সমস্ত অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান রাজনৈতিক যন্ত্র। কাজেই সেই যন্ত্রকে বিভক্ত ও নিষ্ক্রিয় করে স্বাধীনতা সংগ্রামের সমূহ ক্ষতিসাধনের জন্য পাকিস্তানের প্রবল ক্ষমতাশালী পৃষ্ঠপোষকের পক্ষে এক অন্তর্ঘাতমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করা অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু তখনকার দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনা ও চরিত্র সমাবেশের মাঝে, নানা ধরনের স্বার্থ ও সম্পর্কের ভাঙ্গা-গড়ার ফলে এই সমস্ত উপদলীয় ধারার সঠিক শ্রেণীকরণ সর্বদা সম্ভব হত না। তা সত্ত্বেও এ কথা বুঝে উঠতে কষ্ট হয়নি, যে প্রবল ক্ষমতাসম্পন্ন। বহিঃশক্তি পাকিস্তানের স্বার্থ বজায় রাখার জন্য সর্ব উপায়ে তৎপর এবং যারা অন্তত একটি উপদলের সহায়তায় আওয়ামী লীগের একাংশকে স্বাধীনতার লক্ষ্য থেকে দূরে সরে নিয়ে যাওয়ার জন্য সচেষ্ট, সেই শক্তিই আওয়ামী লীগকে বিভক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার সমূহ উপায় অবলম্বন করতে পারে। আওয়ামী লীগের উপদলীয় সংঘাতের প্রতিক্রিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের উপর কি দাঁড়াবে এবং ফলত দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তান বাহিনীর অবস্থানকে দুর্বল করে দ্রুত সামরিক বিজয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার লক্ষ্য কতদূর ব্যাহত হবে, এই প্রশ্নই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে।
ঠিক এই আশঙ্কার পটভূমিতে স্বাধীনতাযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপৎকালীন শক্তি হিসাবে ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করার একটি প্রস্তাবকে তাজউদ্দিন দ্রুত সিদ্ধান্তে পরিণত করেন। এই সব সংগঠনের কর্মীদের মুক্তিযুদ্ধে নিয়োগ করার ব্যাপারে তার নীতিগত সম্মতি বরাবরই ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের অবশিষ্ট নেতৃত্বের সম্মিলিত আপত্তির দরুণ-জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠনের পরেও এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হত কিনা বলা শক্ত। ইতিপূর্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ন্যাপ ও সিপিবির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিস্তর দেনদরবার করা হয়। এ ব্যাপারে ভারত সরকারের কাছে সিপিআই-এর প্রভাবশালী লবি বিশেষ করে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তির পর বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভারতীয় প্রশাসনের কেন্দ্রের বাম, অন্ততপক্ষে ডি. পি. ধর, যিনি ভারত-সোভিয়েট চুক্তির জন্য সর্বাধিক কৃতিত্বের অধিকারী, ইন্দিরা গান্ধীর আসন্ন মস্কো সফরের আগে ন্যাপ-সিপিবির কর্মীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে রিক্রুট ও ট্রেনিং দানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সম্মতির অপেক্ষায় ছিলেন। অন্যদিকে আগস্টে মুজিব বাহিনী’র ক্রমবর্ধমান দৌরাত্ম প্রতিবিধানের জন্য ভারতীয় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করে তাজউদ্দিন যখন ব্যর্থ হয়েছিলেন, তারপর থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে রাজনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য বামপন্থী কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করার এক প্রস্তাব তিনি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছিলেন। সেপ্টেম্বরে আওয়ামী লীগের উপদলীয় সংঘাতের সঙ্গে মার্কিন ইন্ধন যুক্ত হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধ যখন ভিতর থেকে বিপন্ন হয়ে পড়ার উপক্রম হয়, তখন উপরোক্ত প্রস্তাবকে তাজউদ্দিন সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত করতে আর বিলম্ব করেননি। দলের সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে অপ্রিয় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার গুরুতর পরিণাম কি দাঁড়াতে পারে, তাজউদ্দিন সে সম্পর্কে পূর্ণরূপেই সচেতন ছিলেন।
অধ্যায় ১৩: সেপ্টেম্বর – অক্টোবর
আওয়ামী লীগের ক্রমাবনত উপদলীয় পরিস্থিতির মাঝে শেখ মণির প্রভাব ও ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও ত্রাস সৃষ্টি থেকে তাঁকে বিরত করার বিভিন্ন চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার ফলে পুনরায় দিল্লীর সংশ্লিষ্ট দফতরের জরুরী দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই উদ্দেশ্যে ডি. পি. ধরের পরামর্শ অনুযায়ী ১২ই সেপ্টেম্বরে তাজউদ্দিন আমাকে দিল্লী পাঠান। ডি. পি. ধর পরদিন বিকেল চারটায় নয়াদিল্লীর প্রধান সচিবালয় “সাউথ ব্লকে’ RAW-এর প্রধান রামনাথ কাও-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন। সাম্প্রতিক কিছু অবাঞ্ছিত ঘটনার আলোকে যথাশীঘ্র ‘মুজিব বাহিনী’কে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার পক্ষে আমার বক্তব্য কাও ভাবলেশহীন মৌনতায় শ্রবণ করেন এবং আমার বক্তব্য শেষ হওয়ার পর বিদায় জ্ঞাপনকালে ক্ষণিকের জন্য সে মৌনতা ছিন্ন করেন। চার সপ্তাহ আগে কাও তাজউদ্দিনের বক্তব্যের জবাবে যে নীরবতা প্রদর্শন করেন, তদপেক্ষা কোন উন্নত সৌজন্য আমার প্রাপ্য ছিল না।
পরদিন সকালে ডি. পি. ধরকে আমি জানাই যে, পূর্ববর্তী অপরাহ্নের সাক্ষাৎকারের পরেও পরিস্থিতির কোন উন্নতির সম্ভাবনা যেহেতু দৃষ্টিগোচর নয়, সেহেতু প্রতিশ্রুত সর্বোচ্চ মহলের হস্তক্ষেপে মুক্তিযুদ্ধের এই দ্বৈত কমান্ডের অবসান একান্ত অপরিহার্য। উত্তরে তিনি আমাকে অধ্যাপক পি. এন. ধরের (তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সচিব) সঙ্গে অপরাহ্নে সাক্ষাৎ করে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি অবহিত করার পরামর্শ দেন। যথাসময়ে তা আমি সম্পন্ন করি বটে, কিন্তু ক্রমশ এই ধারণা আমার মনে প্রবল হয়ে উঠতে থাকে: ‘মুজিব বাহিনী’র স্বতন্ত্র কমান্ড বজায় রাখার পক্ষে ভারত সরকারের পূর্বেকার সিদ্ধান্ত এমনই জোরাল যে এর পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্র প্রস্তুতের কাজে আমি হয়ত ব্যবহৃত হয়ে চলেছি। সন্ধ্যায় ডি. পি. ধরের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ বৈঠকে প্রসঙ্গটি পুনরায় উত্থাপিত হয়; কিন্তু কোন সিদ্ধান্তের আভাস তাঁর বক্তব্যে ছিল না। বরং দু’দিন বাদে কোলকাতা যাওয়ার পর ন্যাপ-সিপিবি কর্মীদের মুক্তিবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম হবেন, এই মর্মে তিনি একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত রাখেন। মুজিব বাহিনী’ প্রশ্নে ভারসাম্য বিধানের জন্য বামপন্থীদের মুক্তিবাহিনীতে নেওয়ার পক্ষে আমাদের অনুক্ত যুক্তি যেমন তার দৃষ্টি এড়ায়নি, তেমনি ভারতীয় প্রশাসনের অভ্যন্তরে প্রতিকূল বিভিন্ন ধারা সত্ত্বেও এ বিষয়ে তার সহযোগিতার প্রয়াস আমাদের অগোচরে থাকেনি।
