেন্ট ও ট্রেনিং ব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতার সংশোধন না করে কেবল ‘যুব শিবির’ ও ‘অভ্যর্থনা শিবিরে’র দ্রুত সংখ্যা বাড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যাবৃদ্ধির প্রয়োজন মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। অবশ্য ১৫, ১৬ই এবং ২১শে সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র, সাহায্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রী কামরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘যুব শিবিরের বোর্ড অব কন্ট্রোল’ এবং কেন্দ্রীয় সাহায্য ও পুনর্বাসন কমিটির যুগ্ম অধিবেশনে যুব শিবির ব্যবস্থাপনা উন্নত করার উদ্দেশ্যে কিছু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যুব শিবিরের ডিরেক্টর এবং তার প্রশাসনিক সহকর্মীদের প্রচেষ্টায় সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ সমগ্র সীমান্ত অঞ্চল বরাবর ২৪টি ‘যুব শিবির এবং ১০০টি ‘অভ্যর্থনা শিবির স্থাপনের লক্ষ্য অর্জিত হয়।
বস্তুত কেবল যুব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নয়, প্রবাসী সরকারের প্রশাসন বিভাগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এক উল্লেখযোগ্য দক্ষতার মান স্থাপনে সক্ষম হন। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এক নির্বাসিত জনসমষ্টির মধ্য থেকে নাতিক্ষুদ্র প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং এক যুক্তিসঙ্গত দক্ষতার মানে তাদেরকে সক্রিয় ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তোলা যে কোন বিচারেই এক প্রশংসাযোগ্য দৃষ্টান্ত। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আওয়ামী লীগের উপদলীয় সংঘাত তীব্রতর হয়ে উঠলেও, এর ফলে সরকারের কাঠামো যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েনি সম্ভবত তার একটি কারণ ছিল নির্দলীয় প্রশাসন বিভাগের কর্তব্যবোধ এবং অপর কারণ ছিল, রাজনৈতিক ঝড়ঝাঁপটা থেকে তাদেরকে রক্ষা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী সফল প্রয়াস। ‘অধিকাংশ প্রশাসনিক দফতরে আওয়ামী লীগ আদর্শে বিশ্বাসী নয়, এমন সব অফিসারদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য অথবা সরকারী প্রশাসনের প্রতিটি শাখা আওয়ামী লীগের দলীয় ব্যবস্থাধীনে আনার জন্য পরিষদ সদস্যদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ যখন ‘পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী বা দলীয় কমিটি নিয়োগের দাবীতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন, তখন প্রকৃতপক্ষে একা তাজউদ্দিন এই দাবীকে প্রতিহত করেন, যাতে রাজনৈতিক দলাদলি প্রশাসন বিভাগের উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। তবে সমগ্র প্রশাসনিক তৎপরতাকে অধিকতর সমন্বিত এবং বিশেষত প্রচারমাধ্যমকে ফলপ্রসূ করার জন্য কিছু অভিজ্ঞ ও প্রবীণ অফিসারের যে প্রয়োজন তাজউদ্দিন বোধ করতেন, অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তা অপূর্ণ থাকে ।
