সার্বজনীন উপদেশ হচ্ছে, যে সব জাতি শিক্ষা দীক্ষায় অনগ্রসর এবং সামাজিক জীবনে দারিদ্র এবং অবিচার ও অনাচারের মধ্যে বাস করে, দেখা যায় তাদের মধ্যে স্রষ্টার উপরে নির্ভরশীলতা অপেক্ষা অতিপ্রাকৃত শক্তির উপর নির্ভরশীলতা বেশি হয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, বাংলাদেশীদের জাতীয় জীবনে এ ধরনের প্রভাব অত্যন্ত বেশি।
১০৪। এই আয়াতটিকে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রশ্ন জাগে হারূত মারূত কে ছিলেন? তারা কি শিক্ষা দিতেন? মাওলানা ইউসুফ আলী ‘তফসীর হাক্কানী’ ও ‘তফসীর কবীর’- কে অনুসরণ করেছেন। হারূত ও মারূতকে ফেরেশ্তা বলা হয়েছে। ফেরেশ্তা এখানে প্রতীক অর্থে ব্যবহৃত। যার অর্থ করা যায় তারা ছিলেন ভাল মানুষ ও বিভিন্ন জ্ঞানে সমৃদ্ধ। তারা ছিলেন জ্ঞানী এবং বিবেকবান [man of knowledge and wisdom]। তাদের ফেরেশ্তা বলা হচ্ছে এই জন্য যে, প্রাচীনকালে ফেরেশ্তারা ছিলেন পৌরুষের প্রতীক। ফেরেশ্তা সমতুল্য ব্যক্তি হবেন জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ, বিচক্ষণতা, বিবেকে, ক্ষমতায় যারা অপ্রতিদ্বন্ধী। যদি প্রতীকরূপে ধরা হয় তবে হারূত ও মারূত ছিলেন সেইরূপ ব্যক্তি। শঠতা, নীচতা, কপটতার উর্ধ্বে ছিলেন তারা।
হারূত ও মারূত প্রাচীন বেবীলন শহরে বাস করতেন। বেবীলন শহর সেই যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞানের পীঠস্থানরূপে পরিচিত ছিল। ঠিক কখন সে সম্পর্কে সুনিশ্চিত তথ্য জানা না থাকলেও এক সময়ে পৃথিবীতে বিশেষ করে বাবেল শহরে যাদুবিদ্যার যথেষ্ট প্রচলন ছিল। যাদুর অত্যাচার্য ক্রিয়া দেখে মূর্খ লোকদের মধ্যে যাদু ও পয়গম্বরদের মো’জেযার স্বরূপ সম্বন্ধে বিভ্রান্তি দেখা যায়। সে কারণে তারা হযরত সোলায়মান (আঃ) কে যাদু বিদ্যার চর্চা করার কথা বলতো। কিন্তু আল্লাহ্ বলেছেন হযরত সোলায়মান যাদুর র্চচা করতেন না। তিনি ছিলেন সত্যদ্রষ্টা আল্লাহ্ কর্তৃক মোজেযাপ্রাপ্ত পয়গম্বর। কেউ কেউ যাদুকরদেরও সজ্জন ও অনুসরণযোগ্য মনে করতে থাকে। এই বিভ্রান্তি দূর করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ তায়ালা বাবেল শহরে হারূত ও মারূত নামে দুজন ফেরেশ্তাকে প্রেরণ করেন। তাদের কাজ ছিল যাদুর স্বরুপ ও ভেল্কিবাজী সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা যাতে বিভ্রান্তি দূর হয় এবং যাদুর আমল, রূপ ও যাদুকরদের অনুসরণ থেকে তারা বিরত থাকতে পারে। মোট কথা ফেরেশ্তাদ্বয় বাবেল শহরে কাজ আরম্ভ করে দিলেন। তারা যাদুর মূল শাখা-প্রশাখার বর্ণনা করে জনগণকে এ কুকর্ম থেকে আত্মরক্ষা ও যাদুকরগণকে ঘৃণা করার উপদেশ দেন। ফেরেশ্তাদ্বয় এ বলে লোকজনদের সাবধান করতেন যে দেখ, আমাদের দ্বারা আল্লাহ্ তায়ালা পরীক্ষা নিতে চান যে, এগুলি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে কে স্বীয় ধর্মের হেফাজত ও সংরক্ষণ করেন এবং কে এগুলো সম্পর্কে অবগত হয়ে নিজেই সে অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং স্বীয় দ্বীন ঈমান বরবাদ করে দেয়। যে জ্ঞান পৃথিবীকে আলোকিত ও শান্তিতে ভরিয়ে দিতে পারে, সেই জ্ঞান দুষ্ট লোকের হাতে পড়লে ক্ষতি সাধন হয়। উদাহরণ স্বরূপ আমরা আমাদের সাম্প্রতিক পৃথিবীতে দেখতে পাই যে, পারমাণবিক জ্ঞান যখন শান্তির কাজে ব্যবহার করা হয় তা হয় মানুষের কল্যাণের জন্য। এই জ্ঞানই আবার পৃথিবীর ধ্বংস যজ্ঞের কারণ হতে পারে। জ্ঞানই শক্তি-আবার এই জ্ঞানই দুষ্ট লোকের হাতে মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। বর্তমানে পৃথিবীতে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার জ্ঞান এরূপ পরীক্ষার সম্মুখীন। আল্লাহ্ আমাদে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। হারূত মারূতের মাধ্যমে আল্লাহ্ আমাদের এই শিক্ষাই দিয়েছেন যে আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্ঞান আমাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। জ্ঞানকে মানুষ লোভ ও ক্ষমতার জন্য অপব্যবহার করবে না। জ্ঞানকে মানুষ আল্লাহ্র রাস্তায় অর্থাৎ মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যবহার করবে। আর একটি উপদেশ হচ্ছে এই যে, জীবনের কোনও অবস্থাতেই কোনও বিপদ-আপদের সম্মুখীন হলেও তা থেকে উদ্ধারের জন্য যাদু-টোনা, ঝাড়-ফুক ও অলৌকিক কিছুর আশ্রয় গ্রহণ করা হারাম ও কুফর। আজ আমাদের বাংলাদেশীদের মধ্যে রত্ন পাথর, ঝাড়-ফুক, মাদুলী – তাবিজ ইত্যাদির অত্যাধিক প্রসার লাভ করেছে। সেই সাথে প্রসার লাভ করেছে পীর-ফকির নামধারী ভন্ড প্রতারকদের, যারা দাবী করে যে তাদের অলৌকিক ক্ষমতাবলে তারা সব মুশকিল আসান করে দিতে পারে। কিন্তু মুসলমাদের কর্তব্য হচ্ছে মুসকিল আসান বা বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য শুধুমাত্র সর্বশক্তিমানের কাছে আত্মসমর্পন করা। তিনি সব মুশকিল-আসানের মালিক। যাদু টোনা বা অলৌকিক কিছুর আশ্রয় গ্রহণ করা মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ বা হারাম।
১০৫। দুষ্ট লোকেরা হারূত ও মারূতের কাছ থেকে যাদুর স্বরূপ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করে তা তাদের দুষ্ট অভিসন্ধি চরিতার্থ করার কাজে নিয়োজিত করে। তাদের প্রতারণা, জালিয়াতি, সাধারণ মানুষের চোখে বিভ্রান্তি ঘটায়। এসব যাদুকরেরা সাধারণভাবে স্ত্রী পুরুষের মধ্যে বিভেদ ঘটানোর জন্য তাদের এই যাদুর ব্যবহার করতো। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় এসব অলৌকিক কর্মকাণ্ডকে যাদু বলা হয়। যাদু হচ্ছে সেই জিনিষ বা শয়তানের সন্তুষ্টির জন্য করা হয়; যে কাজ সম্পাদনের জন্য শয়তানের সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। কিন্তু মহান আল্লাহ্ আমাদের আস্বস্ত করেছেন যে ওদের ক্ষমতা আল্লাহ্ খুবই সীমিত করেছেন। শয়তানকে এই সীমিত ক্ষমতা আল্লাহ্ দিয়েছেন বেহেশ্ত থেকে বিতাড়িত করার সময়েই। আর আদমকে দেয়া হয়েছিলো সেই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি যেনো সে স্ব-ইচ্ছায় আল্লাহ্র ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পন করে, শয়তানের সন্তুষ্টির জন্য কাজ না করে। যারা শয়তানের কু-প্রভাব থেকে সর্বশক্তিমানের আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করে, আল্লাহ্ তাদের সাহায্য করেন। আল্লাহ্র রহমত ও করুণাধারা তাদের বেষ্টিত করে রাখে। যারা অনুতপ্ত এবং সেই সাথে নিজ কার্যপ্রণালীকে সংশোধনের মাধ্যমে আল্লাহ্র নির্দেশ অন্বেষণ করে; তারা অবশ্যই সমস্ত ক্ষতি, সমস্ত কু-প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহ্র আশ্রয় লাভ করে। বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এসব যাদুকর বা ভণ্ড পীরের আশ্রয় প্রার্থনা করার অর্থ হচ্ছে কুফ্র এবং নিজের আত্মার বা আধ্যাত্মিক জীবনের ক্ষতি করা। কিন্তু আল্লাহ্ বলেছেন এসব যাদুকর বা ভণ্ড পীরেরা (যারা ধর্মের নামে মানুষকে ঠকায়) তাদের নিজের আত্মাকে শয়তানের কাছে বিক্রি করে দেয়। তারা অশুভ শক্তির ক্রীতদাসে পরিণত হয়। এই আয়াতে শুধু যে ব্যক্তিগত দু-একজনের কথাই বলা হয়েছে তা নয় বরং এখানে বলা হয়েছে ইহুদীদের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর কথা, ঠিক একইভাবে পৃথিবীর যে কোনও অধঃপতিত জাতি সমষ্টিগতভাবে রত্ন-পাথর, যাদু-টোনা, পীর-ফকিরের আধিপত্যে বিশ্বাসী হতে পারে। পরিণামে সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। কারন তারা আল্লাহ্র করুণা বা রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।
